ঢাকা, শুক্রবার 07 March 2017, ২৪ চৈত্র ১৪২৩, ০৯ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চিৎকার করিয়া কাঁদিতে চাহিয়া.....

[৩-৪-২০১৭ তারিখে প্রকাশের পর]

জিবলু রহমান : মহাজোটের শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ৯৮ জন নিহত হয়েছেন।

১৯ জানুয়ারি ২০১২ রাতে বরকল উপজেলার সদর ইউনিয়নের লতিবাঁশছড়া গ্রামে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির অঙ্গসংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিক্রম চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

২১জানুয়ারি ২০১২ রাঙামাটির জুরাছড়ি ও কাপ্তাই উপজেলায় বিবদমান দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে কালায়ন চাকমা, সন্তোষ চাকমা, জীবন তঞ্চঙ্গ্যা, নিরঞ্জন চাকমা ও অজ্ঞাত একজন এবং রাইখালীর দীপায়ন চাকমাসহ আরও একজন নিহত হন।

৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ রাঙামাটির নানিয়র উপজেলায় চাঁদা না দেয়ায় হামিদুল হক নামে এক জেলেকে হত্যা করে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২ খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার নাড়াইছড়ি এলাকায় জেএসএস-ইউপিডিএফের বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হন।

১৬ এপ্রিল ২০১২ রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে জেএসএস ক্যাডার সিজিমনি চাকমার শিশুকন্যা আরকি চাকমা নিহত হয়।

২১ মে ২০১২ মিতিঙ্গাছড়িতে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সদস্য অনিমেষ চাকমা, পূর্ণভূষণ চাকমা, শুক্রসেন চাকমা ও পুলক চাকমাকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। রাঙ্গামাটির জুরাছড়ির ঘিলাছড়িতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন ইউপিডিএফর সদস্য বিজয় সিংহ চাকমা। 

৮ অক্টোবর ২০১২ জেএসএসের নানিয়ারচর উপজেলার সাধারণ সম্পাদক অভিলাষ চাকমাকে রাঙামাটির কল্যাণপুরের বাসায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ও ৪৫ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া এবং নারী, সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেই গুম, হত্যা, নির্যাতন বন্ধের প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছে সংস্থাটি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদন ২৩ মে ২০১৩ বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় লন্ডনে প্রকাশ করা হয়। 

৩০০ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলা হয়, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে র‌্যাব ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার ৩০টি ঘটনা ঘটেছে।

 অ্যামনেস্টি বলেছে, অধিকাংশ গুম-এর ক্ষেত্রেই হতভাগ্য ব্যক্তিদের কোনো সন্ধান মেলেনি। আর যাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তাদের দেহে মারধর ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। 

কারাগারে অস্বাভাবিক মৃত্যু হচ্ছে। বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন পিন্টুর পর ৫ জুলাই ২০১৫ রাজধানীর কেন্দ্রীয় কারাগারে মতিঝিলের বিএনপির সাবেক ওয়ার্ড সভাপতি মোসলেউদ্দিন আহমদের (৬০) মৃত্যু হয়েছে। গ্রেফতারের মাত্র ৩ দিনের মাথায় কারাগারে এ নেতার মৃত্যু হলো। 

নিহত মোসলে উদ্দিনের স্বজন শামসুদ্দিন বলেছেন, সুস্থ অবস্থায় ভাইকে ধরে নেয়ার পর তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি বলেন, সুস্থ মানুষ কি করে লাশ হয়ে ফেরত এলেন এর তদন্ত প্রয়োজন। বিএনপির নেতা ড. আসাদুজ্জামান বলছেন, কারাগার থেকে একের পর এক লাশ হয়ে ফিরছেন বিএনপির নেতারা। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, কারাগারে বিএনপির অনেকেই এখন মৃত্যু পথের যাত্রী। যারা জামিনে বেরিয়ে এসেছেন তারাও ভাল নেই। নেতাদের সুস্থ অবস্থায় ধরে নিলেও আটকের পর তারা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন। জামিনে আসা শমসের মুবিন চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাজাহান কারাগার থেকে বের হওয়ার পরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। এতে করে তাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রুহুল কবীর রিজভী, গাজীপুরের মেয়র প্রফেসর আবদুল মান্নান, আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ কারাবন্দি নেতারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। (সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব ৬ জুলাই ২০১৫)

 ১৬ কোটির দেশ বাংলাদেশের অন্তত ৮-১০ কোটি লোক বিএনপির সমর্থক। বর্তমান সরকারের বিরোধী হবেন অন্তত ১৫ কোটি। বিএনপিকে নেতৃত্ববিহীন করে ফেলার লক্ষ্য আওয়ামী লীগ কখনোই গোপন করেনি। খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে নাস্তানাবুদ করার অজস্র কৌশল করা হয়েছে। সরকার আশা করেছিল, অন্য শীর্ষ নেতাদের জেলে দিলেই তাদের পথ পরিষ্কার হয়ে যাবে। কুকুর কাউকে কামড়ালে, কাকে কারো কানে ঠোকর দিলেও খালেদা জিয়া এবং বিএনপির দু-চার কুড়ি নেতার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। সরকারের দলীয়কৃত পুলিশ যাদের ধরতে পেরেছে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেককে আবার মাঝে মধ্যেই রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। স্বভাবতই বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী গা-ঢাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। মির্জা ফখরুল ইসলামকে অসংখ্য ভুয়া মামলায় জড়িয়ে গ্রেফতার করা হয়েছিল। 

২০১২ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এর গেট থেকে সাদা পোশাকধারীরা অপহরণ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষের আসামি সুখরঞ্জন বালিকে। অপহরণের পর বাংলাদেশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা তাকে সীমান্ত পার করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। পরে ২০১৩ সালের ১৬ মে সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, সুখরঞ্জন বালি ভারতের দমদম জেলে আছেন। এর আগে তিনি যে ভারতে আছেন তার খবর দেয় বাংলাদেশের ইংরেজি  দৈনিক নিউএজ। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালি পক্ষ পরিবর্তন করে আসামি পক্ষের হয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গেলে তাকে অপহরণ করা হয়। 

২০১২ সালের ৫ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাদা পোশাকধারীরা অপহরণ করে সুখরঞ্জন বালিকে। সাথে সাথে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১-এ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সকাল ১০টার দিকে ট্রাইব্যুনালের ফটকে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তার গাড়ি আটকে বলেন, শারীরিক অসুস্থতার জন্য একমাত্র তিনি গাড়িতে করে ঢুকতে পারবেন, অন্য আরোহীদের হেঁটে যেতে হবে। এতে অন্য আইনজীবীরা ও আসামিপক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালি গাড়ি থেকে নেমে যান। এ সময় সাদা পোশাকধারী কয়েকজন সুখরঞ্জন বালিকে চড় দেয় এবং টেনে-হেঁচড়ে অন্য একটি গাড়িতে তোলে। তাকে পরে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় জিডি করতে যায় আসামিপক্ষ। তবে জিডি গ্রহণ করা হয়নি।

২০১৩ সালের ১৬ মে সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার অন্যতম সাক্ষী ‘নিখোঁজ’ সুখরঞ্জন বালি ভারতের দমদম কারাগারে বন্দি রয়েছেন। যিনি ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে ‘নিখোঁজ’ হন। বাংলাদেশের ‘নিখোঁজ’ সুখরঞ্জন ও কলকাতার দমদম কারাগারের সুখরঞ্জন একই ব্যক্তি বলে ভারতের কারা কর্তৃপক্ষ, আদালতের নথিপত্র এবং আরও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে নিশ্চিত হয় বিবিসি। (সূত্রঃ দৈনিক দিনকাল ১২ মে ২০১৫)

সারাদেশে ২০১৩ সালে অপহরণসংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৮৭৯টি। এসবের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ছিল ১৪৯, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ছিল ১৩০টি। ২০১২ সালে অপহরণসংক্রান্ত মামলা ছিল ৮৫০টি। এসবের মধ্যে ঢাকা রেঞ্জে ছিল ১৫৬, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ছিল ১২২টি। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে অপহরণ ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬২টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৫টি এবং মার্চ মাসে ৭৯টি। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ