ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত

এইচ এম আকতার : ব্যবসায়ীদের বিরোধীতা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন হচ্ছে নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আইন। ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে ব্যবসায়ীদের আতঙ্ক কাটছে না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট যদি আদায় করা হয় তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে যেতে পারে। বিশেষত খুচরা পর্যায়েও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে নতুন ভ্যাট আইনে। এতে করে বেড়ে যাবে সব ধরনের পণ্যমূল্য। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সাথে বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়। যা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরাও। 

জানা গেছে, গত বছরের জুলাই মাস থেকেই ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ব্যবসায়ীদের বিরোধীতার কারণে কিছুটা পিছু হটে সরকার। এই আইনের বেশ কয়েকটি ধারা বাতিলের দাবিতে তখন রাজপথে আন্দোলনে নামে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সমস্যা সমাধানে তখন এফবিসিসিআই একটি কমিটি গঠন করে। সে কমিটি এনবিআরের সাথে কয়েক দফা বসে নতুন ভ্যাট আইনের বেশকিছু সংশোধনীর সুপারিশ করে। 

কোন পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত বিভিন্ন নামে যুক্ত হয়ে পণ্যমূল্য বাড়ছে। আর এর দায়ভার চাপছে প্রতিটি ভোক্তার ঘাড়ে। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা তেমন কোন অপত্তি না জানালেও খুচরা বিক্রি পর্যায়ে নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে এনবিআরের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। এ নিয়ে তারা দফায় দফায় আন্দোলনও করে। 

সে সময় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ভ্যাট আইন নিয়ে এফবিসিসিআই’র দেয়া মতামত বিবেচনা করবে এনবিআর। কিন্তু নতুন আইনে ব্যবসায়ীদের দেয়া কোন সুপারিশ রাখা হয়নি। এতে করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এই আইন বাস্তবায়ন হলে ক্ষতির সম্মুখিন হবে সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এতে করে অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। বাধ্য হয়ে আবারও রাজপথে নামতে পারেন ব্যবসায়ীরা। 

মূল্য সংযোজন কর আইন ২০১২ বাস্তবায়ন হবে চলতি বছরের পহেলা জুলাই থেকে। এটি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতার কারণে সম্ভব হয়নি। এমনকি যারা ভ্যাট আইন প্রয়োগ করবেন তাদেরও এই আইনের অস্পষ্টতা নিয়ে সন্দেহ ছিল। জটিলতা ও অস্পষ্টতা দূরীকরণের লক্ষ্যে কমিটি গঠন কিংবা নানা বৈঠক হলেও কার্যত ফলপ্রসূ কিছুই হয়নি। ব্যবসায়ীদের দু’একটি সংগঠন বাদে অন্যরা ঢালাও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের বিপক্ষে। 

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এফবিসিসিআই যৌথ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি ছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন হার রেখে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে উত্পাদন খাতের জন্য ১০ শতাংশ এবং সেবা খাতের জন্য সর্বোচ্চ সাত শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব ছিলো। 

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী একজন দোকানদারকেও ঢালাও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। কিন্তু অনেক পণ্যে মূল্য সংযোজিত হয় না। তাহলে কেন দোকানদার ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেবে? এতে পণ্যমূল্যও বৃদ্ধি পাবে। এ পর্যায়ে পণ্যমূল্য ও ভ্যাট সংগ্রহ দোকানদারদের জন্য বড় বিড়ম্বনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। উৎপাদন পর্যায় থেকে শুরু করে খুচরা পর্যন্ত দফায় দফায় ভ্যাট দিতে গিয়ে ক্রেতারাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে স্থানীয় শিল্পের টিকে থাকাও কষ্টের হবে। 

বর্তমানে ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট দেয়ার সুযোগ পান। তবে ভিত্তি হিসাব করা হয় ১৫ শতাংশ। এটি সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্য নামে পরিচিত। যারা রেয়াত নিতে অসমর্থ, তারা এ পদ্ধতিতে ভ্যাট দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে ও ভ্যাট আদায়ের সুবিধার্থে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্যাকেজ পদ্ধতিতে বার্ষিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাটও আদায় করা হয়। এর মধ্যে বিদ্যুত্ বিল, নির্মাণ সামগ্রীসহ বেশকিছু পণ্য সেবার উপর সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে ভ্যাট আদায় করা হয়ে থাকে। অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট। তবে বিদ্যমান আইনে বেশকিছু সমস্যাও ছিল। এ কারণে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু নতুন আইনে ঢালাওভাবে সব ধরনের পণ্য ও সেবার উপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট নেওয়ার (সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্য) ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়। বাতিল করা হয় প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট। এছাড়া নতুন আইনে ভ্যাট কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বাড়ানো হয়েছে বলেও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। এর বাইরে আরো বেশকিছু বিষয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি রয়েছে। ২০১২ সালে আইনটি সংসদে পাস করার তিন বছর পর তা কার্যকর করার কথা ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই আইনটি নিয়ে ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তির মুখে তিন বছর পার হলেও বাস্তবায়ন করা যায়নি। অর্থমন্ত্রী আগামী জুলাই থেকে আইনটি বাস্তবায়নের বিষয়ে গত বাজেটেই ঘোষণা দেওয়ার পরও ইতোমধ্যে একাধিকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আগামী জুনে সরকার নতুন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। বাজেটকে সামনে রেখে ফের আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে নতুন ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে মন্ত্রণালয় ও এনবিআর আইনটি কার্যকর করার পথে হাঁটছে। 

বিশ^ ব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হলে পণ্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি দুইই বাড়বে। ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে এবং খুচরা বিতরণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

নতুন আইনে যে কোনো ব্যক্তি হিসাবপত্র সংরক্ষণ করলে তার পক্ষে রেয়াত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হবে না। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় পূর্ণাঙ্গ হিসাব রাখা সম্ভব হবে না। বিশেষত ছোট সরবরাহকারী বা ব্যবসায়ীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ফলে তারা উপকরণ কর রেয়াত নিতে ব্যর্থ হবেন। এক্ষেত্রে তাদের উপর বাড়তি ভ্যাট পড়বে। কিন্তু যারা বড় ব্যবসায়ী, তারা হিসাবপত্র রাখার কারণে উপকরণ কর রেয়াত নিতে পারবেন। এ কারণে উপকরণ কর রেয়াত নিতে ব্যর্থদের জন্য আলাদা ভ্যাটের হার নির্ধারণের পক্ষে মত দেন তারা। 

নতুন আইনে ব্যবসা পর্যায়ে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক বিক্রি (টার্নওভার) ভ্যাটমুক্ত। তবে এ জন্য হিসাবপত্র দেখাতে হবে। ৩০ লাখ টাকা থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের উপর ৩ শতাংশ এবং ৮০ লাখ টাকার উপরে টার্নওভারে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। এসব সীমা আরো বাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে ব্যবসায়ীরা। 

 এদিকে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ভ্যাট আইনের ৬৩ ধারার সংশোধন করে দোকান প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভারের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে মূসক ধার্য করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের মতে, এতে ভোক্তাগণ সহজেই ভ্যাট পরিশোধে আগ্রহী হবেন এবং ব্যবসায়ীগণ তালিকাভুক্ত হয়ে আহরিত টার্নওভার কর পরিশোধ করতে উৎসাহী হবেন। ব্যবসায়ীদের পক্ষে বলা হয়েছে, উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আইনে প্রদত্ত টার্নওভার করের উপর প্রদত্ত ভ্যাট রেয়াত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। যেটা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ভ্যাট ক্রেডিট চেইন ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। 

এফবিসিসিআই’র উপদেষ্টা মনজুর আহমেদ বলেন, উৎসে কর কর্তন সর্বনিম্ন এক লাখ টাকার উপরে আয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সরবরাহকারী গ্রাহক/ক্রেতার নিকট মূসক চালানপত্র ইস্যু করবেন, যাতে পণ্য বা সেবার মূল্য বাবদ প্রদেয় অর্থ এবং উহার উপর প্রযোজ্য মূসক যোগ করে সর্বমোট বিল সাবমিট করবেন। গ্রাহক বা ক্রেতা সরবরাহকারীকে পণ্য বা সেবা বাবদ প্রদেয় সর্বমোট মূল্য পরিশোধ করবেন এবং প্রযোজ্য মূসক উৎসে কর্তিত কর হিসাবে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করবেন। সরবরাহকারী এই চালানের বিপরীতে রেয়াত গ্রহণ করতে পারবেন। এর ফলে উৎস কর কর্তন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও সহজ হবে। 

ব্যবসায়ী নেতারা রফতানি খাতে ব্যবহৃত বিদেশি ও স্থানীয় উপাদানের বিপরীতে ডিউটি ড্র ব্যাকের ব্যবস্থা মূল্য সংযোজন কর আইনে অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ