ঢাকা, শনিবার 08 March 2017, ২৫ চৈত্র ১৪২৩, ১০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতে সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কায় বাংলাদেশে অবস্থানকারী লাখ লাখ মুসলমান ও ওয়ারিশানরা

স্টাফ রিপোর্টার : দেশভাগ কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় ভারত ছেড়ে বর্তমান বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনে আশ্রিত বা বসতি স্থাপনকারী মুসলমানদের সম্পত্তি কুক্ষিগত করতে নতুন এক ফন্দি এঁটেছে ভারত সরকার। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, এ লক্ষ্যে ভারত সরকার সম্প্রতি তাদের ‘শত্রু সম্পত্তি’ আইনে পরিবর্তন এনেছে। এতে করে ওইসব দেশান্তরীদের রেখে আসা সম্পত্তিতে ভারতে অবস্থানরত তাদের বৈধ উত্তরাধিকারীদেরও আর কোনো অধিকার থাকবে না। এ অবস্থায় লাখ লাখ ওয়ারিশান তাদের সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় কন্ঠভোটে গত ১৪ মার্চ সে দেশের ‘শত্রু সম্পত্তি আইনে’ যে সংশোধনী পাস করেছে, তার সুবাদে সরকার এখন থেকে সেই সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার পাবে। এই সংশোধনী নিয়ে বিতর্কের সময় সংসদে একাধিক বিরোধী দল অভিযোগ করেছিল এটি একটি মুসলিম-বিরোধী পদক্ষেপ, কিন্তু সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে।
ষাটের দশকে চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধ লড়ায়ের পর ভারত ১৯৬৮ সালে ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ পাস করেছিল। দীর্ঘ ৪৯ বছর পর আইনে উদ্দেশ্যমূলক সংশোধনী আনা হয়েছে। এই সংশোধনী অনুসারে, যারা তখন ভারত ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ), পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) বা চীনে চলে গিয়েছিলেন তারা মারা যাওয়ার পরও ভারতে থেকে যাওয়া তাদের ওয়ারিশরা তাদের সম্পত্তি আর কখনোই ফিরে পাবেন না- ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে সরকার তা জব্দ করতে পারবে।
সংসদে শত্রু সম্পত্তি বিলটি পাস করানোর সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং দাবি করেন, এই বিলটিকে জাতি বা ধর্মের দৃষ্টিকোণে দেখা কখনোই উচিত হবে না। কারণ শুধু পাকিস্তানে চলে যাওয়া লোকেরাই নন, অনেক চীনা নাগরিক ও তাদের সম্পত্তিও এর আওতায় এসেছে। তিনি বলেন, “মনে রাখতে হবে, যাদেরকে আমরা শত্রু বলে গণ্য করেছি তাদের মৃত্যুর পর তাদের মালিকানাধীন সম্পত্তির রং বদলে যেতে পারে না, তখনও সেটা শত্রু সম্পত্তিই থাকে।”
তবে সংসদে বামপন্থী দল আরএসপি-র এনকে প্রেমাচন্দ্রন দাবি করেন, এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল। এই আইন সঙ্গত নয় কারণ এটি সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদের চেতনার বিরোধী। প্রকৃতপক্ষে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
সংসদে ওই বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে কংগ্রেস নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অধীর রঞ্জন চৌধুরি অভিযোগ করেন, এই আইনের প্রভাবে বিশেষ করে মুসলমানরা আর্থিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে যদি কোনো সংশয় থাকে তাহলে সরকারের উচিত তার সমাধান করা। কিন্তু এর পরিবর্তে দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞা  তৈরি করা হচ্ছে।
কংগ্রেস নেতা শশী থারুর আরও স্পষ্ট করে বলেন, এই বিল ভারতের মুসলিমদেরই বেশি ক্ষতি করবে। তার কথায়, “সোজা কথা সোজা বলাই ভাল - এই বিল ভারতের লাখ লাখ নাগরিকের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে, আর তারা সবাই মুসলিম। চীনাদের সম্পত্তির পরিমাণ এখানে খুবই কম। পাকিস্তানে যে শুধু একটি সম্প্রদায়ের লোকই গিয়েছিলেন তা আমরা সবাই জানি। ফলে এখন এই পদক্ষেপ আমার মতে প্রায় অসাংবিধানিকই শুধু নয় - স্বাভাবিক ন্যায়েরও পরিপন্থী।”
ভারত সরকার অবশ্য এই যুক্তির তোয়াক্কা করছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা পাকিস্তানের নেয়া পদক্ষেপের পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছেন মাত্র এবং তা কিভাবে স্বাভাবিক ন্যায়ের বিরোধী সেটাই তার মাথায় ঢুকছে না। রাজনাথ সিংয়ের পাল্টা যুক্তি, “পাকিস্তান তো ভারতীয় নাগরিকদের সম্পত্তি জব্দ করে রেখেছে। তা তো তারা ওয়ারিশদের কখনো ফিরিয়ে দেয়নি। ফলে আমার মতে ন্যায় সেটাই হবে যখন আমরাও তাদের সম্পত্তি তাদের উত্তরাধিকারীদের হাতে তুলে দেব না।”
সংশোধনীর পরদিন বিবিসি বাংলা “ভারতে ‘শত্রু সম্পত্তি’ আইনে পরিবর্তন: বঞ্চিত হবেন ওয়ারিশানরা” শিরোনামে একটি খবর প্রচার করে, যেটিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বা পরবর্তীকালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় যারা ভারত ছেড়ে তখনকার পূর্ব বা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন ভারতে থেকে যাওয়া তাদের বৈধ উত্তরাধিকারীদেরও তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে আর কোনও অধিকার থাকবে না।”
বিবিসি বলেছে, এই বিলে সম্ভবত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মুহাম্মদাবাদের রাজার উত্তরাধিকারী আমির মুহাম্মদ খান, যিনি উত্তর প্রদেশে প্রায় ৯০০ সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ছেন। নতুন বিল পাসের ফলে তার পরিবারের ওই সকল সম্পত্তির উপর থেকে মালিকানার অধিকার শেষ হয়ে যাবে। এবার থেকে ওই সব সম্পত্তির মালিকানা চলে আসবে কেন্দ্রীয় সরকারে হাতে। কেবল উত্তর প্রদেশেই এ ধরণের ১,৫১৯টি সম্পত্তি রয়েছে যাদের মালিকানা কেন্দ্রীয় বিল পাসে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর ও তার ছেলেমেয়েরাও এই আইনের জেরে কিছু সম্পত্তি খোয়াতে পারেন, কারণ শর্মিলার মরহুম স্বামী মনসুর আলি খান পতৌদির এক আত্মীয় বেশ কয়েক দশক আগে পাকিস্তানে গিয়ে বসত করেছিলেন।
বিবিসিসহ ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উক্ত শত্রু সম্পত্তি বিল পাসের প্রেক্ষিতে ও ভারত সরকারের লাভের বিষয়টি উল্লেখ হলেও ওই সময় ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে আসা তৎকালীন প্রায় ৭০ লাখ মুসলমানের সম্পত্তি গ্রাসের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত জেলার একটি মুসলমান পরিবারের আংশিক ঢাকায় বসবাস করেন। সেখানে তাদের কয়েক কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি রয়েছে, যেগুলো আত্মীয়-স্বজন ও কেয়ার্টেকারের মাধ্যমে দেখাশোনা করা হচ্ছে। ওই পরিবারের একজন সদস্য দৈনিক সংগ্রামকে এ বিষয়টি জানিয়ে বলেন, তাদের মতো বহু মুসলমান পরিবার ঢাকা শহরেই রয়েছেন, যাদের কোটি কোটি টাকার জায়গা-জমি উত্তরাধিকাররা ভোগ-দখল করে আসছেন। শত্রু সম্পত্তি বিলটি কার্যকর হলে যৌক্তিক কারণে ভারত ত্যাগী বিপুল সংখ্যক মুসলমান আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ওয়াকিবহালমহল বলছে, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম ত্রিপুরা প্রভৃতি এলাকা থেকে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ এবং ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ও হিন্দু-মুসলিম ব্যাপক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে লাখ লাখ মুসলমান তাদের জমি-জমা, বিষয়-সম্পত্তি ফেলে শুধু প্রাণ বাঁচানোর জন্য এদেশে চলে আসে। এসব মুসলমানদের ভূমি প্রত্যর্পণের বিষয়টি কখনই বিবেচনায় নেয়নি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বাংলাদেশের নাগরিক নন এমন কারো পক্ষে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত পাবার আবেদন করার সুযোগ নেই। বিষয়টি দুই দিক থেকেই দেখতে হবে, যে সব মুসলমান ভারতে সম্পত্তি ফেলে এসেছেন ভারত সরকারের উচিত তাদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়া। না হলে বিষয়টি প্রশ্ন বিদ্ধ হবে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চারদিনের ভারত সফর শুরু হয়েছে গতকাল শুক্রবার। বাংলাদেশ সরকার ভারতে চলে যাওয়া হিন্দুদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে আইন প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। অথচ ভারত সরকার যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ভারত ত্যাগী মুসলমানদের জায়গা-জমি, স্থাপনা ফিরিয়ে না দিয়ে জব্দ করার কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে। এতে খোদ ভারতে যেমন প্রতিক্রিয়া-বিতর্ক দেখা দিয়েছে, এদেশে বসবাসকারী ভারত থেকে আসা নাগরিকরা মূল্যবান সম্পত্তি হারানোর শংকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে বসবাসকারী ওই সব ভারত ত্যাগীদের সূত্র বলছে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় এবং ১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালে ভারত থেকে প্রায় ১ কোটি মুসলমান পাকিস্তানের অধীনে থাকা তৎকালীন পূর্ব-বাংলায় তথা পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে পূর্ব-পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তারা নেহায়েত পরিস্থিতির কারণে ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। স্বেচ্ছায় তারা স্বভূমি ত্যাগ করে এখানে আসেননি। পরিস্থিতি তাদেরকে বাধ্য করেছিল উদ্বাস্তুর ন্যায় এদেশে পাড়ি জমাতে। একইভাবে পাকিস্তানের শাসনাধীন পূর্ব বাংলা ও পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে হিন্দু-সম্প্রদায়ের কোটিরও বেশি মানুষ একইভাবে পাড়ি জমিয়েছিলেন পরিস্থিতির কারণে।
ভারত সরকার তাদের শত্রু-সম্পত্তি বিলে সংশোধনী এনে যে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, তাতে ভারত থেকে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) আসা বিপুল সংখ্যক জনগণকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা মানুষের সংখ্যার একটা খসড়া ধারণা বা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ধরা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি বা, প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ ভারত থেকে আসা। অনুমান-নির্ভর এ সংখ্যাটি বংশ বৃদ্ধির হিসাবে। বৃহৎ এ জনগোষ্ঠীকে ‘বন্ধু’-রাষ্ট্র ভারত যখন ‘শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করে, তখন তা স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তথা পুরো জাতির জন্য চরম অবমাননাকর। কারণ, যখন ভারত থেকে মুসলমানরা ভয়াবহ সঙ্কটময় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েই এখানে এসেছিলেন। স্বেচ্ছায় ভারত ত্যাগ করে নয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানের অধীন রাষ্ট্রও নয়। তাহলে, শত্রু-সম্পত্তি আইনে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার যুক্তিটা কি? প্রধানমন্ত্রীর জন্যও কি এ সফরটা অপমানজনক নয়?
পাকিস্তান শত্রু-সম্পত্তি আইনে ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু-সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করেছে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। তার প্রেক্ষিতে ভারত সরকার পাল্টা-পদক্ষেপ হিসেবে এ আইন পাস করেছে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে যুদ্ধও করেছে ভারত। কিন্তু, এর সঙ্গে বাংলাদেশকে জড়ালো কেন? বাংলাদেশের সঙ্গে তো যুদ্ধের নয়, মিত্রতার সম্পর্ক।
বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্র জানায়, ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা এক-পঞ্চমাংশের বেশি জনগোষ্ঠী তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সেখানে রেখেই চলে এসেছিলেন। আজকের হিসাবে ভারতে তাদের রয়ে যাওয়া সম্পত্তির পরিমাণ লাখ লাখ কোটি টাকার। জমিজমা ও সম্পত্তির দাম সব জায়গাতেই শত-শত গুণ, কোথাও বা হাজার-হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বন্ধুত্বের সম্পর্কের কথা বিবেচনায় ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা মুসলমানদের তাদের সম্পত্তির অধিকার ফিরিয়ে দেয়া ভারতের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। কারণ, এ মানুষগুলো অবৈধভাবে বাংলাদেশে আসেননি এবং তারা তাদের ভারতে রয়ে যাওয়া সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী, অবৈধ নন। তারা কোন অপরাধ করেননি। ভারত সরকার ভবিষ্যতে তাদের সম্পত্তি ভোগের অধিকার ফিরিয়ে দেবে এটাই এদেশবাসীর কাম্য। অন্তত, ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের মুসলমানরা তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে আসার অধিকারটুকু পাবেন, এটুকু আশা করা মোটেই অতিরঞ্জিত নয়। হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে তারা ন্যায্য মূল্য পাবেন না, তবু তাদের অধিকার তাতে রক্ষা পাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ