ঢাকা, বুধবার 05 March 2017, ২২ চৈত্র ১৪২৩, ০৭ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রভাবগুলো

আবু হেনা শাহরীয়া : মানুষের প্রয়োজনেই এখন সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন শোভা পাচ্ছে। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা যেমন আমাদের চাহিদা পূরণে ব্যবহার হচ্ছে তেমনিভাবে এর ক্ষতিকারক দিকও কম নয়। মাথা নামিয়ে, চোখ স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে আঠার মতো লাগিয়ে পথে হাঁটাহাঁটি করা মানুষ প্রায়ই দেখা যায়। এমন হাঁটাকে ‘স্মার্টফোন ওয়াক’ নাম দিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান একে ‘বিরক্তিকর’ আখ্যা দিয়েছে। একে জেওয়াকিংও বলা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ডেলওয়্যার-এর গবেষকরা জানিয়েছেন, ফোন ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা মানুষের চলাচলে পরিবর্তন আনে। সারাক্ষণ মোবাইলের ব্যবহারে আর কী কী প্রভাব পড়ে তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।
এক  গবেষণায় দেখা গেছে ২.৬ কোটি ব্রিটিশ নাগরিক গ্যাজেট ব্যবহারের ফলে বুড়ো আঙ্গুলের ব্যাথায় ভোগেন। ডিভাইস ব্যবহারের কারণে একই আঙ্গুলের বারবার ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট এই ব্যাথাকে বলা হয় ‘ব্ল্যাকবেরি থাম্ব’। ডিভাইসের স্ক্রিন দেখতে নিচে তাকিয়ে থাকার কারণে ঘাড়ে যে ব্যাথা অনুভূত হয়, তা আইপশ্চার নামে পরিচিত। আমাদের মাথার ভর ১০ থেকে ১২ পাউন্ড এবং লম্বা সময় ধরে এটি একটি দিকে রাখলে মেরুদণ্ডে বাড়তি ভরের চাপ প্রয়োগ করে। যেমন, ১৫ ডিগ্রী বাঁকানো মাথা ঘাড়ের উপর ভর বাড়িয়ে দেয় ২৭ পাউন্ডের। ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘টেক্সটনেক’ নামের এই সমস্যা আরও ছড়িয়ে যেতে পারে।
চোখের ডাক্তাররা সতর্ক করে জানান, স্মার্টফোনের পর্দার নীলচে আলো চরম ক্ষতিকারক এবং স্মার্টফোন অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে দীর্ঘমেয়াদী চোখের ক্ষতি হতে পারে। চোখ জ্বলা, মাথাব্যাথা এবং দূর দৃষ্টি কমে যাওয়ার মতো রোগগুলো ফোন এবং কম্পিউটার ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত।
গবেষণায় জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি’র ’৮৯ শতাংশ স্নাতক শিক্ষার্থী যখন তাদের ফোন স্থির থাকে তখনও ‘অলৌকিক’ মোবাইল ভাইব্রেশনের অনুভূতি পান।  দুশ্চিন্তা করার প্রাথমিক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এই ‘ফ্যান্টম ভাইব্রেশন’ নামের সমস্যাটিকে। প্রতি ১০ জন মোবাইল ব্যবহাকারীর সাতজনের মধ্যে এই সমস্যা থাকতে পারে। লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন এবং ট্রপিকাল মেডিসিন-এর ২০১১ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৬ শতাংশ ফোনেই কোলি (ব্যাকটেরিয়া) আশ্রয় নেয়। যার মানে হচ্ছে,  প্রতি ছয়টির মধ্যে একটি মোবাইল ফোন মল জাতীয় উপাদান বহন করে।
দুর্ঘটনাপ্রবণ খনিজদ্রব্যগুলোর উপর নির্ভরতা শেষ করতে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি ঘটিয়েছে প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা মার্কিন প্রতিষ্ঠান অ্যাপল এবং ইনটেল। দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে এমন খনিজদ্রব্যগুলোর মধ্যে টাংস্টেন, টিন, ট্যান্টালাম এবং সোনা অন্তর্ভুক্ত। কঙ্গো’র সামরিক নেতারা এই খনিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন আর কাজ করেন কারাগার বন্দীরা। এই খনিগুলোতে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান- কোবাল্ট তৈরি হয়। দুর্ভাগ্যবশত, এই খনিজ পদার্থের উত্তোলনও স্বাভাবিক নয় বলে জানিয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যবিষয়ক মার্কিন সাইট বিজনেস ইনসাইডার। কোবাল্ট ব্যবহার করা হয় লিথিয়াম ব্যাটারিতে, যা স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়িতে শক্তি সরবরাহ করে।
মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক তদন্তে খনিগুলোর কর্মীদের দুর্দশা অবস্থার প্রকাশ পেয়েছে। এই ধরনের কর্মীদের বলা হয় ‘শৈল্পিক খনিশ্রমিক’, যারা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ কর্মী নন তবুও তারা নিজেদের জীবিকার জন্য তাদের আশপাশের খনি গর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা কোনো ধরনের যন্ত্র ছাড়াই কোবাল্ট খোঁজেন, প্রায়ই খালি পা’য় থাকেন, এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়েই কাজ করেন। তাই হতাহতের ঘটনা প্রতিনিয়তই চলছে, বাদ পড়ছে না খনিতে কাজ করা শিশুরাও। কোবাল্ট সংগ্রহের পর তা নদীর পানিতে পরিষ্কার করা হয়। এই পদ্ধতির কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, যা জন্ম জটিলতাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য দায়ী। প্রতিবেদনে জানানো হয়, একদিনে একজন খনিশ্রমিক দুই থেকে তিন ডলার আয় করে থাকেন।
অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই কোবাল্ট সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়ে সতর্ক, কিন্তু অবস্থা উন্নতিকরণে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদক্ষেপ আর আগ্রহ এক রকম নয়। অ্যাপলের সামাজিক দায়িত্ববিষয়ক সাপ্লাই চেইন ইনচার্জ-এর ঊর্ধ্বতন পরিচালক পওলা পিয়ার্স জানান, অ্যাপল তাদের প্রধান সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এগুলোর মধ্যে কোবাল্ট উৎপাদন অবস্থাকে সঠিক করা এবং দারিদ্র্য দূর করা অন্তর্ভুক্ত।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বিষয়ে খুবই নগন্য আগ্রহী দেখা যায় বলে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। কর্মী এবং পরিবেশ বিষয়ে কাজ করছেন দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গ-এর এক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শদাতা লারা স্মিথ।
তিনি জানান, কোবাল্ট খনি থেকে সংগ্রহ এখনও এমন একটি বিষয়, যা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নজরে আনছে না। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো অজ্ঞতার কথা স্বীকার করতে পারবে না। তারা যদি বুঝতে চায়, তারা বুঝতে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ