ঢাকা, শনিবার 08 March 2017, ২৫ চৈত্র ১৪২৩, ১০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ফেসবুক যোগাযোগ

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বিভিন্ন দেশের নিমন্ত্রণ পেয়ে ঘুরছেন। অনুষ্ঠানে যোগদান করছেন। বহুজনের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন। তখন এক সময় লিখেন, ‘কত অজানারে জানাইলে তুমি কত ঘরে দিলে ঠাঁই, দূরকে করিলে নিকট বন্ধু পরকে করিলে ভাই।’ সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা এত সহজ ছিল না। ডাকব্যবস্থাই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। চিঠির মাধ্যমে খবরাখবর ও মনের গভীরের বারতা বিনিময় হতো। টেলিফোন ছিল সীমিত। দূরবর্তী কোনও বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে হলে সরাসরি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হওয়া ছাড়া সম্ভব ছিল না। আর তা ছিল সময় সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুলও। রবিঠাকুরের সময় আজকালকার মতো মানুষে মানুষে, বন্ধুতে বন্ধুতে যোগাযোগ সহজ যেমন ছিল না, তেমনই ছিল না সবার সমান সাধ্যও। কিন্তু সেদিন হয়েছে বাসি। এখন ইন্টারনেট, ফেসবুক প্রভৃতির জন্য দুনিয়াটা একেবারেই হাতের মুঠোয় চলে এসেছে বলা যায়। ফেসবুকের আবিষ্কারক জোকার বার্গের চেষ্টায় মানুষ এখন সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত যোগাযোগ করতে পারে। ভিডিও চ্যাট, ফোনালাপ সবই সম্ভব। এমনকি এর মাধ্যমে একজন মানুষ সম্পূর্ণভাবে কুমেরু থেকে সুমেরুতে থাকা আরেকজনের সঙ্গে নিজেকে মেলে ধরতে পারে অবলীলায়। বলা যায়, পৃথিবীকে আপন করে নেবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের সমকক্ষ এখন আর কিছু নেই। ব্যবসায়-বাণিজ্য, কূটনীতি, প্রেমপ্রীতি সবকিছু সম্ভব এর মাধ্যমে। ফেসবুক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত এতটা সহজতর ছিল না পৃথিবীর সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ করা সবার পক্ষে। এখন যেন আর কোনও বাধাই নেই। সকল দুয়ার গেছে আজ খুলে।
ফেসবুকের মাধ্যমে রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর বাজারের বলাই ঘোষের ছেলে ঢাকা-কলকাতা শ্যামলী পরিবহনের কর্মী সঞ্জয় ঘোষের পরিচয় হয় ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের তরুণী জেইসা ওলিভেরিয়া সিলভার সঙ্গে ১৭ মাস আগে। সঞ্জয় ও সিলভার মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব হয়। প্রায় ১৫ হাজার মাইল দূরের রাস্তা অতিক্রম করে গত মঙ্গলবার রাতে তরুণীটি সঞ্জয়ের বাড়িতে হাজির হয়েছেন। শত শত নারী-পুরুষ ভিড় করছেন সঞ্জয়ের বাড়িতে ব্রাজিলিয়ান মেয়েটিকে একনজর দেখবার জন্য। সিলভা সঞ্জয়কে বিয়ে করতে রাজি। এমনটি না হলে তিনি এতো পথ অতিক্রম করে রাজবাড়িতে ছুটেইবা আসবেন কেন? তার বাবা-মায়ের কোনও আপত্তি নেই। কী দারুণ দুঃসাহসী মেয়ে সিলভা। বাবা-মাকে রাজি করিয়ে ছুটে এসেছেন একাই বাংলাদেশে তার মনের মানুষটির কাছে। হয়তো সঞ্জয়ের বাবা-মাও রাজি আছেন। অন্যথায় সাম্বা নৃত্যের দেশ ব্রাজিলের মেয়ে সিলভাকে বাড়িতে আসতে বলবেন কেন সঞ্জয় ঘোষ। শুধু সঞ্জয়-সিলভার নিজেদের মধ্যেই জানাশোনা হয়নি। হয়তো উভয়ের পরিবারের অন্যদের সঙ্গেও পরিচয়-জানাশোনা হতে পারে ফেসবুকের মাধ্যমে। তাহলে সিলভার বাবা-মা অথবা অন্যরা কীভাবে আসতে দিলেন এতোদূর। অবশ্য বাইরের দেশে ১৮ বছর বয়স হয়ে গেলে ছেলেমেয়েরা আর বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণে প্রায়ই থাকেন না। যা ইচ্ছে করতে পারেন। যেখানে ইচ্ছে যেতে পারেন। থাকেনও। তাই সিলভার কাছে ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে একা চলে আসাটা কোনও বিষয়ই না।
এর আগে আমেরিকা, বৃটেন, জাপান এমনকি সৌদি আরব থেকেও ভালোবাসার টানে কয়েকজন তরুণী বাংলাদেশে এসেছেন। সিলভার ব্যাপারটা তেমন না। এ মেয়ে ফেসবুকের সম্পর্ক ধরেই দুঃসাহস নিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ফেসবুক কালচারের বড় একটা দিকও উন্মোচিত হয়েছে। মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের দিক থেকে ফেসবুক ভালো একটা মাধ্যম। কিন্তু ফেসবুকের এই সম্পর্ক কাউকে কাউকে যুক্তি, সামাজিকতা, নীতিবোধের সীমাকে ভাঙতে উস্কানি বা উদ্বুদ্ধ করতে পারে। লাগামহীন মেলামেশার মতো বেলাগাম যোগাযোগও ব্যক্তি ও সমাজ-সম্পর্কের জন্যে নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে অনেক সময়। কিন্তু তাই বলে এই সামাজিক যোগাযোগ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। উদ্ভূত সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে সেল্ফ কনট্রোল বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এবং এই আত্ম-নিয়ন্ত্রণ আসে ধর্মীয় নৈতিকতা থেকে। এর চর্চা বাড়াবার কোনো বিকল্প নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ