ঢাকা, শনিবার 08 March 2017, ২৫ চৈত্র ১৪২৩, ১০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নার্সসংকট নিরসন এবং চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন

আবুল হাসান ও খনরঞ্জন রায়: বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক নার্সদিবস পালিত হয়। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠণ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সেবা অধিদফতর যৌথভাবে নানাবিধ কর্মসূচি পালন করে থাকে। নার্সিং দিবস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর পেছনের মানুষটি ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তিনি আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত, লেখিকা এবং পরিসংখ্যানবিদ। জন্ম ইতালির অভিজাত এক পরিবারে। তার বাবার নাম উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মায়ের নাম ফ্রান্সিস নাইটিঙ্গেল নি স্মিথ। ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ার অঞ্চলে তার শৈশব কেটেছে। মা এবং বোনের প্রচ- আপত্তি সত্ত্বেও নাইটিঙ্গেল নার্সিংকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ কবি রিচার্ড মঙ্কটন মিলনেস নাইটিঙ্গেলের পাণিপ্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু নার্সিং পেশায় এ সম্পর্ক বাধা সৃষ্টি করতে পারে এ আশঙ্কায় তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কূটনীতিক সিডনি হার্বাটের সাথে তার পরিচয় হয় এবং আজীবন তারা পরস্পরের বন্ধু ছিলেন।
রাতের আঁধারে আহত  সৈন্যদের সেবা করার জন্য তিনি ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে অভিহিত হতেন। প্রবল তুষারপাত ও বৃষ্টির মধ্যেও তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে রোগীদের সেবা করতেন। নার্সিংকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্বও তারই। প্রতিবছর তার জন্মদিনে ‘আন্তর্জাতিক নার্স ডে’ পালিত হয়।
আক্ষরিক অর্থে জনগণের স্বাস্থ্য পরিচর্যা, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কাজে যারা নিয়োজিত থাকে তাদের সেবিকা বলা হয়। এ পেশার মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে কোনও রোগী  বা  ব্যক্তির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে সেবিকা বা নার্স। আমাদের দেশে প্রশিক্ষিত নার্সের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আর তা দেশের চিকিৎসাসেবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের সব দেশে চিকিৎসকদের চেয়ে নার্সের  সংখ্যা বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে তার উল্টো অবস্থা বিরাজ করছে। প্রয়োজনের তুলনায় দেশে প্রায় ২ লাখ নার্স কম রয়েছে। এ সুযোগে চিকিৎসা সেক্টরে প্রবেশ করছে অনেক ভুয়া নার্স। ভুয়া নার্সের কারণে চিকিৎসা সেক্টরে ভুল সেবায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগও উঠছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার মান গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে ডাক্তারি আর নার্সিং শিক্ষায় ছাত্রছাত্রী ভর্তির হার প্রায় সমান সমান। ফলে গোড়াতেই ঘাটতি শুরু হয়। বাংলাদেশে নার্সিং কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে নার্সের (মিডওয়াইফসহ) সংখ্যা ২৮ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৭৯৪ জন ডিপ্লোমা নার্স সরকারি নার্সিং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত এবং প্রায় ১৩ হাজার নার্স সরকারি হাসপাতালসমূহে কর্মরত।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুসারে দেশে মোট চিকিৎসক সংখ্যা ৪৯ হাজার ৯৫১ জন। আর সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে মোট বেড সংখ্যা ৯১ হাজার ১০৬টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে বেড সংখ্যা ৪৫ হাজার ৬৫১টি। কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ হাসপাতালেই রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। গত বছর সরকারি হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩১৮ জন। আবার দেশে মোট জনসংখ্যার গড় অনুপাতে প্রতি ১১ হাজার ৯৬৯ জনের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন নার্স।
নার্সের সংখ্যা বাড়াতে হলে প্রতিবছর মেডিকেল কলেজগুলোয় যে সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়, নার্সিংয়ে এর চেয়ে কমপক্ষে তিনগুণ বেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা দরকার। এ ছাড়া এখনো যেহেতু নার্সিং পেশায় অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরা যুক্ত হয়, তাই শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং চাকরি-সব ক্ষেত্রেই তাদের বিভিন্নমুখী আর্থিক ও আবাসিক সুবিধার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। শুধু চিকিৎসা দ্বারা রোগীকে সম্পূর্ণরূপে নিরাময় করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সেবিকার ভূমিকা অপরিসীম, যা কেবল শিক্ষিত ও দক্ষ সেবিকা দ্বারাই প্রদান করা সম্ভব। নার্সিং-এ ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত জনবলের অভাবে ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষণবিহীন মেয়েদের দিয়ে নার্সিং-এর কাজ করানো হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে পত্রিকায় প্রতিদিন শিরোনাম হচ্ছে। প্রসবকালীন জটিলতা, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, প্রশিক্ষত দক্ষ নার্সিং-এর অভাবে।
এক্ষেত্রে সামাজিক কুসংস্কার আর নেতিবাচক ধ্যান ধারণার কারণে নার্সিং পেশায় অনেক পিছিয়ে আমরা। একজন নার্স যে পরিমাণ মেধা, শ্রম আর মমতা দিয়ে একজন রোগীকে সুস্থ করে তুলে একজন নার্সের প্রতি সে পরিমাণ সম্মানবোধ আমাদের নেই। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে একজন সেবিকা যে পরিমাণ সেবা দিয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া হয় না।
বাংলাদেশে ডিপ্লোমা নার্সের শিক্ষা কোর্স পরিচালনা করে নার্সিং কাউন্সিল। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সেবাবিজ্ঞান বিশ্লেষিত হওয়ার ফলে দেশে সেবা শিক্ষা প্রসারের জন্য গড়ে উঠেছে ৪৩টি সরকারি, ১টি সামরিক ও ১৮টি বেসরকারি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে বছরে ১৮০০ মতো ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়। নার্সিং কাউন্সিল পরিচালিত নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলোর শিক্ষার মান নিয়েও দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সন্দেহ পোষণ করা হয়। এদেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসক ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছে। যাদের নিয়ে দেশ ও জাতি গর্ব বোধ করতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের ডিপ্লোমা নার্স নেই একজনও। বেসরকারিভাবে পর্যাপ্ত সংখ্যক নার্সিং স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করার সহযোগিতা করলে দ্রুত দেশের নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতা থাকার কারণে গুণগত মানসম্পন্ন নার্স  তৈরি হবে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বহু দেশে দক্ষ নার্সের অভাব এবং চাহিদা রয়েছে। বিদেশে নার্স নিয়োগের জন্য প্রতিবছর রিক্রুটিং টিম বাংলাদেশে আসে। উচ্চমানসম্পন্ন ডিপ্লোমা নার্সের অভাবে লোভনীয় এই চাকরিগুলো পূরণ করে ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা ও মিসর। বাংলাদেশ বঞ্চিত হয় দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি আয় থেকে। দেশের প্রতিটি গ্রামে ১ জন করে প্রশিক্ষিত নার্স প্রেরণ এবং হাসপাতাল ক্লিনিকসমূহে আনুপাতিক হারে নার্স প্রদানের প্রয়োজন প্রায় ৪ লাখ নার্স। বর্তমানে চালু ৬৪টি ইনস্টিটিউট থেকে এর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রদান করা সার্টিফিকেটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তির জš§ দিচ্ছে। নার্সিং কাউন্সিলকে প্রফেসনাল কোড অব কনডাক্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়ে শিক্ষাকে পৃথক করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিচালিত হতে হবে। চিকিৎসা শিক্ষা, আইন শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা যেভাবে পরিচালিত হয় নার্সিংকে একই শিক্ষা কাঠামোয় আনতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন সম্মিলিত ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা হতে পারে এর সহজ সরল গতিময় পদক্ষেপ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ