ঢাকা, শনিবার 08 March 2017, ২৫ চৈত্র ১৪২৩, ১০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মাদক ব্যবসায়ী হানিফের ফাঁদে পড়ে কুয়েতে সাজা খাটছেন নিরপরাধ সাইফুল 

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : এক মাদক ব্যবসায়ীর প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কুয়েত সেন্ট্রাল জেলে মানবেতর জীবন কাটছে কুয়েত প্রবাসী চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের (৩৮)। ১৫ বছর সাজা মাথায় নিয়ে কারাগারে দুই বছরেরও বেশি সময় পার করেছেন তিনি। তছনছ হয়ে গেছে একটি সাজানো সংসার। ছেলের আশায় এখনো প্রহর গুণছেন বৃদ্ধ মা-বাবা।

জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ অলিনগরের সুলতান আহম্মদের পুত্র হানিফ দীর্ঘ সময় ধরে কুয়েতে অবস্থান করছেন। সে কুয়েতে গাঁজা, হিরোইন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন অবৈধ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সে ৬ থেকে ৭ মাস পরপর ছুটিতে দেশে এসে এসব মাদকদ্রব্য নিয়ে যেত। আবার দেশ থেকে কেউ কুয়েত গেলে কৌশলে তাকে দিয়ে মাদক দ্রব্য নিয়ে যেত। তার ফাঁদে পড়ে এখন কুয়েত সেট্রাল কারাগারে রয়েছেন একই উপজেলার ২ নম্বর হিঙ্গুলী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের জামালপুর গ্রামের ফয়েজ আহম্মদের পুত্র সাইফুল ইসলাম।

জানা যায়, ২০১৫ সালের ২০ মার্চ সাইফুল ছুটি শেষে বাড়ি থেকে কুয়েতের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে মাদক ব্যবসায়ী হানিফ ফোন দিয়ে তার জন্য কুয়েতে কিছু গরুর মাংস নিয়ে যেতে বলে। যাওয়ার দিন সকালে হানিফের খালাতো ভাই মোতালেব গরুর মাংসের প্লাষ্টিক মোড়ানে একটি প্যাকেট সাইফুলের কাছে দিয়ে যায়। একই এলাকার মানুষ তাই সরল মনে না দেখেই ব্যাগটি নেয় সাইফুল। কিন্ত ওই প্যাকেটে মাংসের বদলে ১ কেজি গাঁজা দেয় মোতালেব। বিষয়টি বাংলাদেশে বিমান বন্দরে ইমিগ্রেশনে ধরা না পড়লেও কুয়েত ইমিগ্রেশন পুলিশের তল্লাশিতে ঠিকই ধরা পড়ে।

এরপর সাইফুলকে সেখানকার পুলিশ গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ সময় ধরে সাইফুলের সাথে তার পরিবার কোন যোগাযোগ করতে পারেনি। এরপর কুয়েতে থাকা সাইফুলের আত্মীয় স্বজন হানিফকে ধরলে সে গাঁজা দেয়া কথা স্বীকার করে তার জামিনের ব্যবস্থা করার আশ্বাষ দেয়। সে বলে গ্রেপ্তার হওয়ার তো কথা নয়। সাইফুলের ভাগ্য খারাফ। আমি তো অনেক সময় এদেশে এগুলো নিয়ে এসেছি। কোনদিন তো কেউ ধরা পড়েনি। ৬ মাস পরে সে (হানিফ) অন্য একটি মামলায় ধরা পড়ে দেশে ফিরে আসে। 

এরপর কুয়েতের আদালতে বিচার হয় সাইফুলের। মাদক দ্রব্য সাথে পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে রায় দেয় আদালত। রায়ে তাকে ১৫ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। অবশ্যই এখনো আপিলের সুযোগ রয়েছে। আগামী ২ মাস পর আপিলের একটি সময় নির্ধারণ হতে পারে বলে জানান তার আইনজীবী। এই সময়ের মধ্যে যদি প্রমাণ করতে পারে সাইফুল নির্দোষ তাহলে খালাস পেয়ে জামিন পেতে পারে। 

সাইফুলের আইনজীবী তালাল আজি বলেন, হানিফ দেশে চলে যাওয়ায় মামলায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাইফুলের মুক্তি কঠিন হয়ে গেছে। হানিফকে আটক করে স্বীকারোক্তি নেয়া হলে সাইফুল মুক্তি পাবে।

এদিকে সাইফুল ইসলামের বৃদ্ধা মা নুর নাহারের আহাজারি থামছেই না। ছেলের জন্য বাকরুদ্ধ প্রায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘সকলের সহযোগিতায় আল্লাহর রহমতে আমার নিরপরাধ ছেলে যেন আমার বুকে ফিরে আসে। আমি ছেলেকে দেই নয়ন ভরে দেখতে চাই’। 

সাইফুলের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন মামুন বলেন, কুয়েতে আমার ভাই উটের ব্যবসা করতো। মাসে প্রায় দেড়লাখ টাকা আয় করতো। অনেক সুখে চলছিলো আমাদের সংসার। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ী হানিফের প্রতারণায় সবকিছু এলোমেলা হয়ে গেছে। আমাদের সংসার চলতে এখন অনেক কষ্ট হচ্ছে। 

মাদক ব্যবসায়ী হানিফ ও মোতালেবের বাড়িতে গিয়ে তাদের পাওয়া যায়নি। এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, হানিফ দীর্ঘ সময় ধরে দেশ থেকে বিভিন্ন মাদক দ্রব্য নিয়ে কুয়েতে বিক্রি করতো। প্রবাসীরা দেশ থেকে ছুটি শেষ করে কুয়েত যাওয়ার সময় চালানি বলে মাদক পাঠানো হতো। হানিফকে সহযোগিতা করতেন তার খালাতো ভাই মোতালেব।

এদিকে মাদক ব্যবসায়ী হানিফ ও দেশে তার সহযোগী মোতালেবের বিরুদ্ধে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সাইফুল ইসলামের বাবা ফয়েজ আহম্মদ বাদী হয়ে চট্টগ্রাম অতিঃ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহীদুল্লাহ কায়সারের আদালতে প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। অতিঃচিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) কে মামলাটি তদন্তের জন্য নির্দেশ দেন।

এই বিষয়ে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) পরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, মামলাটি নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। পুরোপুরি তদন্ত শেষ করতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। আমরা তদন্ত করে যা পাবো তা রিপোর্ট করবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ