ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পহেলা বৈশাখ ও তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতি

মাকসুদা সাকি : মামী আমাদের বাসায় এসেছিলেন, যাওয়ার সময় আমাকেও নিয়ে গেলেন কারণ আমার স্কুল বন্ধ।পরদিন সকালে মামীর বাবার বাড়ি থেকে হরেক রকম ভর্তা, নানা রকম খাবার নিয়ে ওনার ভাই এলেন। আমি এর কারণ জানতে চাইলে বললেন, আজ পহেলা বৈশাখ, বছরের প্রথম দিন ভালো খেলে, সারা বছর ভালো খাওয়া যায়। আমার মামা মামী দেশের বাইরে থাকতেন, ভিসা জটিলতায় মামীকে বছর খানেক দেশে থাকতে হয়, উনি ওনার পিচ্চি মেয়েসহ এক পরিচিত পরিবারের সাথে সাবলেট থাকতেন তখন। ওই বাড়িওয়ালার ঘরে গিয়ে দেখি অনেক বাজার, আমার জিজ্ঞাসার জবাবে বল্লেন, বছরের প্রথম দিন সব শাকসব্জি মিলিয়ে নিরামিষ রান্না করবেন যাতে সারা বছর সব খেতে পারেন। এই হলো আমার প্রথম পহেলা বৈশাখ দর্শন। তখন আমি সেভেনে পড়ি, এত ছোট নই যে এই দিন উপলক্ষে আমাদের বাসায় কিছু হলে ভুলে যাবো, তাই বাসায় গিয়ে আম্মুকে সব বললাম। আম্মু বললেন,  আমরা কখোনো পহেলা বৈশাখে এসব খাই না বলে কি সারা বছর না খেয়ে থাকি? আমি বললাম, না তো।  আম্মু বললেন, এগুলো কুসংস্কার। আর মুসলমানের উৎসব দুটি,  দুই ঈদ। আমরা কেন অন্য দিনে দিবস পালনের নামে ভালোমন্দ খাবো। আগে কখনো দেখিনি আর আজ আম্মুর কথা দুই মিলিয়ে মাথায় সেট হয়ে গেলো এই দিবস মুসলমানের না। তখন ছোট ছিলাম, কিন্তু অবুঝ না। আমার মামী কিংবা তার বাড়িওয়ালাকে আর কোন আচার পালন করতে দেখি নি, যেমন সাদা লাল ড্রেস কিংবা ঘুরতে বের হওয়া।
এরপর দিনে দিনে বড় হলাম আর দেখতে থাকলাম প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে নতুন নতুন কিছু যোগ হচ্ছে কিন্তু বলা হচ্ছে এটা আমাদের ঐতিহ্য।  আসলেই কি তাই?
মোগল সময় থেকেই পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং কিছু আনন্দ উৎসব করা হতো। এছাড়া বাংলার সকল ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ করতেন। পহেলা বৈশাখ এসব কর্মকা-ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটি মূলত: রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন নিয়ম-কানুনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে কাজ-কর্ম পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ছিল। এ ধরনের কিছু সংঘটিত হওয়া মূলত ইসলামে নিষিদ্ধ বলার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
কিন্তু বর্তমানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এমন কিছু কর্মকান্ড করা হচ্ছে যা কখনোই পূর্ববর্তী সময়ে বাঙালীরা করেন নি; বরং এর অধিকাংশই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে প্রচণ্ডভাবে সাংঘর্ষিক। পহেলা বৈশাখের নামে বা নববর্ষ উদযাপনের নামে যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরীদেরকে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও এদেশের মানুষেরা যা জানত না এখন নববর্ষের নামে তা আমাদের সংস্কৃতির অংশ বানানো হচ্ছে।
আসলে সংস্কৃতি কি? সংস্কৃতির সংজ্ঞা খুজলে আমরা দেখতে পাই সংস্কৃতি বলতে বোঝায়, একটা জাতির দীর্ঘদিনের জীবনাচরণের ভেতর দিয়ে যে মানবিক মূল্যবোধ সুন্দরের পথে কল্যাণের পথে এগিয়ে চলে তাই সংস্কৃতি। বিভিন্ন আচার-প্রথা, নিয়ম কানুন, বিশ্বাস সব কিছুই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। একটি জাতির সংস্কৃতি বলতে সামগ্রিকভাবে অবশ্যই তার অস্তিত্ব ঐ জাতির সত্ত্বার মধ্যে থাকতে হবে।
অনেক প্রবীণ লোকের সাথে এই বিষয়ে কথা বললাম, প্রত্যেকেই বলল,  বর্তমানে পহেলা বৈশাখের নামে যা হচ্ছে তা কখনোই আমাদের সংস্কৃতি নয়, বিন্দু মাত্র ঐতিহ্যের অংশ ও নয়। অনেকেই বলল এই দিনে গ্রামে মেলা হত কারণ গ্রামে সব জিনিস সব সময় পাওয়া যায় না, এই দিন সব কিছু পাওয়া যেত। আর মিষ্টান্ন আর খেলনার লোভে এই দিনে বাচ্চারা মেলায় যেত কিন্তু কোন প্রকার শোভাযাত্রা বা অশ্লীল কোন আসর সেখানে বসত না। কিন্তু বর্তমানে সেই যায়গায় আমাদেরকে বাঙালী সংস্কৃতির নাম দিয়ে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?
আপনি যদি সংস্কৃতি ও বাঙালী সংস্কৃতির সংজ্ঞাটুকু লক্ষ্য করেন তবে নিশ্চিত হবেন মঙ্গলশোভাযাত্রা কখনই বাঙালী সংস্কৃতির অংশ নয়। হ্যা এটা চারুকলা নামক একটি সংস্থার বাৎসরিক অনুষ্ঠান হতে পারে, কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশের নয়।
মঙ্গলশোভাযাত্রার ইতিহাসে বলা হয়, এটা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। এটা পুরোটাই চীনা, ভারতীয় আঞ্চলিক ও হিন্দু সংস্কৃতির গোঁজামিল, যার খিচুড়ি পাকিয়েছে চারুকলার নামক একটি সংগঠন, যার সাথে পুরো বাংলাদেশের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নাই। এবং সেটাই এখন পুরো বাংলাদেশের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংস্কৃতি একটি প্রবাহমান নদীর মতো, বর্তমানে সংস্কৃতি অপসংস্কৃতি এলাকার হয়ে ঐ নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। এজন্যই আমরা দেখতে পাচ্ছি
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নামে যা হয়ে থাকে সেগুলো শতভাগ হিন্দুধর্ম চর্চা ছাড়া আর কিছুই নয়। বৈশাখের ১ তারিখ হিন্দুদের একটি মৌলিক ধর্মীয় উৎসবের দিন। এর আগে দিন তাদের চৈত্র সংক্রান্তি। আর পহেলা বৈশাখ হলো ঘট পুজার দিন। তারা ঐ দিন গণেশ পুজা করে। গনেশের বিভিন্ন মূর্তি তৈরি করে মঙ্গল শোভাযাত্রা করে।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য যে সকল কর্মসূচি থাকে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা, ঢাক বাজানো, উলু ধ্বনি দেওয়া, বট গাছের তলায় সমবেত হওয়া। আবার এ শোভাযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ থাকে বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তি ও মুখোশ। উল্লিখিত প্রতিটি কাজ হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্ম চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তাদের ধর্ম মতে দেব-দেবীদের বিভিন্ন বাহন রয়েছে। যেমন: লক্ষীর বাহন পেঁচা, সরস্বতীর বাহন রাজহাঁস, গণেশের বাহন ইঁদুর, দুর্গার বাহন সিংহ, মনসার বাহন সাপ, কার্ত্তিকের বাহন ময়ূর, মহাদেবের বাহন ষাঁড়, যমরাজের বাহন কুকুর, ইন্দ্রের বাহন হাতি, ব্রক্ষ্মার বাহন পাতিহাঁস, বিশ্বকর্মার বাহন ঢেঁকি, শীতলার গাধা ইত্যাদি। আর যেহেতু যানবাহন ছাড়া দেব-দেবীদের আগমন-প্রস্থান সম্ভব নয়, অতএব, তাদের পুজাতে, তাদের শোভাযাত্রাতে দেব-দেবীদের যান-বাহনের পুজাও করতে হয়। এসব  বাংলাদেশের সংষ্কৃতির অংশ কখনই ছিল না। বাংলাদেশের সংষ্কৃতির সাথে এসব দেবতার কোন সম্পর্ক নাই। গ্রাম-বাংলার কোন সন্তান সূর্যের প্রতিকৃতির মধ্যে এ ধরনের মাথা লাগায় কখন খেলছে বলেও কেউ দেখাতে পারবে না। বাংলাদেশের কোন মানুষ কখন এ ধরনের মূর্তি দিয়ে ঘর সাজিয়ে বলেও কেউ দেখাতে পারবে না।
আর একটি দিক হলো নারী পুরুষ অতিমাত্রায় সাজসজ্জা করে রাস্তায় বের হয়ে নির্লজ্জতা করা। এটা কি আমাদের সংস্কৃতির অংশ?  এটি এসেছে পাশ্চাত্য থেকে। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী দর্শনে সংস্কৃতি মানেই হলো চিত্ত বিনোদন।আর এর উপকরণ অশ্লীল গান বাজনা নৃত্য। আর যুবক যুবতীর প্রেমাভিনয়।আর সেটাই এখন পহেলা বৈশাখের নামে বাংলাদেশের যুবক যুবতীরা করে যাচ্ছে। আর এটাকে যায়েজ করার জন্য সম্ভাব্য সব মহল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা শুরু হওয়ার পর থেকে বখাটে দের হাতে কত কিশোরী, যুবতী লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে, এরপর ও দেশের নারীবাদীরা ও এটাকে বন্ধ করতে চাইছেন না। কারণ তারা অশ্লীলতার প্রসার চায়,  কিন্তু তারা উপলব্ধি করে না এর ফল কি।
যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।’’ (সূরা নূর: ১৯)
পহেলা বৈশাখের নামে এখন বাংলাদেশে যা চলছে পুরোটাই অপসংস্কৃতি।  এর সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোন সম্পর্ক নেই। মূলকথা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মুসলমানের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ ধ্বংসের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে,  হচ্ছে এই সব অপসংস্কৃতি। বাঙালী চেতনার নাম দিয়ে আমাদের মাঝে ঢুকানো হচ্ছে পাপ ও অশ্লীলতা। রুখে দাঁড়াবার এখনি সময়। আমরা যেন আমাদের বাংলাদেশী হিসেবে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় ভুলে যাই। তথাকথিত সংস্কৃতিতে গা না ভাসাই,  এটাই হোক নতুন বছরের চেতনা। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ