ঢাকা, বুধবার 05 March 2017, ২২ চৈত্র ১৪২৩, ০৭ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কবিয়াল রমেশ শীল

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই : কবিয়াল রমেশ শীলের পঞ্চাশতম মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল। প্রায় নব্বই বছর বয়সে তাঁর পরিণত কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ১৯৬৭ সনে এ দিনে অর্থাৎ ৬ এপ্রিল।
কবিয়াল রমেশ শীলের মূল অবদান কবি গানকে অপসংস্কৃতির অবক্ষয় থেকে বাঁচিয়ে গণ-মানুষের সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে রূপান্তর করা। তাঁর পূর্বে কবিগানের মূল বিষয় ছিল হয় পৌরাণিক ধর্মীয় বিষয় নয়ত স্থূলরুচির কোন বিষয়। সমাজের নি¤œবর্গের মানুষের অবসর বিনোদন ব্যতীত অন্য কোন ভূমিকা এ গান পালন করতে পারছিল না। রমেশ শীল নিছক কবিওয়ালা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একদিকে সমাজ সচেতন মানবিক চিন্তা চেতনার মানুষ, অন্যদিকে গণমানুষের প্রতি দায়বদ্ধ এক সংগ্রামী সৈনিক। ফলে তিনি  কবিগানে নিয়ে এলেন সমসাময়িক বিষয় যুদ্ধ ও শাস্তি, হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য, সমাজতন্ত্র বনাম ধনতন্ত্র ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন সমসাময়িক উপলক্ষ নিয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা বাঁধেন যা এতই জনপ্রিয় হয় যে গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত তাঁর গান “ভাষার জন্যে প্রাণ হারালি বাঙ্গালি” আজও আমাদের একটি জনপ্রিয় গণসঙ্গীত। ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম কার্যকর ভূমিকা ছিল কবিয়াল রমেশ শীলের বাঁধা গানের।
প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত সাধারণ গ্রাম্য পরিবারের সন্তান রমেশ শীল শুধুমাত্র কবিপ্রতিভার সাথে জ্বলন্ত মানবপ্রেম ও দেশ-প্রেমের মিলন ঘটাতে পেরেছেন বলে জীবৎকালে সারা উপমহাদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর চেতনা এতই স্বচ্ছ ও প্রখর ছিল যে তিনি সহজেই সাম্প্রদায়িকতার কুফল বুঝতে পেরে বরাবর হিন্দু-মুসলিম মিলনের পক্ষে ছিলেন, এমনকি ক্রমেই এই গ্রাম্য লোক কবি পুঁজিবাদ ও সামন্ততন্ত্রের বিষময় ফল, যুদ্ধ ও ফ্যাসিজম এর মন্দ দিকগুলো পরিষ্কার উপলব্ধি করে এসবের বিপক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর গণমুখী ভূমিকার জন্যে কবিয়াল রমেশ শীলকে বৃদ্ধবয়সেও কারাবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু কোন অত্যাচারে স্বীয় উপলব্ধি থেকে তিনি বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি।
শিল্পকর্মকে অবলম্বন করে বিপুল মানুষের স্বীকৃতি লাভ, সারা মহাদেশব্যাপী পরিচিতি অর্জন এবং জীবনকালেই কিংবদন্তীতে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও কবিয়াল রমেশ শীল সেই সাধারণ গ্রামীণ মানুষটি ছিলেন, যিনি সর্বাবস্থায় অসহায় দুর্গত মানুষের পাশে তাঁর অবস্থানটি নিয়েছেন ভূমিকাটি পালন করেছেন। খ্যাতি কিংবা যোগাযোগকে তিনি ব্যক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধির জন্যে খাটাননি, বরং ক্রমেই তাঁর অঙ্গীকার হয়েছে পাকা ও প্রখর।
রমেশ শীল শুধু চট্টলার গৌরব নন, সারা দেশের কৃতী সন্তান তিনি। কিন্তু তাঁর অবদান অনুযায়ী কোন প্রতিদান উত্তরসুরীদের কাছে থেকে তিনি লাভ করেন নি। এতে  বলা বাহুল্য, রমেশ শীলের গৌরব লাঘব হয় নি, কিন্তু আমাদের সুনাম বাড়েনিও। আমরা শুধু ইতিহাস অচেতন নই, অনেকেই আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধের প্রতিও কটাক্ষ করে থাকেন। আমাদের অসচেতনতা, ঔদাসীন্য ও প্রতিদানে কার্পণ্য এই অপবাদকে যেন সত্যে পরিণত করতে উদ্যত। রমেশ শীল, কাজেম আলী, ইসলামাবাদী, নবীণ সেন, মাহবুব উল আলম, সাহিত্যবিশারদ প্রমুখের জন্মমৃত্যু দিনে একবার এই কথাটা মনে হয় আমাদের। কিন্তু এর বেশি কিছু কি হয়?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ