ঢাকা, শনিবার 08 March 2017, ২৫ চৈত্র ১৪২৩, ১০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিক্ষাব্যবস্থায় অরাজকতা বন্ধ করতে হবে

জি.কে. সাদিক: অরাজকতা সভ্যতার জন্য বড় হুমকি। যেখানে অনুকূল পরিবেশ নেই সেখানে কোন কাজ সফলভাবে করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে তা করা সম্ভব হয় না। উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো অনুকূল পরিবেশ। সামনে চলতে সবাই চায় কিন্তু পেছন থেকে যদি অশুভ শক্তি টেনে ধরে তাহলে সামনে চলা কঠিন হয়ে যায়। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। তাহলে বিশ্বের অগ্রযাত্রার সাথে আমাদের সহযাত্রী হতে হবে। যে ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব তার সাথে আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে। বিশ্ব আজ যে চাকার ওপর ভর করে চলছে সেটা হলো শিক্ষার চাকা। যে জাতি যতো শিক্ষিত তারা বর্তমানে  বিশ্বের বুকে ততো উন্নত। বর্তমান বিশ্বে শিক্ষাকে উন্নয়নের মানদ- ধরা হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে আমরা উন্নয়নের সোপান এই শিক্ষাব্যবস্থায় কতটা উন্নয়নের উপযোগী হতে পারছি বা আমরা কি পেরেছি উন্নয়ন মুখী শিক্ষাব্যবস্থার নিশ্চিত করতে?
শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলোতে চাই শিক্ষার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা। যেকোন কাজে সুফল পাওয়ার জন্য প্রয়োজন তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সেরকম ক্ষেত্র কি প্রস্তুত আছে? কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই কোথাও নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রেণিকক্ষ, কোন বিদ্যালয়ে এখনো পৌঁছেনি প্রয়োজনীয় শিক্ষার উপকরণ, নেই খেলার মাঠ, নেই বিজ্ঞানাগার। থাকলেও বা ব্যবহারের যোগ্য নয় সেগুলো। সব চেয়ে যেটা নেই সেটা হলো শিক্ষক। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষাঙ্গনে সারাবছর লেগে আছে রাজনীতির নামে সন্ত্রাস। বন্ধ থাকছে বছরের অর্ধেকটা সময়। তাহলে শিক্ষা থাকে কোথায়? মানসম্পন্ন শিক্ষা তো বহু দূরের কথা।
সময়ের সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়েনি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা যার ফলে সেরা মেধাবীরা উচ্চশিক্ষা শেষ করে আর শিক্ষকতায় আসতে চায় না। দুর্নীতি, কোটা আর নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসার অগ্রহ হারিয়ে বসেছেন, সে স্থান দখল করে বসেছে অযোগ্যরা। সিলেবাসগত সমস্যা, শিক্ষকসংকট, পরিবেশগত সমস্যা, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, অযোগ্যদের ভিড় সব মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে অরাজকতার মহারাজ্য।
গত ১৩ মার্চ দৈনিক সংবাদ পত্রিকার পৃষ্ঠায় যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় তা আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অরাজকতার চিত্রের প্রকাশ। সে প্রতিবেদনে বলা হয় যে, সারা দেশের ২৯ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক নেই। সে হিসাব মতে সারাদেশে ১৭ হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ে নেই প্রধানশিক্ষক। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধানশিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৬০ হাজার ৪৬টি। সে হিসেবে ২৯ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষকের পদটি শূন্য পড়ে আছে। অন্যদিকে প্রায় ২৫ হাজার সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। শিক্ষকহীন বিদ্যালয়ে কেমন পাঠদান চলে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সারাদেশে এমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ও আছে যেগুলোতে একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে।  গত ১০ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার ১১ পৃষ্ঠায় এমন সংবাদ প্রকাশ হয়।  কোন কোন বিদ্যালয়ে চলছে দুজন শিক্ষক দিয়ে রোটেশন পদ্ধতিতে ক্লাস। ১ জন শিক্ষক পড়াচ্ছেন শতাধিক শিক্ষার্থী। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণির সব শিক্ষার্থীদের একজাগায় করে একজন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন, এ রকম বিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক। তাহলে এই বিদ্যালয়গুলো থেকে কী করে মানসম্পন্ন শিক্ষা পাওয়া সম্ভব বা যে শিক্ষার্থী এই সব বিদ্যালয় থেকে পাঠ শেষ করে বের হবে তারা কী পারবে উয়ন্নয়নের সহযোগী হতে?
এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে যেগুলোতে প্রধানশিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক কাজ এবং একাডেমিক অনেক কাজ বন্ধ হয়ে আছে। অন্য শিক্ষকরা ক্লাস নেয়া বাদ দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে সময় দেওয়ার ফলে বিদ্যালয়ে চলছে শিক্ষাহীন অরাজকতা। নানা বিধি সমস্যায় পড়ে পাঠদান প্রায় বন্ধ হয়েই আছে। এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে যে অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়টিই সে অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক ও শিক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জমাদির অভাবে পাঠদান বন্ধ হয়ে পড়ায় সেসব অঞ্চলের অভিবাবকরা পড়েছেন বড় বিপদে। কেউবা সন্তানকে পড়া-লেখা বাদ দিয়ে সংসারের কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। আবার অনেে এলাকাতে এর ফলে মেয়ে শিশুদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। একদিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে বাল্যবিবাহ আরেক দিকে বৃদ্ধি পাচ্ছে শিশুশ্রম। সরকার বাল্যবিবাহ ও শিশু শ্রম বন্ধের জন্য শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে।
সম্প্রতি সময়ে সরকারি-বেসরকারি, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও ও প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রতি বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সে আগ্রহের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার যোগান দিতে পারছে না। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করছে কিন্তু তার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার উপকরণের যোগান দিতে পারছে না।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থার (ইউনেস্কোর) হিসাব অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতি ৪৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকা বাঞ্ছনীয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নিয়ম চললেও বাংলাদেশে এই নিয়ম উপেক্ষিত প্রায়। সম্প্রতি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান ও আস্থা নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকাশিত ‘অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল সেন্সাস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ৪৬ জন শিক্ষার্থী পেছনে ১ জন শিক্ষক আছে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ বিদ্যালয়ে। বাকি ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয় এখনো এই নিয়মের আওতাভুক্ত হতে পারেনি বা সরকার এই ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে পারেনি। প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ২০১৬ অনুযায়ী ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষকদের মধ্যে ৫১ শতাংশ এখনো লিডারশিপ প্রশিক্ষণের বাইরে আছে। মানে তারা একাডেমিক, প্রশাসনিক ও মনিটরিং সকল বিভাগে সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য উপযুক্ত না। অন্যদিকে বিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গবেষণা প্রতিবেদন মতে, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতি ৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার পরিবেশের অনুকূলে একটি শ্রেণিকক্ষ নির্ধারণ করার কথা। কিন্তু মাত্র ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ বিদ্যালয়ে এই নিয়মের বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। সারাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেই শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। এমনকি কোন কোন বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে গাছতলায় আবার কখনো বা খোলা আকাশের নিচে চলছে পাঠদান। গাছের নিচে আর খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করে কতটা মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়?
এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে যেগুলোতে শ্রেণিকক্ষের অভাবে ক্লাস শুরুই করতে পারেনি। লৌহজংয়ের উয়ারী সরকারি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের অভাবে ৭ম শ্রেণির ক্লাস বন্ধ হয়ে আছে।
২০১৬ সালে নতুন করে ৮ম শ্রেণি চালু করলেও ক্লাস শুরু করতে পারছে না শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে। (দৈনিক কালের কণ্ঠ ১১ মার্চ পৃ.১৯) অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ৫০টি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে। ফলে কোন ক্লাস হচ্ছে বারান্দায় বা মেঝেতে আবার বাইরে খোলা আকাশের নিচেও নেওয়া হচ্ছে ক্লাস। আসবাবপত্রসহ বেঞ্চের সংকট রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। (দৈনিক শিক্ষা ১০ মার্চ) সারা দেশে প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি বিদ্যালয় রয়েছে যেগুলোতে শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষার উপকরণের পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে। (দৈনিক সমকাল ২৮ জানুয়ারি) এমন অনেক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে নেই বিজ্ঞানাগার ও গ্রন্থাগার। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানাগার ও গ্রন্থাগার নেই বললেই চলে। যেমন জামালপুরের বকশীগঞ্জের ৩৭টি প্রতিষ্ঠানে নেই বিজ্ঞানাগার। (দৈনিক দিনকাল ১৩ মার্চ পৃ. ৫)।
সারা দেশেই যখন চলছে গুরুবিহীন পাঠশালা, খোলা আকাশের নিচে পাঠদান তখন আর শিক্ষার উন্নতি কী করে হয়? বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার এমন বেহাল অবস্থার কারণে অভিবাবকরা সন্তানের শিক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিচ্ছে কোচিং-এর শিক্ষার্থীরা সাহায্য নিচ্ছে বাজারে প্রচলিত নি¤œ মানের গাইড-নোটের। যার ফলে শিক্ষার যে মান নিশ্চিত করার দরকার সে কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক দরিদ্র পরিবার অর্থের অভাবে তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বিকল্প কোন কিছু করতে পারছে না। ফলে তাদের সন্তানরা পারছে না সময়ের তালে উপযুক্ত শিক্ষা। কেউবা পড়া-লেখা বাদ দিয়ে শ্রমে নেমে পড়ছে। ফলে ঝরে পড়া রোধ ও শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। মেয়ে শিশুরা শিকার হচ্ছে বাল্যবিবাহের।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষাঙ্গনগুলোতে চলছে নানা ধরণের অরাজকতা। অসুস্থ রাজনীতির করাল থাবা গ্রাস করে নিচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ। শিক্ষকতার ক্ষেত্রে দুর্নীতির মাধ্যমে যোগ্যরা বাদ পড়ে ঢুকছে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যরা। ছাত্ররাজনীতির নামে চলছে সন্ত্রাস।
হলগুলোতে চলছে দলীয় কুন্দলের দাবানল।  মাদকতার প্রসারে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো হয়ে উঠেছে মাদকের আখরা। সাংস্কৃতির নামে চলছে অগ্রাসন।  সব মিলিয়ে জগাখিচুড়ি পরিবেশে চলছে শিক্ষার কাজ। সেশনজটের কবলে পড়ে শিক্ষার্থীদের নাভি শ্বাস উঠে গেছে। দেশব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থায় যদি এমন চিত্র হয় তাহলে ঝউএ অর্জন কি সম্ভব হবে? শিক্ষকবিহীন, শ্রেণিকক্ষের সংকট, গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞানাগার ছাড়া কেমন করে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব? শিক্ষকই নেই যেখানে সেখানে আবার মানসম্পন্ন শিক্ষা তো বহুদূরের কথা। জাতির মেরুদ- শিক্ষার এমন বেহাল দশা দ্রুত রোধ করতে হবে।
সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দরিদ্র শ্রেণির পরিবারে শিক্ষার অগ্রহ হারাবে। ফলে বাড়বে ঝরে পড়ার প্রবনতা। সমান তালে বাড়বে শিশুশ্রম। অজ্ঞানতার অভিশাপ ও বর্বরতা চেপে বসবে জাতির ঘাড়ে। দেশের চলমান উন্নয়নের গতি থেমে যেতে বাধ্য হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ