ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বোরো ক্ষেতে ব্লাস্টের মহামারী

খুলনা অফিস : বোরো ধানে ছত্রাক রোগ ব্লাস্ট’র আক্রমণ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতজুড়ে তোলপাড় চলছে। এ রোগ প্রতিরোধে মাঠে করণীয় ও সুপারিশ তুলে ধরেছেন কৃষিবিদরা। পাশাপাশি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, বীজ, বাতাস ও পোকার আক্রমণে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে ধান। রোগাক্রান্ত মাঠের বীজতলা অথবা ক্ষেতে এ রোগ দেখা দিলে জমিতে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করতে হবে, আক্রান্ত জমিতে হেক্টর প্রতি ৮০০ মিলিলিটার (বিঘাপ্রতি একশ’ মিলিলিটার) হিনোসান অথবা হেক্টর প্রতি ২ কেজি (বিঘা প্রতি ৩০০ গ্রাম) বেনলেট বা টপসিন এম স্প্রে করতে কৃষকদের নির্দেশনা দিয়েছে গবেষকরা।
সূত্র জানায়, মার্চের বৃষ্টি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বোরো আবাদে ব্লাস্ট’র অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ছত্রাক রোগে ইতোমধ্যেই এ অঞ্চলের ১২০০ হেক্টর জমির বোরো ধানের শীষ ক্ষেতেই শুকিয়েছে। এর ফলে আক্রান্ত এলাকায় ২০ শতাংশ উৎপাদন কম হবে। বোরো ক্ষেতে ব্লাস্টের মহামারী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এবারই প্রথম।
সোমবার দুপুরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনে সম্মেলন কক্ষে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ধানে ব্লাস্ট রোগের মহামারী ও পরবর্তী করণীয় শীর্ষক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে এগ্রোটেকনোলজি ডিস্লিপিন। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে রোগাক্রান্ত মাঠে করণীয় ও সুপারিশ তুলে ধরেন কৃষিবিদরা।
লিখিত বক্তবে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্লান্ট প্যাথলোজিস্ট প্রফেসর মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বীজ, বাতাস ও পোকার আক্রমণে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে ধান। রোগাক্রান্ত মাঠের বীজতলা অথবা ক্ষেতে এ রোগ দেখা দিলে জমিতে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করতে হবে, আক্রান্ত জমিতে হেক্টর প্রতি ৮০০ মিলিলিটার (বিঘাপ্রতি একশ’ মিলিলিটার) হিনোসান অথবা হেক্টর প্রতি ২  কেজি (বিঘা প্রতি ৩০০ গ্রাম) বেনলেট বা টপসিন এম স্প্রে করতে কৃষকদের নির্দেশনা দিয়েছে তিনি।
ব্লাস্ট রোগাক্রমণের পূর্বে পাঁচদফা করণীয় উল্লেখ করে ভবিষ্যতে ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে তিনটি সুপারিশ করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিদরা। সুপারিশমালা হল-কৃষকদের সময়মত রোগের অনুকুল আবহাওয়া সম্পর্কে অবহিতকরণের ব্যবস্থা, কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তৃণমুল পর্যায়ে আরো বেশি কৃষিবিদ ও ডিপ্লোমা কৃষিবিদ নিয়োগের ব্যবস্থা করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তারা।
সাংবাদিক সম্মেলনে ব্লাস্ট রোগের কারণ সম্পর্কে বলা হয়, এক ধরনের ছত্রাক পাইরিকুলারিয়া অরাইজী এর কারণে রোগ বীজ, বাতাস ও পোকার বাহনে এবং বিশেষ করে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বোরো ধানের ব্লাস্ট রোগ দ্রুত বিস্তার ঘটে। এবারই ব্যাপকভাবে এ রোগের হঠাৎ করে বিস্তার ঘটায় প্রথম দিকে কৃষক বুঝে উঠতে পারেনি। তারা ভেবেছিলো কোনো পোকার আক্রমণ। কিন্ত কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনের ফলে এ রোগ সনাক্ত হয় এবং দ্রুত হস্তক্ষেপে অনেকটা কাজ হয়েছে। তারা যে সমস্ত ছত্রাকনাশক ওষুধের পরামার্শ দিয়েছে তা নিয়মমাফিক ব্যবহারের ফলে অনেক কৃষক উপকার পেয়েছেন। তবে কৃষকরা এ ব্যাপারে একটু গড়িমসি করায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।
সম্মেলনে আরো বলা হয়, ব্রিধান ৬১ থেকেই রোগের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ জাতটি প্রত্যাহার অথবা আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে চাষ করার পরামার্শ দেয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সরকারিভাবে সহায়তাদানেরও আহ্বান করা হয় সাংবাদিক সম্মেলন থেকে। এছাড়া আশঙ্কা করা হয় ভবিষ্যতেও এ রোগ দেখা দিতে পারে। এ জন্য কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমের সহায়তায় ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়।
রোগাক্রমণের আগে করণীয় সম্পর্কে বলা হয়, ১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাত লাগানো-বোরো মওসুমে বিআর-৩, বিআর-১৪, বিআর-১৬ ও ব্রি ধান-৪৫, আউশ মওসুমে বিআর-৩, বিআর-১৫, বিআর-২০, বিআর-২১, ব্রি ধান-৪৩; আমন মওসুমে বিআর-৫, বিআর-১০, ব্রি ধান-৩২, ব্রি ধান-৩৩, ব্রি ধান-৪৪ লাগানো।
এছাড়া সুস্থ বীজের ব্যবহার-সুস্থ্য গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করা এবং দাগী বা অপুষ্ট বীজ বেছে ফেলে দিয়ে সুস্থ বীজ লাগানো; পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা- আক্রান্ত জমির খড়কুটা পুড়িয়ে ফেলা এবং ছাঁই জমিতে মিশিয়ে দেয়া, বিষ শোধন- থায়োফানেট মিথাইল নামক কার্যকরী উপাদান বিশিষ্ট ছত্রাক নাশক ১ লিটার পানিতে ৩ গ্রাম মিশিয়ে ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে বীজ শোধিত হয়। এই শোধিত বীজ লাগালে বীজতলায় চারা অবস্থায় পাতা ব্লাস্ট কম হবে এবং সুষম সার প্রয়োগ-সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করা এবং আক্রান্ত জমিতে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়াগ বন্ধ রাখা। পটাশিয়মের অভাবযুক্ত সমিতে পর্যাপ্ত পটাশ সার অথবা আমাদের দেশের কৃষকের প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী ছাই ব্যবহার করা। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর ও নড়াইল জেলায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে এবার বোরো আবাদ হয়েছে। সাড়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা।
কৃষি অফিসের সূত্র জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্লাস্ট আক্রান্ত উপজেলাগুলো হচ্ছে খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতলা, বটিয়াঘাটা, বাগেরহাটের কচুয়া, মোড়েলঞ্জ, সাতক্ষীরা জেলা সদর, আশাশুনি, কলারোয়া, নড়াইল জেলা সদর, কালিয়া, লোহাগড়া, যশোরের অভয়নগর ও কেশবপুর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, বিরি-৬১, বিরি-৬৮ নামক উচ্চ ফলনশীল জাতের বোরো আবাদে বাস্ট নামক ছত্রাক আক্রমণ করেছে। মার্চে বৃষ্টির কারণে রাতের তাপমাত্রা কম এবং মাছের ঘেরের নিচু জমিতে উর্বরতা বেশি থাকায় বাস্ট নামক ছত্রাক রোগ বিস্তার লাভ করে। কৃষকরা নাটিভো এডিফেন, এমিস্টারটপ, ট্রোপার নামক ছত্রাকনাশক দিয়ে রোগ দমন করে। উলিখিত উপজেলাগুলোতে ৭২০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনার অতিরিক্ত পরিচালক নিত্যরঞ্জন বিশ্বাস জানান, গত সপ্তাহ থেকে দমন করা সম্ভব হয়েছে। আক্রান্ত জমিতে উৎপাদন কম হবে বলে তিনি উলেখ করেন। এ বছর এ রোগের বিস্তার সম্পর্কে বলেছেন, রাতের তাপমাত্রা কম এবং মাছের ঘেরের নিচু জমিতে বাস্ট ছত্রাক বিস্তার লাভ করে।
অধিদপ্তরের নড়াইলের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, গত বছর গম বাস্টে আক্রান্ত হয়। এ বছর তিন উপজেলায় ৮৪ হেক্টর জমি বাস্ট আক্রমণ করে। নাটিভো নামক ছত্রাক নাশক দিয়ে দমন করা সম্ভব হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ কাজী আব্দুল মান্নান জানান, বর্তমানে ধানে দানা বাঁধা শুরু হয়েছে। কিছু কিছু ধান পেকে যাওয়ায় কাটা শুরু হয়েছে। বর্তমানে কিছু কিছু এলাকায় ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। এটি একটি ছত্রাক জনিত রোগ। কৃষকদের ছত্রাকনাশক স্প্রে, জমিতে পানি ধরে রাখা, ও কখনো জমিতে ইউরিয়া ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে কৃষকদের মাঝে লিফলেটও বিতরণ করা হয়েছে। যদি কৃষক ভাইরা এসব অনুসরণ করেন তাহলে উৎপাদনে খুব একটা অসুবিধা হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনাস্থ অতিরিক্ত পরিচালক নিত্যরঞ্জন বিশ্বাস ব্লাস্ট সম্পর্কে বলেছেন, গেল সপ্তাহ থেকে দমন করা সম্ভব হয়েছে। আক্রান্ত জমিতে উৎপাদন কম হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ বছর এ রোগের বিস্তার সম্পর্কে বলেছেন, রাতের তাপমাত্রা কম এবং মাছের ঘেরের নিচু জমিতে ব্লাস্ট ছত্রাক বিস্তার লাভ করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ