ঢাকা, বৃহস্পতিবার 06 March 2017, ২৩ চৈত্র ১৪২৩, ০৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

উগ্রপন্থী দলের উত্থান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [সাত]
উমর ইবুন আব্দুল আযীযকে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠাকারী, সৎ ও ন্যায়বিচারক হিসেবে মানলেও, তিনি যেহেতু পূর্ববর্তী শাসকদেরকে কাফির বলতে অস্বীকার করেন, সেহেতু তারা তাঁর বিরুদ্ধে ও যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। এক্ষেত্রে সাহাবীগণ এবং তাদের অনুসারী তাবিয়ী ও পরবর্তী আলিমগণ পূর্ববর্তী মূলনীতির অনুসরণ করেন। তাঁরা বলেন, কুরআন কারীমে বিধান মত ফয়সালা না করাকে কুফর বলা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি ইসলামী বিধানানুসারে বিচার করা অপ্রয়োজনীয় অথবা ইসলামী আইনকে অচল রাখে বা বাতিল মনের করেন তিনি নি:সন্দেহে কাফির বা অবিশ্বাসী বলে গণ্য হবেন। পক্ষান্তরে তিনি যদি ইসলামের নির্দেশকে সঠিক জেনেও জাগতিক লোভ, স্বার্থ, ভয় ইত্যাদির কারণে ইসলাম বিরোধী ফয়সালা দেন তবে এই কার্যক্রম মারাত্মক পাপ বলে গণ্য হবে।
যেমন মাদকদ্রব্য ইসলামে হারাম এবং কারো মদপান প্রমাণিত হলে বেত্রঘাতের বিধান দেয়া হয়েছে। কেউ যদি মদ বৈধ মনে করেন অথবা মদপানের জন্য শাস্তি প্রদানকে সেকেলে, আপত্তিকর বা অমানবিক মনে করেন তবে তিনি কাফির বলে গণ্য হবেন। পক্ষান্তরে যদি কোনো বিচারক মদের অবৈধতা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন এবং মদপানের জন্য শাস্তি দেয়াই সঠিক বলে মনে করেন, দল বা সেনাবাহিনীকে অনুগত রাখার লোভে, শাসক বা আমীরের চাপে, জাগতিক কোনো স্বার্থে বা পক্ষপাতিত্বের কারণে আইন প্রয়োগ না করেন বা অপরাধীকে শাস্তি না দেন তবে তিনি পাপী গণ্য হবেন, আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকারকারী বলে গণ্য হবেন, কিন্তু অবিশ্বাসী কাফির গণ্য হবেন না। বিশেষত যে ব্যক্তি নিজেকে মুমিন বলে দাবি করেছেন, তিনি আল্লাহর আইন অমান্য করলে বা আল্লাহর আইনের বাইরে ফয়সালা দিলে তার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই গ্রহণ করতে হবে যতক্ষণ না তার স্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা তার কুফরী প্রশাণিত হয়।
সাহাবীগণ বিভিন্নভাবে খারিজীদেরকে এ বিষয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেন। যখন তারা কুরআনের বাণী আল্লাহ ছাড়া কোনো বিধান বা শাসন নেই এই আয়াতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা শাসকের দায়িত্ব ও অধিকার করে তখন তাদের এই বক্তব্যের প্রতিবাদে আলী রা. বলেন, তারা একটি সঠিক কথাকে ভুল অর্থে প্রয়োগ করছে। তারা বলছে ‘আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান নেই বা কর্তৃত্ব নেই। কিন্তু তারা বুঝাচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া কারো শাসন নেই। কিন্তু মানুষের জন্য তো একজন শাসক এভাবেই আল্লাহর নির্ধারিত সময় পূর্ণ হবে। যিনি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন, জনগণের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং সবল থেকে দুর্বলের অধিকার আদায় করবেন। এভাবে সৎ মানুষেরা শান্তি পাবে এবং অপরাধীরা দমিত হবে।
এখানেও রসূলুল্লাহ স. এর প্রায়োগিক সুন্নাতের আলোকে আলী রা. আল্লাহর বিধান পালনে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। ইসলামের অনেক নির্দেশনা সকল মুমিন ব্যক্তিগতভাবে পালন করেন। আবার অনেক নির্দেশনা পালন করবে রাষ্ট্র। সেগুলোর অন্যতম হলো বিচার, শাসন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা। বিচার, শাসন, যুদ্ধ, ইত্যাদি ইবাদত কখনোই কোনো মুসলিম ব্যক্তিগত ভাবে পালন করতে পারেন না। কুরআন কারীমে বারংবার কাফিরের বিরুদ্ধে জিহাদ কিতাল বা যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে কাফির মুশরিকদের হত্যার নির্দেশ বা অনুমতি দেয়া হয়েছে এ থেকে খারিজীগণ ধারণা করে যে, কাফির হলেই হত্যা করা যাবে। তাদের এই ধারণা ছিল সুন্নাত বা রসূলুল্লাহ স. এর প্রয়োগের উপর নির্ভর না করে, মনগড়া ভাবে কুরআনের অর্থ করার ফল। কুরআনের নির্দেশাবলি সকল আয়াতের সমন্বয়ে ও রসূলূল্লাহ স. এর প্রয়োগের মাধ্যমে বুঝতে হবে।
মুসলমানদেরকে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ও দুষ্কর্মের প্রতিরোধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কখনো তাকে আইন হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রসূলুল্লাহ স. বলেছেন তোমাদের কেউ যদি কোন দুষ্কর্ম সংঘটিত হতে দেখতে পায় তবে সে তাকে তার বাহুবল দিয়ে পরিবর্তন করবে। যদি তাতে সক্ষম না হয় তবে সে তার অন্তর দিয়ে তার পরিবর্তন (কামনা) করবে, আর এটা হলো ঈমানের দুর্বলতা পর্যায়।
কাউকে কোনো অপরাধে লিপ্ত দেখে তাকে বিচারকের নিকট সোপর্দ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে বিচার ছাড়া কেউ শাস্তি দিতে পারেন না। এই প্রক্রিয়ার বাইরে স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধান বিচারপতিও কাউকে শাস্তি দিতে পারেন না। উমর রা. আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রা. কে বলেন আপনি শাসক থাকা অবস্থায় যদি কাউকে ব্যভিচারের অপরাধে বা চুরির অপরাধরত দেখতে পান তাহলে তার বিচারের বিধান কী? আব্দুর রহমান রা. বলেন, আপনার সাক্ষ্যও একজন সাধারণ মুসলিমের সাক্ষ্যের সমান। উমর রা. বলেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। অর্থ্যাৎ রাষ্ট্রপ্রধান ও নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারবেন না। এমনকি তার সাক্ষ্যের ও অতিরিক্ত কোনো মূল্য নেই । রাষ্টপ্রধানের একার সাক্ষ্যে কোনো বিচার হবে না। বিধিমোতাবেক দুইজন বা চারজন সাক্ষীর কমে বিচারক কারো বিচার করতে পারবেন না।
উমর রা. রাতে মদীনায় ঘোরাফেরা করার সময় এক ব্যক্তিকে ব্যভিচারে লিপ্ত দেখতে পান। তিনি পরদিন সকালে সাহাবীগণকে জিজ্ঞাসা করেন, যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাউকে ব্যভিচারে লিপ্ত দেখতে পান তাহলে তিনি কি শাস্তি প্রদান করতে পারবেন? তখন আলী রা. বলেন, কখনোই না। আপনি ছাড়া আরো তিনজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী যদি অপরাধের সাক্ষ্য না দেয় তাহলে আপনার উপর মিথ্যা অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ করা হবে।
এভাবে আমরা দেখছি যে, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধ, প্রতিবাদ বা পরিবর্তন মুমিনের দায়িত্ব। পক্ষান্তরে বিচার বা শাস্তি নিজের হাতে তুলে নেয়ার অর্থ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ও রাষ্ট্রের আনুগত্য পরিত্যাগ করা। খারিজীগণ এই দুয়ের মাঝে পার্থক্য না বুঝে অন্যায়ের পরিবর্তনের নামে রাষ্ট্রদ্রোহিতায় লিপ্ত হয়। খারিজীগণ হুযাইয়া রা. কে বলে, আমরা কি ন্যায়ের আদেশ ও নিষেধ করতে পারবো না? আপনি কি তা করবেন না? তিনি উত্তরে বলেন, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যয়ের বিষেধ নিঃসন্দেহে ভাল কাজ। তবে তোমাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ বা বিদ্রোহ করা সুন্নাত সম্মত নয়।
খিলাফতে রাশিদার পর থেকে সকল ইসলামী রাষ্ট্রেই রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামী বিধিবিধানের কমবেশি লঙ্ঘন করা হয়েছে। শাসক নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের পরামর্শ গ্রহণ, জনগণের ও আইন প্রয়োগ ইত্যাদি অগণিত ইসলামি নির্দেশনা কম বেশি উপেক্ষিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসকগণ নিজেদেরকেই আইনদাতা মনে করেছেন এবং কুরআনী বিধিবিধান ও আইনকে অবহেলা করেছেন। এমনকি সালাতের সময় ও পদ্ধতি ও পরিবর্তন করা হয়েছে। উমাইয়া শাসনামলে সাহাবীগণ এরূপ অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু কখনোই তারা এ কারণে রাষ্ট্র বা সরকারকে জাহিলী, কাফির বা অনৈসলামিক বলে গণ্য করেননি। বরং তাঁরা সাধ্যমত এদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপত্তি জ্ঞাপনসহ এদের আনুগত্য বহাল করেছেন। পরবর্তীকালে ও কোনো মুসলিম ইমান, ফকীহ ও আলিম এ কারণে এ সকল রাষ্ট্রকে দারুল হরব, অনৈসলামিক রাষ্ট্র বা জাহিলী রাষ্ট্র বলে মনে করেননি। তারা তাদের সাধ্যমত সংশোধন ও পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন, সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় আনুগত্য ও সংহতি বজায় রেখেছেন। পাশাপাশি তাঁরা সর্বদা শান্তিপূর্ণ পন্থায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে উৎসাহ দিতেন এবং নাহি আনিল মুনকার অন্যায় কাজে নিষেধের নামে অস্ত্রধারণ, শক্তিপ্রয়োগ, রাষ্ট্রদ্রোহিতার উসকানি দিতে নিষেধ করতেন। এ বিষয়ে তাঁদের অগণিত নির্দেশনা হাদীসগ্রন্থসমূেহ সংকলিত হয়েছে।
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, সুন্নাতের আলোকে সাহাবীগণের পন্থাই ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও সংস্কারের সঠিক পন্থা। অন্যায়ের পরিবর্তনের প্রবল স্নায়ুবিক চাপ দ্রুত ফল অর্জনের উদ্দীপনা বা অন্যায়ের প্রতি অপ্রতিরোধ্য ঘৃণা ইত্যাদি কারণে উগ্র ও আবেগী হয়ে যারা সহিংসতা বা হঠকারিতার পথ বেছে নিয়েছে তারা কখনো ইসলামের কোনো কল্যাণ করতে পারেনি। খারিজীগণ ও অন্যান্য উগ্র জনগোষ্ঠী তাদের অনুসারীদের অনেক গরম ও আবেগী কথা বলেছে এবং অনেক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু তারা স্বল্প সময়ের কিছু ফিতনা সৃষ্টি করা ছাড়া কিছুই করতে পারেনি।
পক্ষান্তরে মধ্যপন্থা অনুসারী আলেমগণ বিদ্রোহ, উগ্রতা ও শক্তিপ্রয়োগ, জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তন ইত্যাদি পরিহার করে শান্তিপূর্ণভাবে জনগণ ও সরকারকে ন্যায় নীতির প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর সলা পরামর্শ দিয়ে যুগে যুগে মুসলিম সমাজের অবক্ষয় রোধ করার চেষ্টা করে আসছেন।
এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, প্রকৃত ইসলামী শিক্ষার অনুপস্থিতি এবং ইসলামের মূল দর্শন অনুধাবন না করতে পারা ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থার জন্ম দিতে পারে। সন্ত্রাস রোধের জন্য ইসলামের সটিক ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা প্রসার অতীব প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সন্ত্রাসী কর্মের প্রতিরোধে সাহাবায়ে কিরামগণ ও পরবর্র্তী যুগের মুসলিম নেতৃবৃন্দের কর্মপন্থা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমরা দেখেছি যে, সন্ত্রাসের উৎস হলো, সমাজ বিচ্ছিন্নতা, মুসলিম সমাজের প্রতি ঢালাও অনাস্থা, ঘৃণা, জ্ঞানের অহংকার, ধার্মিকতার অহংকার, ব্যক্তি বা দল বিশেষের জন্য ইসলামের ব্যাখ্যা দানের বিশেষ ক্ষমতা বা অধিকার ইত্যাদি দাবি করা। আর সন্ত্রাসের প্রকাশ হলো, ঈমানের দাবিদারকে তার কর্মের কারণে কাফির বলে দাবি করা, কাফির হত্যা বৈধ বলে দাবি করা, বিচার বা জিহাদের নামে ব্যক্তি বা গোষ্ঠির পক্ষ থেকে হত্যা, ধ্বংস, লুষ্ঠন, ইত্যাদি কর্মে লিপ্ত হওয়া। কাজেই এগুলো সম্পর্কে মুসলিমদের সচেতন হতে হবে। অন্যথায় কোনো ব্যক্তি বা দলের উচ্চাভিলাষের শিকার হয়ে, অথবা ইসলামের শত্রুদের খপ্পরে পড়ে, অথবা অন্যায়ের প্রতিকারের আগ্রহ ও ইসলামের প্রতিষ্ঠার উদ্দীপনায় অনেক তরুণ ধার্মিক যুবক সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়তে পারে।
মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে রসূলূল্লাহ স. ও তাঁর সাহাবীগণের মত ও পথের উপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। [সমাপ্ত]
লেখক : পাঠানপাড়া (খানবাড়ি), সদর সিলেট-৩১১১।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ