ঢাকা, বুধবার 05 March 2017, ২২ চৈত্র ১৪২৩, ০৭ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁয়ের একাল-সেকাল

গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের কবর

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ : পানাম নগর পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি যা নারায়ণঞ্জ জেলার সোনারগাঁও এ অবস্থিত। পানাম বাংলার প্রাচীনতম শহর। এক সময় ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বসবাস ছিল এখানে। ছিল মসলিনের জমজমাট ব্যবসা। প্রাচীন সেই নগরীর তেমন কিছু আর অবশিষ্ট নেই। এখন আছে শুধু ঘুরে দেখার মতো ঐতিহাসিক পুরনো বাড়িগুলো। ২০০৬ সালে পানাম নগরকে বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় প্রকাশ করে। ঈসা খাঁ এর আমলের বাংলার রাজধানী পানাম নগর। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর প্রাচীন সোনারগাঁর এই তিন নগরের মধ্যে পানাম ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে কয়েক শতাব্দীর পুরনো অনেক ভবন রয়েছে, যা বাংলার বার ভূঁইয়াদের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত। ঢাকার খুব কাছেই ২৭ কি.মি. দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগঞ্জ এর খুব কাছে সোনারগাঁতে অবস্থিত এই নগর। সোনারগাঁর ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নগরী গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূণ একটি শহর। জানা যায়, ১৪০০ শতাব্দীতে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে পৃথিবীর নামি-দামি শিক্ষকরা পড়াতে আসতেন। এখানে একটি ভৃত্য বাজার ছিল বলে জানা যায়।
পানাম নগরীর দুই ধারে ঔপনিবেশিক আমলের মোট ৫২টি স্থাপনা রয়েছে। এর উত্তরদিকে ৩১টি এবং দক্ষিণদিকে ২১টি স্থাপনা অবস্থিত। স্থাপনাগুলোর স্থাপত্যে ইউরোপীয় শিল্পরীতির সাথে মোঘল শিল্পরীতির মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। পানাম নগরী নিখুঁত নকশার মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কূপসহ আবাস উপযোগী নিদর্শন রয়েছে। নগরীর পানি সরবরাহের জন্য দু’পাশে খাল ও পুকুরের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। এখানে আবাসিক ভবন ছাড়াও উপাসনালয়, গোসলখানা, পান্থশালা, দরবার কক্ষ ইত্যাদি রয়েছে। পানাম নগরের আশে পাশে আরো কিছু স্থাপনা আছে যেমন- ছোট সর্দার বাড়ি, ঈশা খাঁর তোরণ, নীলকুঠি, বণিক বসতি, ঠাকুরবাড়ী, পানাম নগর সেতু ইত্যাদি। লাল ইটের বাড়ি। দু’পাশে বাড়ি মধ্যখানে মসৃণ পিচঢালা পথ।
১৫০ বিঘা আয়োতনের সুবিশাল কমপ্লেক্সটি রাজধানী লুপ্তপ্রায় নগরের মধ্যে টিকে থাকা পানাম নগরের কথা বলছে। এখানে লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিশাল চত্বরে রয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট। বিশেষ করে পিকনিক স্পটে শীতকালে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে ভ্রমণে আসে। কারুশিল্প গ্রামে বৈচিত্র্যময় লোকজ স্থাপত্য গঠনে বিভিন্ন ঘরে কারুশিল্প উৎপাদন, প্রদর্শন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। দোচালা, চৌচালা ও উপজাতীয় মোটিফে তৈরি এ ঘরগুলোয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অজানা, অচেনা, আর্থিকভাবে অবহেলিত অথচ দক্ষ কারুশিল্পীরা বাঁশ-বেত, কাঠ খোদাই, মাটি, জামদানি, নকশিকাঁথা, একতারা, পাট, শঙ্খ, মৃৎশিল্প ও ঝিনুকের সামগ্রী ইত্যাদি কারুশিল্প উৎপাদন, প্রদর্শনী ও বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া জাদুঘরের অভ্যন্তরে আরো রয়েছে বিনোদন ব্যবস্থার জন্য স্থায়ী পিকনিক স্পট, স্থাপত্য নকশা অনুযায়ী নির্মিত আঁকাবাঁকা মনোরম লেক। আরও আছে পানাম ব্রীজ, নীলকুঠী, গোয়ালদী শাহী মসজিদসহ অনেক পীর-ওলীদের মাজার। সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর থেকে উত্তর দিকে হাঁটলেই সহজে পৌঁছানো যাবে অর্ধ্বচন্দ্রাকৃতি পানাম পুলে। (যদিও পুলটি ধ্বংস হয়ে গেছে)। এই পুল পেরিয়েই পানাম নগর এবং নগরী চিরে চলে যাওয়া পানাম সড়ক। আর সড়কের দু’পাশে সারিসারি আবাসিক একতলা ও দ্বিতল বাড়িতে ভরপুর পানাম নগর। প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নিতে চাইলে যে কেউ পারবেন খুব অল্প সময়ের মধ্যে। নদী-নালা, খাল-বিল পরিবেষ্টিত এবং অসংখ্য গাছপালা সবুজের সমারোহ সহজেই আকৃষ্ট করে।
ঈশাখাঁর বাড়িটি অসাধারণ স্থাপত্যশীল আর মধ্যযুগে পানাম নগরী  কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেয় ব্যস্ততা, দুঃখ, আর গ্লানিকে। লিচুর দিন শেষ। তবে কোনো এক গ্রীষ্ম এখানে গেলে পাওয়া যাবে গ্রীষ্মের মধুফল কদমী লিচু।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ