ঢাকা, রোববার 09 March 2017, ২৬ চৈত্র ১৪২৩, ১১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিস্টার চ্যাং-এর বিদেশ সফর

আশরাফ জামান : (নয়)
চ্যাং দেখেছে তার গ্রামে রাস্তায় মরে পড়ে থাকা কুকুর বেড়ালের দেহ। খুন-খারাবী যে শুনেনি তা নয়। ওর মায়ের কাছে গল্প শুনেছে এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শত শত মানুষের লাশ নাকি নদী, নালা এমনকি রাস্তায় পড়ে থেকেছে। কিন্তু এখন তো দেশ স্বাধীন হয়েছে। আর কেন?
চ্যাং-দুঃখ ভাড়াক্রান্ত মনে চলতে লাগলো সোজা দক্ষিণ দিকে। দু’দিন পথ চলবার পর গিয়ে উঠলো সদরঘাটের বুড়ীগঙ্গা নদীর ধারে।
চলতে চলতে দেহমন দু’টোই খারাপ হয়ে গেছে চ্যাং-এর। কদিন বুড়ীগঙ্গায় সাঁতার কাটতে লাগলো। চলতে গিয়ে পরিচয় হলো কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে। ওর গোত্রের অন্যান্য বেঙদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হলো। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালো। জানালো ঢাকায় আসার কারণও।
চ্যাং ভাবলো, এখন কিছুদিন বিশ্রাম নেবে। তাছাড়া সাঁতার কাটার মত ভালো জায়গাও পেয়েছে।
কিছুদিন পর আবার রওয়ানা হলো চ্যাং। ডেমরা ব্রিজের নিচে শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে মিজিমিজি গ্রামে গিয়ে দাঁড়ালো। উপরে বিরাট সেতু নিচে নদী। নদীতে সাঁতার দিতে গিয়ে উঠলো নদীর পূর্ব দিকটায়।
আবার হত্যাকাণ্ড। এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। সুন্দরী নারীর লাশ দেখতে পেলো। নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কোন পাষাণ তাকে হত্যা করেছে? মানুষ না পশু না কোন শয়তান? কোন মানুষ এমন সুন্দর সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দিতে পারে?
ফুলের মত পবিত্র একটি মুখ। মনে হয় এখনো ঘুমিয়ে আছে। চ্যাং-এর বুক ফেটে কান্না বের হয়। মানুষ এ নির্মম কেন?
চ্যাং এসব দেখতে চায় না অথচ ওর চোখের সামনে এগুলো কেন ধরা পড়ে? ও এসেছিল ঢাকা শহরের সৌন্দর্য দেখতে সুন্দর সুরম্য ঢাকা নগরীকে, কিন্তু এসে দেখে তার কুশ্রীরূপ আর গভীর ক্ষত। সামান্য বেঙ সে তো পারে না এর বিরুদ্ধে কথা বলতে প্রতিবাদ জানাতে।
ফুলের মত সুন্দর পবিত্র মুখ দেখে মায়া হয়। কেমন মায়া মায়া চোখ। শরীর ভরা সোনার গয়না। গলায় একটা সোনার চেন তার মাঝে ভারী লকেট। নদীর কিনারে লাশটি পড়ে আছে। চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে ফরসা মুখটা।
চ্যাং ভাবলো সকাল হলেই এর একটা বিহিত ব্যবস্থা হবে। ও রইলো পরদিনের ঘটনা জানার জন্য। এ কোন নারী কার বাড়িঘর আলো করতে গিয়ে নিজেই অতল অন্ধকারে হারিয়ে গেলো?
পরদিন পুলিশ এসে লাশটি গাড়িতে করে নিয়ে গেলো।
খবরের জাগজে সংবাদ ছাপা হলো, মুনীর নামের এক ধনী ব্যবসায়ী তার সুন্দরী স্ত্রী শারমিন ওরফে রিমাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। চ্যাং শহরে হাটতে গিয়ে লোকের আলোচনা থেকে বুঝতে পারলো।
চ্যাং-এর মনটা দুঃখ বেদনায় ভরে গেলো। মানুষ এত নির্মম এত নিষ্ঠুর হতে পারে? তাহলে আর পশুর সঙ্গে তার পার্থক্য কি?
কিছুদিন পর আবার রওয়ানা হলো চ্যাং। ঢাকা সফরের সখ অনেকটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। এ কোন নরকের শহরে এসেছে সে? বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পড়ে এখানকার ঘটনাবলী শুনে দেখে। আবার চলে চ্যাং
গ্যাঙ্গর ঘ্যাঙ্গর ঘ্যাং
চলছে কোলা চ্যাং
থপ থপা থপ
দেখবে ঢাকার সব।
একটা বাস এসে থামে ডেমরা ব্রীজের পশ্চিম পাশে। চ্যাং আগে থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ওঠার জন্য। গাড়িটি খুব সুন্দর মনোরম। ক্যাসেটে হিন্দী গান বাজছে। চ্যাং বুঝতে পারে না তার ভাষা। হঠাৎ এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটলো বাসে। চার পাঁচজন লোকে পকেট থেকে পিস্তল বের করলো। তাদের মধ্যে একজন চিৎকার করে ড্রাইভারকে গাড়ি থামিয়ে রাখার নির্দেশ দিল।
বললো, ড্রাইভার গাড়ি রোখো।
অগত্যা গাড়ি থেমে গেলো। যাত্রীরা সকলে ভয়ে ভীত। চ্যাং সিটের নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে।
গাড়ী থামলো। কমান্ডার প্রকৃতির বিকট চেহারার লোকটি সামনের গেটে দাঁড়িয়ে রইলো। সে আবার হাঁকলো, আপনাদের যার কাছে যা আছে ওদের হাতে তুলে দিন। আমাদের সময় কম দেবী করলে বা চালাকী করে বিপদ ডেকে আনবেন না।  অন্য দু’জন লোক প্রতি যাত্রীর কাছে গিয়ে টাকা-পয়সা, সোনার গয়না, হাতের ঘড়ি এগুলো নেওয়া শুরু করলো। বাকী দু’জন গাড়ীর নিচে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল।
মাত্র মিনিট পনেরো সময়ের মধ্যে ওদের কাজ সমাপ্ত করলো। চ্যাং পায়ে জোরে মারলো একটা ল্যাঙ। কিন্তু না ল্যাং মেরে ফেলে দিতে পারলো না। অনেক ঘৃণা অনেক ক্রোধ ছিল তার চোখে মুখে। কিন্তু হলে কি হবে যাদের প্রতি তার ঘৃণা ক্রোধ তারা বুঝতে পারলো না।
ডাকাতরা চলে যাবার পর যাত্রীদের কেউ বলাবলি করলো কেউবা শোক আফসোস করলেন। আবার দু’তিনজন মহিলা মরা কান্না জুড়ে দিল গয়না অলঙ্কার হারিয়ে। চ্যাং যাত্রীদের প্রতি মনে মনে সমবেদনা প্রকাশ করলো। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়লো। কোচটি টার্মিনালে পৌঁছলে লাফিয়ে নেমে পড়লো চ্যাং। তার পর সোজা হাঁটতে লাগলো।
আর হাঁটবে কি? বিরাট বিরাট একেক মিছিল। একদল একদিকে যাচ্ছে অন্যদল অন্য রাস্তার। সকলের মুখে শ্লোগান-
স্বৈরাচার নিপাত যাক
গণতন্ত্র মুক্তি পাক।
একটু এগোতেই চ্যাং দেখলো একটি লোক তার বুকে ও পিঠে এ শ্লোগানটি লিখেছে। জনতার মধ্য থেকে হঠাৎ পুলিশের উপর ইট পাটকেল ছুঁড়তে শুরু হলো। পুলিশের পক্ষ থেকে ছোঁড়া হলো গুলি। গুরুম গুরুম শব্দ। একটানা কয়েক রাউন্ড গুলি ছুঁড়লে জনতা হলো ছত্রভঙ্গ। যুবকটি লুটিয়ে পড়লো রাজপথে। রক্তে রাজপথ ভেসে গেলো। উহ কি ভয়ানক নৃশংস মানুষ। চিৎকার করে উঠলো চ্যাং। আহত হলো বেশ কয়েকজন।
পরদিন চ্যাং লোকের আলোচনা থেকে শুনতে পেলো, গতকালের ঘটনায় নূর হোসেন নামে এক যুবক মারা গেছে। যার গায়ে শ্লোগান লেখা ছিল।
ঢাকা শহরে বেড়ানোর সখ ক্রমশ: কমে আসে চ্যাং-এর মনে। না যে আশা উদ্দীপনা নিয়ে এসেছিল তা তার মিটে গেছে।
ঢাকা শহর ক্রমশ: উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। মিছিল বিক্ষোভ চলছে। সরকার দমন করতে পারছে না। চ্যাং একটু গা ঢাকা দিয়ে চলতে লাগলো অকস্মাৎ একদিন সারা ঢাকা শহর গোলাগুলির আওয়াজে ভরে গেল। মানুষ ছুটাছুটি শুরু করলো। গুলি ও কাঁদুনে গ্যাসের ধূয়ায় ভরে গেল রাস্তাঘাট। পুলিশ, আনসার এমনকি বিডিআর পর্যন্ত রাস্তায় নেমেছে।
চ্যাং শুনতে পেলো শহরে পর পর কারফিউ জারী করা হচ্ছে। মানুষ বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। শোনা গেল এক রিকশাওয়ালা তার বাঁশের বেড়ার ঘরে থাকা অবস্থায় পুলিশের ফাঁকা গুলির আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে। একদিন আবার পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এল। স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতা  ছেড়ে দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। দেশে নির্বাচন হবে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।
চ্যাং লোকের আলাপ আলোচনা থেমে এসব খবর শুনতে পেলো। ভাবলো এবার তাহলে শহরে শান্তি নেমে আসবে। ১৯৮৮ সালের প্রবল বন্যায় রওয়ানা হয়েছিল চ্যাং। আজ প্রায় তিন বছর দেখছে ঢাকা শহরের বিচিত্র রূপ। ক্ষুদে একটা বেঙ যে কতটুকুইবা দেখেছে? কিন্তু যা দেখেছে তাতেই আতঙ্কিত হয়েছে। আশ্চর্য হয়েছে মানুষের আচার-আচরণ থেকে। স্রস্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ কত স্বার্থপর কত নিষ্ঠুর, আবার অন্যদিকে কত অসহায়।
কদিন পর চ্যাং লোকদের কথা থেকে শুনতে পেলো দেশ স্বৈরাচার সরকারের পতন হয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আবার শ্লোগানে মুখরিত হলো ঢাকা শহর। মিছিল শোভাযাত্রা দেখতে লাগলো চ্যাং। তবে ভালোই লাগলো সে পরিবেশ। গোলাগুলি নেই। তারপর শান্তিপূর্ণভাবে একদিন নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেল। ক্ষমতায় এলো গণতান্ত্রিক সরকার।
চ্যাংক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ভাবলো, আর নয়, দেশে আর কোন অঘটন ঘটবে না।
একদিন তোপখানা রোড ধরে সোজা পশ্চিম দিকে রওয়ানা হলো। লাফাতে লাফাতে এসে পৌছলো রমনা পার্কে। তারপর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে। খুব উৎসাহ নিয়ে চলতে লাগলো চ্যাং। কলা ভবনের নিচতলায় এসে দাঁড়ালো। চ্যাং দেখলো একদল ছাত্রের সভা চলছে মাইক লাগিয়ে। অকস্মাৎ শব্দ হলো বন্দুকের গুলীর। দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো।
দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠে লোক হত্যা? ছাত্রের গুলিতে ছাত্র হত্যা। চ্যাং শুনেছে দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ। যাকে বলা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। স্কুলের শিক্ষক সাহেব গল্প বলেছেন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। চ্যাং-এর সাধ ছিলো দেখার। তাই দেখতে এসেছিলো। কিন্তু হায় এই সেই বিদ্যাপীঠ।
বাবা-মা এই ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন বড় হতে শিক্ষিত হতে আর সে হলো লাশ? মা-বাবার আশা স্বপ্ন-সাধ সব ধূঁলিসাৎ হলো সন্ত্রাসীর আক্রমণে।
ছিঃ ছিঃ এই কি সভ্যতার পাদপীঠ ঢাকা মহানগরী?
আর নয় আর এখানে থাকা নয়। চ্যাং মনস্থির করে ফেলেলো আর সে থাকবে না। হিংসা-বিদ্বেষ আর হিংস্র মানুষদের সাহচর্য আর নয়। এর চেয়ে গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো অশিক্ষার অন্ধকারে যারা হামাগুড়ি দিচ্ছে তারাই বরং ভালো।
অনেক দুঃখ অনেক অভিমান হতাশা ও বেদনা ভারাক্রান্ত মনে ঢাকা শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিল চ্যাং।
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে বেরুলো পশ্চিম দিক দিয়ে প্রথম নিউমার্কেটের মোড়ে তারপর একটা গাড়ি এসে থামলে তাতে উঠে পড়লো। বাস গিয়ে যখন থামলো রাস্তায় নেমে পড়লো সে। পথে দেখা হলো অন্যান্য বন্ধুদের সাথে।
দেখা হলো  একদল আরশোলা ও ছয়টি টিকটিকির সঙ্গে। ওদের সাথে আলাপ আলোচনা শেষে জানালো, চলে যাচ্ছে চ্যাং ঢাকা নগর ছেড়ে। তাও অনেক দুঃখ অনেক বেদনা নিয়ে।
ওরা বন্ধুসুলভ ব্যবহার করলো। বিশেষ করে সবুজ একটি বেঙ বললো, ভাই তুমি আর কটা দিন থেকে যাও আসছে বছর অনেক ভালো অনুষ্ঠান আছে সেগুলো দেখেও দেশে যেতে পারবে। স্কুলে শিক্ষকের মুখে শুনেছি মানুষ মানুষের ভাই। মানুষ মানুষের জন্য। চ্যাং ভাবে বইয়ে লেখা এসব নীতিবাক্য মিথ্যা। সেখানে মিথ্যা কথা লেখা হয়েছে। আজ তার বাস্তব প্রমাণ এই ঢাকা শহর।
চ্যাং সবুজ বেঙ এর কথায় বললো, না ভাই আর ঢাকা শহর দেখার সখ আমার মিটেছে। যে মানুষ মানুষকে হত্যা করে মানুষের নেই কোন মানবতা। কুকুর আর মানুষে নেই পার্থক্য সেখানে আর থাকা নয়। সেখানে আমার মত সামান্য প্রাণীর নিরাপত্তার তো প্রশ্নই উঠে না।
চ্যাং চললো।
এগিয়ে দিয়ে গেলো ওর বন্ধুরা বাস টার্মিনাল পর্যন্ত। আরশোলা, ঈদুর, সবুজ বেঙ ও সাদা টিকটিকিটা বারবার অনুরোধ করলো থাকতে। বললো, বন্ধু চ্যাং আর ক’টা দিন থেকে যাও যাও।
চ্যাং-এর এক কথা
আর রবোনা ঢাকা
হেথায় মানুষ ফাঁকা
মুখে তাদের মিষ্টি কথা
মনটা তাদের বাঁকা।
“সমাপ্ত”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ