ঢাকা, শুক্রবার 07 March 2017, ২৪ চৈত্র ১৪২৩, ০৯ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নীলফামারীতে তিস্তায় আকস্মিক বন্যায় কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি

নীলফামারীর ডিমলায় উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে

 

নীলফামারী সংবাদদাতা : নীলফামারীতে তিস্তায় হঠাৎ করে অসময়ে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে তিস্তা নদীর আশপাশে চাষকৃত জমির কোটি কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উজান থেকে ছেড়ে দেয়া পানিতে তিস্তাপাড়ের হাজার হাজার কৃষক এখন তাদের ফসল হারিয়ে চোখের পানিতে ভাসছে। তিস্তার উজানে একাধিক বাঁধ নির্মাণ করে সরিয়ে নেয়া হয়েছে তিস্তার পানি। এক সময়ের খরস্রোতা তিস্তা ক্রমান্বয়ে পানির অভাবে শুকনো বালুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে তিস্তার সেচ কমান্ড এরিয়ার সেচ কার্যক্রমসহ ক্ষতি হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। পানিশূন্য স্রোতহীন তিস্তার বালিভূমিতে কেবলই কৃষকের বিলাপ। তিস্তাপাড়ের হাজার হাজার কৃষক নিরুপায় হয়ে তিস্তা বুকজুড়ে জেগে উঠা বালিচরে আবাদ করেছে বিভিন্ন জাতের ফসলের। পানিশূন্য তিস্তার বুকজুড়ে কেবল সবুজের সমারোহ। কৃষককূলের এ যেন কোনোক্রমে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা মাত্র। ধীরে ধীরে তিস্তার বালিভূমি কৃষকের ফসলের মাঠে পরিণত হওয়ায় নতুন করে আশায় বুক বাধে কৃষকরা। তিস্তার বুকে আবাদ হতে থাকে কোটি কোটি টাকার নানা জাতের ফসল। কৃষককূলের এ যেন বেঁচে থাকার ক্ষীণ প্রচেষ্টা মাত্র। ফসল ঘরে তোলার পূর্ব মুহূর্তে গত ২ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে তিস্তার ঢলে নীলফামারী ও লালমনিররহাট জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। উজানের ছেড়ে দেয়া পানিতে ভেসে গেল তিস্তাপাড়ের লাখ লাখ প্রান্তিক কৃষকের বোনা হাজারো স্বপ্ন। তিস্তাপাড়ে এখন শোনা যাচ্ছে সব কিছু হারানো সর্বস্বান্ত কৃষকের বিলাপ। পানি ছেড়ে দিয়ে তিস্তাপাড়ের কৃষকদের সর্বস্বান্ত করার এ ঘটনাটি ঘটলো প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পূর্ব মুহূর্তে। তিস্তাপাড়ের লাখ লাখ অধিবাসী জানেন না এতে উজানের কি বার্তা দিল তিস্তা অববাহিকার কৃষকদের। গত কয়েক দিনের আবহাওয়া বার্তায় উজানে বৃষ্টির তেমন কোনো রেকর্ড না থাকলেও হঠাৎ করে তিস্তায় পানি আসাকে উজানের ঢল ও বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বলে একশ্রেণীর তল্পিবাহকের পক্ষ হতে স্তূতি গাওয়া হচ্ছে। জ্ঞানপাপীদের এমন সাফাই গাওয়াতে হতাশ তিস্তা অববাহিকার অধিবাসীগণ। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরের পূর্বে তিস্তাপাড়ের লাখ লাখ কৃষকের কোটি কোটি টাকার ফসলহানি ঘটিয়ে কি বার্তা জানান দিচ্ছে বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারত তা জানে না তিস্তা অববাহিকার অধিবাসীরা। কখনো পানি না দিয়ে শুকিয়ে মারছে আবার কখনো ফসলের ভরা মওসুমে পানি ছেড়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত করা হচ্ছে তিস্তাপাড়ের অধিবাসীদের। এ যেন জিম্মি হয়ে পড়ার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। তিস্তাপাড়ের লাখ লাখ অধিবাসী তাদের সহায় সম্পদ ও জীবন দিয়ে প্রতিদান দিচ্ছেন এ বন্ধুত্বের।

জানা যায়, অসময়ে তিস্তায় পানি আসার কারণে জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী মৌজার চরখড়িবাড়ী এলাকা নিয়ে নতুন একটি চ্যানেল তৈরী করেছে তিস্তা। অসময়ের এ সৃষ্ট বন্যার ফলে তিস্তা অববাহিকায় ভুট্টা, বাদাম, মরিচ, পেয়াজ, রসুন, গম, মিষ্টি কুমড়া, তরমুজ, স্কোয়াস, রোপা আমনসহ লাখ লাখ হেক্টর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে মর্মে নিশ্চিত করেছেন তিস্তাপাড়ের কৃষকরা। গত এক সপ্তাহ আগেও তিস্তা মরুভূমিতে থাকলেও গত ২ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে তিস্তায় পানি বাড়তে শুরু করায় তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি স্লুইচ গেট খুলে দেয়া হয়েছে। এতেও শেষ রক্ষা হযনি। পাউবো সূত্র মতে, গত রোববার থেকে সোমবারের পানি প্রবাহ বেড়েছে দশমিক ৭৫ মিটার। দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে রোববার পানিপ্রবাহ ৫০ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার থাকলে সোমবার দুপুর ১২টায় তা বেড়ে ৫১ দশমিক ০৫ সেন্টিমিটারে গিয়ে দাঁড়ায়। উজান হতে পানি আসার কারণে তিস্তায় ঘোলা পানির সাথে কচুরীপানা আসায় তিস্তায় পানির গতি তীব্র রয়েছে। টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন সাংবাদিকদের জানান, অসময়ে বন্যার কারণে টেপাখড়িবাড়ী মৌজার চরখড়িবাড়ী গ্রামসহ আশেপাশের ১০টি গ্রামের বন্যার পানিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি তলিয়ে গেয়ে তরমুজ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেত। এছাড়া এলাকায় ভুট্টা ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাউবোর কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রফিউল বারী সাংবাদিকদের জানান, আকস্মিক বন্যার কারণে তিস্তার উজানে চরাঞ্চলের উঠতি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিস্তা অববাহিকার কৃষকরা জানায়, বন্যার কারণে ফসলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া আকস্মিক বন্যার কারণে ভুট্টা ক্ষেতগুলোতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড দোয়ানী-ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান পানি বৃদ্ধির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মুল ব্যারাজের কয়েকটি গেট খুলে দেয়া হয়েছে। পাউবো সূত্রমতে, শুষ্ক মওসুমে তিস্তা নদীর পানি না থাকায় তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প কমান্ড এলাকার ৬৫ হাজার হেক্টর জমির স্থলে এবার খরিপ-১ মওসুমে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় সেচ দেয়া হচ্ছিল মাত্র ২০ হাজার ২০২ হেক্টর জমিতে। পানির অভাবে সেচ সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হয় ৫৭ হাজার হেক্টর জমি। এ অবস্থায় তিস্তা সেচ কমান্ডা এলাকার কৃষকরা তিস্তার বুকে চাষাবাদ করে বিকল্প ফসলের। তিস্তার পানি ভারতের পক্ষ হতে প্রত্যাহারের কারণে বছরের পর বছর ধরে তিস্তার সেচ কমান্ড এলাকায় সেচ সুবিধার আওতাধীন জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। শুষ্ক মওসুমে ভারতের একচেটিয়া পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানি ক্রমাগত কমে আসায় বাংলাদেশে শুষ্ক মওসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ ১৯৯৭ সালে ৬ হাজার ৫০০ কিউসেক থেকে ২০০৬ সালে ১ হাজার ৩৪৮ কিউসেক এবং ২০১৭ সালে তিস্তা হয়ে পড়ে ¯্রােতহীন। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র আরো জানায়, ২০১৪-১৫ সালে বোরো মওসুমে রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলার ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু তিস্তায় পানির অভাবে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় মাত্র ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ ওই বছর সেচ সুবিধা থেকে বাদ পড়ে ৪৭ হাজার হেক্টর জমি। ২০১৫-২০১৬ সালে বোরো মওসুমে আরো কমিয়ে সেচ সুবিধা দেয়া হয় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। চলতি ২০১৬-১৭ সালে তা আরো কমিয়ে মাত্র ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দিনাজপুর ও রংপুরের কমান্ড এলাকা ৫৭ হাজার হেক্টর জমি সেচ কার্যক্রম থেকে বাদ দিয়ে শুধু নীলফামারী জেলার ডিমলা, জলঢাকা, নীলফামারী সদর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলাকে সেচের আওতায় রাখা হয়েছে। তিস্তা অববাহিকার ৫ হাজার ৪২৭ গ্রামের মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই নদীর ওপরই নির্ভরশীল। তাই তিস্তার পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকায় নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। তিস্তাা অববাহিকার ৮ হাজার ৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। আর সমতল ভূমিতে তিস্তা অববাহিকার পরিমাণ ৪ হাজার ১০৮ বর্গকিলোমিটার। যার প্রায় অর্ধেক পড়েছে বাংলাদেশের সীমানায়। দুই দেশই তিস্তার পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন সময় নদীর ওপর ও আশপাশে ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করেছে। ভারত এই মুহূর্তে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচ কার্যক্রমের জন্য তিস্তার পানি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তিস্তার পানি ব্যবহার করছে শুধু পরিকল্পিত সেচ দেয়ার কাজে। ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। তাই এবারের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে তিস্তাপাড়ের মানুষজন তিস্তা চুক্তির স্বপ্ন দেখলেও ভারতের খাম খেয়ালী আচরণ ও পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা’র নির্মমতায় তা আজ ভেসে যেতে বসেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ