ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

১৩ বছরেও খুলনার গার্হস্থ্য অর্থনীতি  কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়নি

খুলনা অফিস : গত ১৩ বছরেও খুলনা মহানগরীর মুজগুন্নি মহাসড়কের নেভি কলোনির বিপরীত দিকে অবস্থিত খুলনা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়নি। এ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ছাত্রীরা খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান, বস্ত্র ও পোশাক শিল্প, শিশু বর্ধন, ব্যবহারিক শিল্পকলা ও ফ্যাশান ডিজাইন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নার্সিংয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনার্স কোর্সে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। তাছাড়া এ কলেজ থেকে পাশ করা মেয়েরা ২৫% সংরক্ষিত কোটায় ঢাকা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ভর্তিও হতে পারছে। যেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন হলে এ কলেজটিতেই উল্লিখিত বিষয়ের অনার্স কোর্স চালু করা সম্ভব এবং এতে এ অঞ্চলের মেয়েরা নারী শিক্ষায় এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। কিন্তু কলেজটি বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিনেও কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এ কলেজে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। 

খুলনা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি জানায়, খুলনা ও বরিশাল বিভাগসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মেয়েদের জন্য গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ে একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলনা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ। এটি দেশের মধ্যে চতুর্থ এ কলেজটি বঞ্চনায় নিমজ্জিত থাকলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজগুলো চলছে যথারীতি কোনটি সরকারি আবার কোনটি এমপিওভুক্তভাবে। খুলনা বিভাগের একমাত্র বিভাগীয় স্পেশালাইজ্ড কলেজ হওয়ার পরও কি কারণে এটি এমপিওভুক্ত হচ্ছে না তার উত্তর নেই কলেজ পরিচালনা কমিটির কাছেও। অথচ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স চালুর লক্ষ্য নিয়েই ২০০৪ সালে কলেজটির যাত্রা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে কলেজের একজন অধ্যক্ষ রাজনৈতিক কারণে পদহারা হয়েছেন, একজন বেতন না পেয়ে হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন এবং বর্তমানে একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষহ ১৩জন শিক্ষক/শিক্ষিকা ও সাতজন কর্মচারী বিনা বেতনেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ১৬ এপ্রিল ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক থেকেই এমন একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সভা থেকে তৎকালীন হুইপ মো. আশরাফ হোসেনকে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক, খুবি ও কুয়েটের ভিসিদ্বয়কে উপদেষ্টা, জেলা প্রশাসককে সভাপতি এবং অধ্যক্ষকে সেক্রেটারি করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সাংগঠনিক কাঠামো গঠন করা হয়। প্রথমে মুজগুন্নি আবাসিক এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে কলেজের যাত্রা শুরু হলেও পরে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বয়রা আবাসিক প্রকল্পের ডি ব্লকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য চিহ্নিত জায়গা থেকে তিন একর জমি কলেজের অনুকূলে বরাদ্দের মধ্যদিয়ে কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বর কলেজের একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তার স্থাপন করা হয়। শুরুতে ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে একাডেমিক ভবন, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে নিচু জমি ভরাট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এসব অর্থ খুলনা জেলা পরিষদ ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আর্থিক অনুদান নিয়ে করা হয়। ২০০৫-০৬ অর্থ বছর থেকে কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলেও মুজগুন্নি মহাসড়ক থেকে কলেজ পর্যন্ত রাস্তাটি অসম্পন্ন থাকায় সম্প্রতি খুলনা সিটি কর্পোরেশন থেকে রাস্তাটি সংস্কার করে দেয়া হয়। এভাবে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা নিয়ে কলেজটি টিকে থাকলেও নেই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের দুর্মূল্যের বাজারে টিকে থাকা যেমন দুষ্কর হয়ে পড়েছে তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

  তার পরে শিক্ষকদের এমন দুরাবস্থায় তারাও এগিয়ে আসতে পারছেন না। তবে যেহেতু অধিকাংশ শিক্ষক নারী সেহেতু তাদের পরিবারে আয়ের বিকল্প লোক থাকায় হয়ত তারা এতোদিন বিনা বেতনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছেন। কিন্তু পুরুষ শিক্ষক যারা আছেন তাদেরকে হয় টিউশনি করে অথবা অন্য কোন আয়ের উৎস খুঁজে বের করতে হচ্ছে। বিকল্প পথ না থাকায় ইতোমধ্যে একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অন্যত্র চাকরি নিয়ে চলে গেছেন। এভাবে অন্যান্য শিক্ষকরা চলে গেলে এ অঞ্চলের মেয়েদের অন্যতম এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরতদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে বলেও ছাত্রীরা উল্লেখ করেন।

কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সালমা ইয়াসমিন বলেন, তিন একর জমির ওপর নগরীর মুজগুন্নি মহাসড়কের নেভী কলোনীর বিপরীত দিকে স্থাপিত খুলনা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজটি যশোর শিক্ষাবোর্ড থেকে একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ছাত্রীরা খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান, বস্ত্র ও পোশাক শিল্প, শিশু বর্ধন, ব্যবহারিক শিল্পকলা ও ফ্যাশান ডিজাইন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নার্সিংয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনার্স কোর্সে অধ্যয়নরত আছে। তাছাড়া এ কলেজ থেকে পাশ করা মেয়েরা ২৫% সংরক্ষিত কোটায় ঢাকা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। যেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন হলে এ কলেজটিতেই উল্লিখিত বিষয়ের অনার্স কোর্স চালু করা সম্ভব এবং এতে এ অঞ্চলের মেয়েরা নারী শিক্ষায় এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। কিন্তু কলেজটি বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিনেও কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এ কলেজে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তার পরেও শিক্ষক-শিক্ষিকারা কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি খসরুল আলম বলেন, খুলনাঞ্চলের প্রতি বর্তমান সরকারের বিশেষ নজর থাকলেও তারা সেভাবে সরকারের নজরে এ বিষয়টি আনতে পারছেন না বলেই হয়ত কলেজটি এমপিওভুক্ত হচ্ছে না। তার পরেও তাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ (অনারারী) মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ২০০৪ সালে জাতীয় সংসদের তৎকালীন হুইপ মো. আশরাফ হোসেনের চেষ্টায় কলেজটি স্থাপিত হলেও এখানে নিশ্চয়ই কারও ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত ছিল না। এ অঞ্চলের নারী শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখতেই কলেজটি প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণেই দীর্ঘ ১৩ বছরেও কলেজটি এমপিওভুক্ত হচ্ছে না। যদিও কলেজটিতে শুধুমাত্র বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের মেয়েরাই পড়বে এমনটি নয়। তার পরেও কলেজটি এমপিওভুক্ত না করে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক টিএম জাকির হোসেন বলেন, সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিলে একটি নীতিমালা দেয়া হবে। সে নীতিমালার আলোকে কলেজটি পরিচালিত হলেই কেবল এমপিও হবে, নতুবা নয়। খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, পরবর্তী এমপিওভুক্তি শুরু হলেই খুলনা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ এমপিওভুক্ত হবে এমনটি আশা করা যাচ্ছে। সেভাবেই তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে রেখেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ