ঢাকা, শুক্রবার 07 March 2017, ২৪ চৈত্র ১৪২৩, ০৯ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মঙ্গল শোভাযাত্রা বনাম বাঙালি মুসলিম জাতিসত্তা প্রসঙ্গ

তারেকুল ইসলাম : সম্প্রতি আসন্ন ১৪ এপ্রিলের পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষকে ঘিরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গলশোভাযাত্রা পালন করাকে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ দেশের জনগণের বড় অংশ আদর্শিকভাবেই এই শোভাযাত্রার পক্ষে নয়, তদুপরি মঙ্গলশোভাযাত্রাকে এভাবে বাধ্যতামূলক করে তা জোর করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই দেশের দায়িত্বশীল আলেম-ওলামা ও বৃহত্তর তৌহিদি জনতা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপন নিয়ে প্রশ্ন নয়, বরং যখনই ভূঁইফোঁড় ও মুসলমানদের ঈমানবিরোধী মঙ্গলশোভাযাত্রাকে এটির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত করা হয়, তখনই বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। মঙ্গলশোভাযাত্রায় যেসব মূর্তি প্রদর্শন করা হয়, সেগুলোর অধিকাংশই হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন দেব-দেবীর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। একইসাথে বিভিন্ন রাক্ষস-খোক্ষসের প্রতিকৃতি ও মুখোশও প্রদর্শন করা হয়। রাক্ষস-খোক্ষস নিশ্চয়ই মঙ্গলের প্রতীক হতে পারেনা, বরং অশুভ ও অমঙ্গল তথা শয়তানের প্রতীক বলা যেতে পারে। তাহলে কেন এর প্রদর্শন? বস্তুতপক্ষে, রাক্ষস-খোক্ষসের প্রতিকৃতি ও মূর্তি নিয়ে এত মাতামাতির প্রচ্ছন্ন অর্থ হচ্ছে প্রাচীনকালে দেব-দেবতাদের উপাসনা করার পাশাপাশি শয়তানেরও উপাসনা করা হতো তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য, যাতে করে কোনো কারণে রুষ্ট হয়ে শয়তান অমঙ্গল বা অকল্যাণ না ঘটায়। মঙ্গলশোভাযাত্রা মানে নতুন বছরে মঙ্গল কামনার উদ্দেশ্যে শোভাযাত্রা করা, এর ফলে অমঙ্গল দূরীভূত হবে বলে আশা করা হয়। অথচ প্রতিবছর দেশব্যাপী অঘটন, দুর্ঘটনা ও অমঙ্গলজনক ঘটনাবলি একের পর এক অব্যাহতভাবে ঘটেই চলছে, কিছুতেই থামছে না। প্রকৃতপক্ষে এভাবে তো অমঙ্গল দূরীভূত হয়না; অন্ততপক্ষে মুসলমানদের ঈমান-আকিদার সাথে এই শোভাযাত্রার সাযুজ্য নেই, বরং বিরোধী। মুসলমানরা একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার কাছেই মঙ্গল কামনা করে এবং অমঙ্গল দূরীকরণের জন্য তারা আল্লাহ’র কাছেই পানাহ চান। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা অবশ্যই র্শিক। 

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের বিষয়টি নিশ্চয়ই আমাদের দেশজ সংস্কৃতির অংশ। আর বাংলা সন মুসলমানদেরই সৃষ্টি। মুসলমানরা বাংলা নববর্ষ পালনও করে এসেছে। তাতে হিন্দু প্রতিবেশীদের মতো শোভাযাত্রা ধরনের কিছু অবশ্যই ছিলনা। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে এটাকে উদযাপন করা হচ্ছে চাপিয়ে দেয়া পৌত্তলিক ও শেরেকির কালচার তথা মঙ্গলশোভাযাত্রাকে অবলম্বন করে, যা আমাদের এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের তৌহিদি ভাব ও চেতনার পরিপন্থী। সাম্প্রতিককালে শহুরে পরিসরে এক শ্রেণীর মানুষের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখকে প্রধানত উদযাপন করে হিন্দু ধর্মানুসারে গণেশ দেবতার মূর্তি এবং শক্তি ও মঙ্গলের প্রতীক বিভিন্ন দেবদেবীর বাহনের মূর্তি নিয়ে যেমন- কার্তিকের বাহন ময়ূর, মা স্বরস্বতীর বাহন হাঁস, মা লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা এবং আরো বিভিন্ন রাক্ষস-খোক্ষস ও জীবজন্তুর বিশাল বিশাল মূর্তি নিয়ে মঙ্গলশোভাযাত্রা করার মাধ্যমে। বস্তুতপক্ষে এখনো আমাদের দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের গণেশপূজার সময় মঙ্গলশোভাযাত্রা হয়ে থাকে। পহেলা বৈশাখে এ যেন আমাদের মুসলিম জাতিসত্তা ও আত্মচেতনার দিককে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির দিকে ঘুরিয়ে নেয়ার এক মহাযজ্ঞ! সুতরাং ‘সার্বজনীন বাঙালি উৎসব’, ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ ইত্যাদি স্লোগান হচ্ছে মন-মগজে বিজাতীয় সংস্কৃতি ও পৌত্তলিকতার চর্চার বীজ ঢুকিয়ে বস্তুতপক্ষে এদেশের গণমানুষের তৌহিদি ভাব ও চেতনা এবং ইসলামের প্রভাবকে সঙ্কুচিত করার দুরভিসন্ধির নামান্তর মাত্র।

পহেলা বৈশাখের সময়কার মঙ্গলশোভাযাত্রাকে হাজার বছরের ঐতিহ্য বলা ভুল এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত; কেননা বিগত ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে ক্ষমতা ও মঙ্গলের প্রতীক হিন্দুদের পৌরাণিক দেবদেবীদের বাহনের মূর্তি নিয়ে এবং বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের উদ্ভট মুখোশ পরে মঙ্গলশোভাযাত্রার মাধ্যমে ব্যাপক ঢোলবাদ্যে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। অথচ অতীতে এই আড়ম্বরপূর্ণ ও ঘটা করে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়নি, বরং তখন এই উৎসবের দিনে পুরো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব, শুল্ক পরিশোধ ও খাজনা আদায় করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। হিন্দু মহাজন ও জমিদাররা নিজেদের প্রজাদের মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন করতো, যা ‘পুণ্যাহ’ নামক একটি অনুষ্ঠান ছিল। নতুন বছরের জন্য হালখাতা খোলা হতো। অথচ এখন এসবের চেয়েও বিকৃত উদযাপনটাই প্রাদুর্ভাব হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিশেষত শহুরে মধ্যবিত্তদের ঘরে ঘরে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। যেখানে গরিব-দুখীদের নিত্যই পান্তাভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে হয় এবং তারা উৎসব হিসেবে করে না, বৈশাখের সাথেও তার কোন সম্পর্ক নেই। সচ্ছল মধ্যবিত্তদের উচ্চবিত্তদের একদিনের জন্য পান্তাভাত খেয়ে ‘বাঙালি’ হওয়া কীভাবে সার্বজনীনতার পরিচায়ক হয় আমার বুঝে আসেনা। অধ্যাপক যতীন সরকার বলেছেন, ‘পান্তা-ইলিশ’কে বৈশাখের উপলক্ষ করা বানোয়াট ও ভণ্ডামির অংশ।’ 

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ এদেশের বঙ্গীয় মুসলমানরা অবশ্যই উদযাপন করে আসছে এবং উদযাপন করবে। কিন্তু উদযাপনরীতি ইসলামের মৌলিকত্ব বা তৌহিদের ধারণার বিরোধী হবে না। কোনো স্থানীয় বা দেশজ কালচারের সাথে ইসলামের স্বভাবতই কোনো বিরোধ নেই, যতক্ষণ তা ইসলামের তৌহিদি ভাব ও চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক না হবে। ইসলাম মোটেও সাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা দেয়না। এতদ্ঞ্চলের স্থানিক বঙ্গীয় সংস্কৃতির সাথে এতদিন উদারভাবে সমন্বয় করে এসেছে বলেই ইসলাম এখানে বৃহত্তরভাবে প্রসার ও বিস্তার লাভ করতে সক্ষম হয়েছে, যেভাবে সক্ষম হয়েছিল আরবের স্থানিক কালচারের সাথে বোঝাপড়া ও সমন্বয় সাধন করে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জামানায়। আমাদের এখানকার স্থানীয় সংস্কৃতি যেমন: বাংলা নববর্ষ উদযাপন, স্বাধীনতা দিবস, মাতৃভাষা দিবস ইত্যাদি জাতীয় উৎসবের বিরোধী ইসলাম নয়, তবে প্রতিমাপূজা, প্রতিমাভক্তি, স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিসৌধে নৈবেদ্য বা পূজার ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে ফুল দেয়ার মতো পৌত্তলিক জাহেলিয়াত এবং নববর্ষ উদযাপনের নামে বেলেল্লাপনা ও অশ্লীল উদ্দামতাকে ইসলাম সমর্থন করে না। উৎসবের নামে অত্যুৎসবের চর্চা তথা যথেচ্ছাচার এবং ইসলামী মূল্যবোধ ও তাওহিদের সাথে সাংঘর্ষিক এমন বিজাতীয় কৃষ্টির অনুপ্রবেশ ইসলাম অনুমোদন করে না। তার মানে কি ইসলাম উদার নয়? অবশ্যই উদার। ইসলাম তার একত্ববাদ ও নিরাকারের ধারণা সমুন্নত রাখার জন্যই এসব পৌত্তলিক ও শেরেকবাদী জাহেলিয়াতকে মেনে নেবে না। এটা তার আদর্শিক লড়াই এবং চ্যালেঞ্জ। এটা সত্য যে, ইসলাম আধুনিক সভ্যতার সু-অভিজ্ঞতাগুলোকে উপেক্ষা করে না, এক্ষেত্রে সে অ্যাকোমোডেটিভ। এমনকি আধুনিক সভ্যতার যেসব মেগা প্রকল্প নিয়ে পশ্চিমারা কাজ করে থাকে, সেসবেও ইসলাম তার নিজস্ব ফাংশন নিয়ে হাজির হতে চায়, তবে নিজের তৌহিদি চেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। এজন্যই বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের এত অধপতনের পরও ইসলাম টিকে আছে স্বমহিমায়, শুধুমাত্র তার অবিমিশ্র তৌহিদি আদর্শের জোরেই।

এখানে প্রসঙ্গত ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়। এতদ্ঞ্চলে আগত মুসলিম শাসক ও পীর-আউলিয়াগণ ইসলামের সুমহান সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রসারের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষ দলিত ও শোষিত হিন্দু চাষাভূষার সমাজকে যে মুক্তির দিশা দিয়ে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন- সেই ইতিহাসকে বরাবর আড়াল করার কসরত করা হয় কথিত ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’র নামে। নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকভাবে আমরা জানি, আমাদের এখানকার হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষ ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং তাদের যাবতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব, কৃষ্টি ও জীবনাচারগুলো কার্যত ছিল হিন্দু পৌরাণিক ও সনাতনী ভাবধারায় সিক্ত। একইভাবে এটাও সত্য যে, জাতপাতের বিভেদে জর্জরিত সেই সনাতনী হিন্দু সমাজে এলিট হিন্দু জমিদার ও মহাজনরা হিন্দু চাষাভূষা ও গরিব প্রজাদের ওপর নির্মম শোষণ ও অত্যাচার চালাতো; কিন্তু বাংলায় পীর-আউলিয়াদের আগমনে সেই শোষিত ও দলিত শ্রেণির হিন্দুরা জাহেলি বৈষম্য ও জমিদার-মহাজনদের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে ইসলামের মহান ও উদার ছায়াতলে এসে মুক্তির আশা করতে পেরেছিল। এভাবে জাতপাতের বিভেদপন্থী হিন্দু ধর্ম ছেড়ে এবং পীর-আউলিয়াদের আধ্যাত্মিক ও মানবিক স্পর্শে এসে আমাদের পূর্বপুরুষদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম হয়েছিলেন। এরই পরিক্রমায় সমগ্র বাংলায় ইসলাম তার ভাবাদর্শ উঁচু করে বিস্তার ও প্রসার লাভ করে। আর ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকরা বর্বর বর্ণবৈষম্য ও জাতপাতের সংস্কৃতির বিপরীতে ইসলামের প্রচারের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মানবিকতা, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মহান সংস্কৃতি গড়ে তোলেন। এরপর ব্যবসা-বাণিজ্যের মুলা ঝুলিয়ে ব্রিটিশ বেনিয়ারা ভারতবর্ষে প্রবেশ করে এক পর্যায়ে কূটচাল ও হিন্দুদের সহায়তায় মুসলিম শাসকদের উৎখাত করে। ব্রিটিশরা প্রায় দুইশ’ বছর ভারত শাসন করে। পড়ন্ত বেলায় ব্রিটিশরা ‘ভাগ করো শাসন করো’ নীতিতে এগুতে চাইলেও তাদের আর শেষরক্ষা হয়নি। পর্যায়ক্রমে সাতচল্লিশে দেশভাগ হলো এবং ১৯০৫-১১ সাল পর্যন্ত সম্ভব না হলেও অবশেষে দেশভাগের সময় বঙ্গভঙ্গ হয়। ধর্মীয় বিবেচনায় হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ চলে গেলো ভারতের সাথে, আর তদ্রƒপ মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গ চলে গেলো পাকিস্তানের সাথে। 

এরপর তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের পাকিস্তানি বাঙালিরা ভারতের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রক্তাক্ত ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের অত্যাচার ও শোষণের কবল থেকে নিজেদের মুক্ত করে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তোলে; কিন্তু পিন্ডি ছাড়লেও দিল্লি আদৌ ছাড়েনি আমাদেরকে। এজন্যই মাঝেমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় বাঙালি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিরা যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, তখন পরিষ্কার ভৌগোলিক রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বাস্তবতা সত্ত্বেও তারা দুই বাংলাকে এক হওয়ার অলীক ও হাস্যকর আহ্বান জানান। কিন্তু আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভৌগোলিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ভারতীয়; পক্ষান্তরে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী। তাই ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমবঙ্গীয়রা যতটা না বাঙালি তারচেয়েও বেশি ভারতীয়, আর এদিকে আমরাও যতটা না বাঙালি তারও বেশি বাংলাদেশি। নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই এখানে মুখ্য বিষয়, কেননা এটা জাতিরাষ্ট্র তথা আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের বিষয়। পাশাপাশি অবস্থিত কানাডা ও আমেরিকার ভাষা এক হলেও তারা তো ভৌগোলিকভাবে এক হওয়ার চিন্তা করছেনা। এছাড়াও ধর্মীয়ভাবে উভয় বাংলার স্বাতন্ত্র্য ও পার্থক্য ষোলআনাই বিদ্যমান। এমতাবস্থায় উভয় বাংলাকে এক হওয়ার আহ্বান স্পষ্টতই আবেগী হাউস মাত্র এবং ক্ষেত্রবিশেষে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও বটে। মজার ব্যাপার হলো, পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তাদের ভারতমাতাকে ত্যাগ করবে না; তার মানে, উভয় বাংলা এক হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, বাংলাদেশের জনগণকে তাদের এতদিনের গড়া স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ধুলায় লুটিয়ে দিয়ে, মুসলিম জাতিসত্তার চেতনা ও আদর্শিক স্বাতন্ত্র্য ভুলে গিয়ে এবং তৌহিদি চেতনা জলাঞ্জলি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাথে যোগ দিয়ে ভারতমাতার কাছে আত্মসমর্পণ করা- অর্থাৎ এটি প্রকারান্তরে হাজার বছরের সংস্কৃতি তথা হাজার বছর আগের হিন্দু সনাতনধর্মিতার দিকে প্রত্যাবর্তন করা। এটাই হচ্ছে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি তত্ত্বের মূল অভিসন্ধি। বিখ্যাত প্রগতিশীল লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা এম আর আখতার মুকুল তাঁর ‘কোলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী’ বইয়ে লিখেছেন, “বাংলার ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে শুরু করে পুরো ঊনবিংশ শতাব্দী ধরে কোলকাতাকেন্দ্রিক যে বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে, তাদের কর্ণধারেরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের দাবিদার হিসেবে যত কথাই বলে থাকুক না কেন, তা আসলে বাঙালি হিন্দু জাতিয়তাবাদের কথাবার্তা।” উল্লেখ্য যে, নিকট-অতীতে ‘বাঙালি’ বলতে মূলত হিন্দু সম্প্রদায়কেই বুঝানো হতো, মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে বলা হতো ‘মোহামেডান’। এমনকি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথের আইকন সাম্প্রদায়িক মুসলিমবিদ্বেষী সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিচন্দ্রের মতো সাহিত্যিকরাও তাদের সাহিত্যকর্মে তৎকালীন বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাঙালি’ বলে স্বীকৃতি দিতে চাননি। বিশেষত কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসগুলোতে মুসলমানদের যাচ্ছেতাই গালাগালি করেছেন এবং মোঘল আমলের ন্যায়পরায়ণ ও মহান মুসলিম স¤্রাটদের সম্পর্কে নির্লজ্জ মিথ্যাচার ও কুৎসা রটিয়েছেন।

ব্রিটিশ বেনিয়া ও তাদের কোলাবোরেটর হিন্দু প্রভাবশালী জমিদারদের মিলিত কুচক্রে ভারতবর্ষ তথা দিল্লি ও বাংলার সিংহাসন থেকে মুসলিম শাসকদের উৎখাত করার পর ব্রিটিশদের সুদীর্ঘ শাসন নিশ্চিত হয় এবং সময়ের পরিক্রমায় দেশভাগের পরিণতিতে কংগ্রেস নেতা নেহরুর হিন্দুত্ববাদী সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ বাস্তবায়নের বঙ্গকেন্দ্রিক প্রাপাগান্ডাটি হলো, উপস্থাপিত ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’। হাজার বছর আগের অর্থাৎ হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিই তো হচ্ছে প্রাচীন হিন্দু সনাতনধর্মীয় কৃষ্টি-কালচার। কিন্তু সেটা মিলিত কোন কালচার নয়। সে কালচারের দেশজ অংশ মুসলমানরা গ্রহণ করেছে, বর্জন করেছে হিন্দুয়ানী অংশ। হাজার বছরের মধ্যে যে ইসলাম এখানে তার মহান আদর্শ তথা তাওহিদ ও মানবিকতার উদ্বোধন ঘটিয়ে মুসলিম নামের একটি জাতিসত্তা ও তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও আদর্শিক মূল্যবোধ গড়ে তুলেছে, সেটিকে চাপা দেয়ার জন্যই চলছে একটি মহলের প্রাণান্ত চেষ্টা। মুসলিম নামধারী এক শ্রেণীর লোকের কাছে দাঁড়ি-টুপি, ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মাদ্রাসাগুলো একধরনের মানসিক এলার্জির মতো মনে হয়। বঙ্গীয় নাস্তিক ও সেকুলারদের কাছে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ আর ‘ইসলামবিদ্বেষ’ সমার্থক। কারণ মুসলমানদের কুরবানির ঈদের সময় তাদের পশুপ্রেম ও পরিবেশপ্রেম উথলে ওঠে, কিন্তু কালীপূজার উৎসবে পাঁঠা বলি দেয়া আর রাসূল (সা.)-এর নামে কটূক্তির বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত ‘হেফাজতি’দের শহিদ হওয়া তাদের কাছে অভিন্ন হয়ে যায়। দুর্গাপূজার সময় ত্রিশূল হাতে থাকা রণরঙ্গিণী মা দুর্গার তিলকে জোটে ‘সার্বজনীনতা’ কিন্তু মাদ্রাসার নিরীহ তালেবুল ইলমদের কপালে জোটে জঙ্গিবাদের তকমা! 

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বর্তমান কালচারকে বাঙালি জাতীয়তার ধ্বজাধারী সেকুলারদের তরফে বলা হচ্ছে ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’র অংশ এবং এই মর্মে আরো বলা হচ্ছে, এটি ‘বাঙালি’র সার্বজনীন উৎসব। আক্ষেপের সাথে বলতেই হয়, লাখ লাখ শহিদের রক্ত এবং হাজারো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনপূর্বক নিজেদের জন্য একটি সার্বভৌম দেশ গঠন করার চার দশক পার হলেও ‘বাংলা’ থেকে আমরা এখনো ‘বাংলাদেশী’ হতে পারলাম না!। ভাষার কারণে নৃতাত্ত্বিকভাবে আমরা বাঙালি, কিন্তু আমাদের নিজস্ব ভৌগোলিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কি সেটার চেয়েও কম কিছু? আমাদের তো নিজস্ব একটা দেশ আছে এবং মৌলিক রাজনৈতিক ইতিহাস আছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা হচ্ছে পরজীবী অর্থাৎ ভারতমাতার অঙ্গসম, তাই ‘বাঙালিত্বে’র ভবিতব্য ব্যতীত আর কোনো উৎকণ্ঠা ওদের নেই। কিন্তু আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ব্রাহ্মণ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী উচ্চাভিলাষ নিয়ে সব সময়ই উদ্বিগ্ন এবং নিজেদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-স্বকীয়তা ও জাতিরাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার অধিকার সংরক্ষণে আমাদেরকে নিরন্তর লড়াই করতে হয়। মনে রাখতে হবে, মুসলিম জাতিসত্তার পরিচয় ও ইসলামী ভাবচেতনা পরিত্যাগ করলে আমরা নয়া আধিপত্যবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের কবল থেকে কখনো নিজেদের রক্ষা করতে পারবো না। 

লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Email: tareqislampt@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ