ঢাকা, রোববার 09 March 2017, ২৬ চৈত্র ১৪২৩, ১১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পহেলা বৈশাখ

শরীফ আবদুল গোফরান : প্রত্যেক ঋতুর আগমনে বাংলাদেশের প্রকৃতি নব নব সাজে সজ্জিত হয়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত- এ ছয় ঋতুতে প্রকৃতি সাজে ছয় রকমে। ষড়ঋতুর পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় প্রকৃতি। পরিবর্তিত হয় মানুষের মন-মেজাজ ও সংস্কৃতি। গ্রীষ্মের দুঃসহ দহন বর্ষার মুষলধারে বৃষ্টি, শরতের কাশফুল, হেমন্তের কুহেলী গুঞ্জন, শীতের শীর্ণ নদী ও কুয়াশার নেকাব আর বসন্তের দখিনা মৃদুমন্দ বাতাস ষড়ঋতুরই অবদান। ষড়ঋতু নানারূপ রস ও গন্ধে সাজায় এখানকার প্রকৃতিকে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রকৃতি আমাদেরকে বিলিয়ে দেয় ছয় ঋতুর বিচিত্র সৌন্দর্যের ডালি। ঘুরেফিরে সময়ের ব্যবধানে তা আমাদের নিকট ফিরে আসে। এই তো ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতেই শেষ হয়ে গেলো আরেকটি বছর। শুরু হচ্ছে নতুন বছরের যাত্রা। আগমন ঘটেছে গ্রীষ্মের। এখন হিসাব নিকাশের পালা। গত বছর কতটুকু সাফল্য অর্জন করেছি, সেটি মিলিয়ে দেখার সময়। কারণ গত বছরের সফলতাকে সঙ্গী করেই বরণ করে নিতে হবে নতুন বছর। দেখতে দেখতে চৈতী রোদের দিনগুলো পার হয়ে গেছে। নতুন বছরের সুসংবাদ নিয়ে আমাদের কাছে আবার হাজির হয়েছে পহেলা বৈশাখ।
পহেলা বৈশাখের সকালটা সবার কাছে দারুণ আনন্দের। নতুন বছরের আনন্দে গাছেরাও আনন্দিত। নতুন পাতা মেলে তারাও কুটি কুটি হাসে। পুরনো বছর যেতে যেতে হেসে উঠে নতুন বছরের ভোর। নতুন বছর এলে সবার মন আনন্দে ভরে যায়।
বৈশাখ এলে আমরা যেমন আনন্দ পাই, তেমনি আকাশ-বাতাসও উতলা হয়ে যায়। কেমন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে পৃথিবী। পৃথিবীর নিঃশ্বাসে বাতাসের সঙ্গে উড়ে বেড়ায় উত্তপ্ততা। গরম, ভীষণ গরম। এমনিভাবে দিনের শেষ হয়। আসে বিকাল। তারপর সন্ধ্যা নামে। নামে রাতের অন্ধকার। আকাশে জমে মেঘ। কালো কালো মেঘ। বিদ্যুৎ চমকায়। শব্দ হয়। ঠাস ঠাস। ভয়ানক শব্দ। বুক কাঁপানো শব্দ। ভারী হয় আকাশ। নামে বৃষ্টি। আসে ঝড়। এলোমেলো করে দেয় সব। এলোমেলো করে দেয় নতুন জীবন।
চৈত্র মাস শেষ হতে না হতেই আমরা ভাবতে থাকি, কখন আসবে আমাদের কাক্সিক্ষত পহেলা বৈশাখ। অপেক্ষা করতে করতে যেন সময় আর ফুরায় না। ভারি মজা এই দিনে। অফিস আদালত ছুটি। স্কুল-কলেজ ছুটি। ঘরেও ছুটি। রেডিওতে অনুষ্ঠান। টিভিতে অনুষ্ঠান। শহর জুড়ে অনুষ্ঠানের বান ডেকে যায়। কাগজে কাগজে ছড়া-গল্প কবিতা। সেই সঙ্গে কালো বর্ণালী বর্ষপুঞ্জী। বটতলায় বসে আনন্দময় বৈশাখী মেলা। মাটির পুতুল, বেতের ঝুড়ি, বাঁশের বাঁশি, রঙিন হাঁড়ি আর পুঁতির মালা, সবার গায়ে রঙিন জামা। বকুনি নেই। উপদেশ নেই। কেবলই হাসি, আনন্দ আর গান। সত্যিই এ দিনটির তুলনাই হয় না।
এখন হয়তো সবার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- কেন এই আনন্দ? পহেলা বৈশাখে খুশির লহরিতে কেন দশদিক ভরে যায়? পহেলা বৈশাখ হলো বছরের প্রথম দিন। বৈশাখ আবার ঋতুরও শুরু। বৈশাখ নিয়ে আসে প্রথম ঋতুর নতুন সমাহার। বাংলার আকাশে-বাতাসে বৈশাখ তার আগমন ঘোষণা করে। আলোড়ন তোলে নিষ্প্রাণ শহরেও। পাখির কলকাকলি, নদীর তিরতিরে স্রোত, পবণ মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালী গান আর সবুজের রাজ্যে নিয়ে যায় আমাদের পহেলা বৈশাখ।
পৃথিবীর সব দেশেই দেখা যায় প্রকৃতি একটি পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ের উত্তরণের সময় মানুষ কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে সে সময়টিকে চিহ্নিত করে রাখতে চায়। এই আয়োজন আর উৎসবই হলো নববর্ষ।
আমাদের দেশে নববর্ষের উৎসব কখন শুরু হয়? গ্রীষ্মের খরতাপে যখন প্রকৃতি অস্থির, ফসল ফলানোর জন্য যখন বৃষ্টির প্রয়োজন তখন সেই বৃষ্টির আহ্বানে সঙ্গে আসে নববর্ষ। আমরা প্রার্থনা করি বৃষ্টি আসুক। পুরনো দিনের সব দুঃখ কষ্ট ধুয়ে মুছে যাক।
নববর্ষ এলে আমাদের দেশে যে আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় তার মধ্যে রয়েছে বেশ বৈচিত্র্য। পুণ্যাহ, হালখাতা, বিভিন্ন ধরনের গান ও আনন্দ প্রকাশের অনুষ্ঠান, চড়ক মেলা প্রভৃতি এর অন্যতম। দেশের ব্যবসায়ী সমাজ সারাবছর এ দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকেন। পহেলা বৈশাখ এলেই দেশ জুড়ে খোলা চত্বরে বসে মেলা। নববর্ষের এই মেলা কতই না আনন্দ বয়ে আনে। মেলায় বাঁশি, খেলনা, ডুগডুগি আর খই, বাতাসা, জিলাপি ও মিষ্টি সবার মনে কাড়ে। এছাড়া মাটি ও কাঠের তৈরি নানা আসবাবপত্র কেনার ধূম পড়ে যায়। লাঠিখেলা, সার্কাস, পুতুল নাচ ও জারিগানের আসর বসে। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ এভাবে আমাদের জীবন-ধারায় নতুন প্রেরণার জন্ম দিয়ে যায়।
আর এর মধ্য দিয়েই আমরা খুঁজে  পাই বেঁচে থাকার আনন্দ। জীবন সংগ্রামের উদ্দীপনা। এদিনে আমাদের কামনা, নতুন বছরটি সুখ-শান্তি আর ফসলে ভরে উঠুক আমাদের অঙ্গন। প্রকৃতি আর না হোক নিষ্ঠুর। আমরা চাই সুন্দর সময়। সুন্দর দিন, সুন্দর রাত, সুন্দর সময় আর সুন্দর একটি পৃথিবী। সে সুন্দরের ধারা বয়ে আনুক বাংলা নববর্ষ। আমরা নববর্ষকে বরণ করতে প্রার্থনা করি-
‘পুরান দিনের দুঃখের কথা
সবাই এবার ভুলে যাক
সুখের আলো সবার ঘরে
দাও ভরিয়ে আল্লাহ্পাক’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ