ঢাকা, শনিবার 08 March 2017, ২৫ চৈত্র ১৪২৩, ১০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আসাদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ‘যুদ্ধ’ শুরু?

৭ এপ্রিল, বিবিসি/রয়টার্স/দ্য গার্ডিয়ান/আল জাজিরা : সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি শহরে ‘রাসায়নিক হামলার’ জবাবে  সরকারি বাহিনীর সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে প্রচ- ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
পেন্টাগন জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার থেকে সিরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে ৫০টিরও বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, হামলায় হোমসের কাছের ওই বিমানঘাঁটি সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং এক কর্মকর্তাসহ অন্তত ছয় সিরিয়ান  সৈন্য নিহত হয়েছে।
তবে হোমসের গভর্নর তালাল বারাজি জানিয়েছেন, সেখানে নিহতের সংখ্যা ৫, আহত হয়েছেন আরও চারজন। হতাহতদের মধ্যে বিমানঘাঁটির নিকটবর্তী একটি গ্রামের কয়েকজনও আছে বলে জানিয়েছেন তিনি। 
 যে দুই জাহাজ থেকে ওই হামলা চালানো হয়েছে সেগুলোর নাম ইউএসএস পোর্টার ও ইউএসএস রোস বলে জানিয়েছে মার্কিন বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম।
হামলার ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সিরিয়ার ওই শায়রাত বিমানঘাঁটি থেকেই গত মঙ্গলবার রাসায়নিক হামলা চালানো হয়েছিল এবং তিনিই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। 
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফ্লোরিডার অবকাশযাপন কেন্দ্র মার আ লগোতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি সিরিয়ায় যুদ্ধ শেষ করতে বিশ্বের সব ‘সভ্য দেশের’ সহযোগিতাও চেয়েছেন।
সিরিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার কোনো সেনা সদস্য ও বেসামরিক মানুষ নিহত হননি। গতকাল শুক্রবার দামেস্কর রুশ দূতাবাস এ তথ্য জানিয়েছে। রুশ বার্তা আরআইএর বরাত দিয়ে রয়টার্স এ খবর জানা গেছে।
আরআইএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনও রুশ সেনা ও নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। দূতাবাস খোঁজ-খবর নিচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগেই বিষয়টি রাশিয়াকে জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
পেন্টাগনের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন জেফ ডেভিস এক বিবৃতিতে জানান, হামলার আগে তারা ওই বিমানঘাঁটিতে থাকা রাশিয়ান সেনাদের সরে যেতে বলেছে।
গত মঙ্গলবার সকালে সিরিয়ার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত ইদলিব প্রদেশের খান সেইখানে চালানো ওই রাসায়নিক গ্যাস হামলায় অন্তত ৭২ জন নিহত হন, এদের মধ্যে বহু শিশু রয়েছে।
এরপর বুধবার জর্ডানের বাদশা আব্দুল্লাহর সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, বেসামরিকদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস হামলা চালিয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সীমা অতিক্রম করেছেন।
এদিকে সিরিয়ার আল-শায়রাত বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ‘সর্বাত্মক সমর্থন’ জানিয়েছে সৌদি আরব। এ হামলাকে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ বলেও জানিয়েছে তারা। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এসপিএ-র বরাত দিয়ে এ কথা জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এসপিএ প্রকাশিত সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সৌদি রাজতন্ত্র সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক হামলাকে সর্বাত্মক সমর্থন করে। নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর রাসায়নিক হামলার জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।’
ওই বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপক প্রশংসা করে একে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ বলেও উল্লেখ করা হয়। ওই হামলার জন্য সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকেই দায়ী করছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আরব দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে মার্কিন হামলাকে সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছে সৌদি আরব।
অন্যদিকে বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠকের দাবি জানাবে। রাশিয়ান ফেডারেশন কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির প্রধান ভিক্টর অজেরভের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক।
গতকাল শুক্রবার মার্কিন হামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অজেরভ বলেন, রাশিয়া প্রথমে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠকের দাবি জানাবে। এ কর্মকা- জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন বলেই বিবেচিত হবে।’
নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিবিসির বিদেশ নীতি বিষয়ক সংবাদদাতা পল ম্যাকলরিও জানান, ঘাঁটিতে থাকা রাশিয়ান বাহিনীকে হামলার কথা আগেই জানিয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন ফরাসী সৈন্যদেরও আগেই হামলার খবর জানিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন।
হামলার খবর স্বীকার করেছে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও। এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তারা জানায়, “বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী সিরিয়ার সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আগ্রাসী হামলা করেছে।”
হামলার পর এক বিবৃতিতে হোমসের গভর্নর বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী ও ইসলামিক স্টেটের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সাহায্য করবে।  সিরিয়ার সরকারি টেলিভিশনকে টেলিফোনে তালাল বারাজি বলেন, “সিরিয়ার নেতৃত্ব এবং নীতি বদলাবে না। এই ধরনের হামলা এবারই প্রথম নয়, আমার বিশ্বাস এটি শেষও নয়।”
“স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং দায়েশ সিরিয়ার আরব আর্মি ও রাশিয়ান সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ব্যর্থ হয়েছে, এখন যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সিরিয়ায় তাদের সন্ত্রাসী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে; এবং দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে।”
হামলার আগেই বেশিরভাগ বিমান থেকে সিরিয়ান সৈন্যদের সরিয়ে নেয়া হয় বলেও জানান তিনি।
দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই কোনো দেশে হামলা চালানোর প্রথম নির্দেশ ট্রাম্পের। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগে অবশ্য সিরিয়ায় হামলার তীব্র বিরোধী ছিলেন ট্রাম্প।
২০১৩ সালে এক টুইটে তিনি সিরিয়ায় হামলা চালানোয় সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি সিরিয়ায় সামরিক হামলা বন্ধে সম্ভব সব কিছু করবেন।
সিরিয়ার আল-শায়রাত বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ার প্রশ্নে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রাসায়নিক হামলার অভিযোগে সিরিয়ায় আক্রমণের কথা বললে, তাকে ‘বোকা নেতা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প।
রয়টার্স বলছে, সিরিয়ায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কিছু সময় পরই জ্বালানি তেলের মূল্য প্রায় এক দশমিক ছয় শতাংশ বেড়ে যায়। বেড়ে যায় স্বর্ণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ব-ের শেয়ারমূল্যও। তবে দাম পড়ে যায় ডলারের।
 ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান বেশিরভাগ সিনেটর এ হামলাকে স্বাগত জানিয়েছেন; তাদের কয়েকজন হামলার বিষয়ে কংগ্রেসে ভোট ডাকতে স্পিকার পল রায়ানকে অনুরোধও করেছেন।
বিমান হামলাকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরায়িল। তাদের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতা নিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা।
হামলায় পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে রাশিয়া ও ইরান।
 ক্রেমলিন এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে।
হামলার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার সহকারী রাষ্ট্রদূত ভ্লাদিমির সাফ্রোনকভ সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়ায় সামরিক হামলা এগিয়ে নেয় তাহলে তার ফল হবে নেতিবাচক।
তিনি সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য পশ্চিমা শক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “দায় তাদেরই ঘাড়ে বর্তাবে যারা এই সন্দেহজনক ও মর্মান্তিক উদ্যোগের পেছনে ছিল।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ