ঢাকা, বুধবার 05 March 2017, ২২ চৈত্র ১৪২৩, ০৭ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জনপ্রতিনিধিদের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

এই অভিযোগ অনেক আগেই প্রমাণিত হয়েছে যে, সরকার দেশের সবগুলো পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কর্তৃত্ব দখলে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সম্পর্কিত প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল ২০১৫ সালের মে-জুন মাসে। সে সময় ক্ষমতাসীনরা একদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের নির্বাচিত মেয়রদের একের পর এক সাজানো মামলায় ফাঁসিয়েছে, অন্যদিকে গ্রেফতারের পাশাপাশি পুলিশকে দিয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে দাখিল করিয়েছে চার্জশিট। একযোগে শুরু হয়েছিল স্থানীয় সরকার আইনের অপব্যবহার করে মেয়রদের সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণ করার কার্যক্রমও। বেশি ভোটপ্রাপ্তির সিরিয়াল বা ক্রমিক না মেনে প্রতিটি স্থানে প্যানেল মেয়র হিসেবে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিলরদের। সরকারের এই বেআইনি কাজের শিকার হয়েছিলেন রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, খুলনার মেয়র মনিরুজ্জামান মনি এবং গাজীপুরের মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নান। তাদের প্রত্যেককে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারাগারে ঢোকানোর এবং সাময়িক বরখাস্ত করার কাজ শেষ করেছিল সরকার।
প্রায় দু’ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে উচ্চ আদালতের রায়ে তারা মেয়র পদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ ও অধিকার পেয়েছিলেন। কিন্তু দু’জনের কাউকেই মেয়রের আসনে বসতে দেয়া হয়নি। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দরজায় লাগিয়ে দেয়া তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকলেও তারা এমনকি ২৫ মিনিটও বসতে পারেননি। দু’জনকো আবারও বরখাস্ত করেছে সরকার। রাজশাহীর মেয়রকে জানানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ২২ মার্চ মহানগর বিশেষ আদালত-১ একটি ফৌজদারি মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করায় তিনি আর মেয়র পদে আসীন থাকতে পারবেন না। অন্যদিকে সিলেটের মেয়রকে জানানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ায় সরকার তাকে বরখাস্ত করেছে। ওদিকে হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জে কে গাউসকে জড়ানো হয়েছে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হত্যা চেষ্টার মামলায়। উল্লেখ্য, প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার আইনের একটি ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে- যেখানে বলা আছে, কোনো নিবাচিত জনপ্রতিনিধি ফৌজদারি অপরাধে দন্ডিত হলে তাকে বরখাস্ত করা যাবে। অন্যদিকে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, প্রমাণ হওয়া দূরে থাকুক, আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হলেই এমনভাবে বরখাস্ত করা হচ্ছে যেন সকল অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং বিচারক মেয়রদের দন্ডিত করেছেন! মেয়ররা শুধু নন, একই অবস্থায় পড়েছেন কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন পৌরসভা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও- যারা ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। প্রত্যেককেই পুলিশের ধাওয়ার মুখে রাখা হয়েছে। কারো কারো বিরুদ্ধে ডজনের বেশি নাশকতা ও খুনের মামলা দিয়েছে পুলিশ। অনেকে এরই মধ্যে কারাগারেও স্থান পেয়েছেন। এর ফলে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়ন কর্মকান্ড।
কিন্তু তা সত্ত্বেও গত ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটেছে আর সে কারণেই মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে ২ এপ্রিল আবারও বরখাস্ত করা হয়েছে তিনজন মেয়রকে। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে উচ্চ আদালতের আদেশ এবং সংবিধানের নির্দেশনাকে অমান্য করেছে সরকার। করেছেও এমন এক সময়ে- ঢাকায় যখন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে যোগদানকারী বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র সম্পর্কে অত্যন্ত নেতিবাচক ধারণা নিয়ে তাদের দেশে ফিরে যাবেন। আমরা সরকারের এই গণতন্ত্র বিরোধী নীতি-উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ড ঠিক নয় বলে মনে করি। গণতন্ত্রের ব্যাপারে আদৌ সদিচ্ছা থাকলে ক্ষমতাসীনদের উচিত ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত এবং জনপ্রিয় মেয়রদের বরখাস্ত করার পরিবর্তে মেয়র ও কাউন্সিলরসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যেককে যার যার পদে পুনর্বহাল ও তাদেরকে তাদের দায়িত্ব পালনের অধিকার দেয়া উচিত। আমলা এবং দলীয় লোকজনকে মেয়র বা প্রশাসকের পদে বসানোর চিন্তা বাদ দিয়ে সুযোগ দিতে হবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকরী হওয়ার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ