ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘মুসলিম মহিলাদের সাহিত্যিক প্রতিভা’

শায়লা আক্তার তাইয়্যেবা : ইসলাম পূর্ব আমলের আরবারা ছিল একটি কাব্য (সাহিত্য) রসিক জাতি। তাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে কবি ও কবিতার প্রভাব ছিল অপরিসীম। ইসলাম পূর্বে এবং ইসলামের পরেও শতবর্ষ পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে আরবীয় এ গুন বৈশিষ্ট পূর্ণমাত্রার বিদ্যামন ছিল। একচন আরব কবি তার কবিতার মাধ্যমে কোথাও যেমন আগুন জ্বালিয়ে দিত তেমনি কোথাও জীবনের বারি বর্ষণ ও করতো।
মুলগত ভাবে কাব্যচর্চা করা ভাল না মন্দ। কাবিতা ও কথার একটি প্রকার কথার ভাল মন্দ কবিতার ছন্দের উপর নির্ভরশীল নয় বরং বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। বিষয়বস্তু যদি খারাপ না হয় তাহলে কবিতার কোন দোষ নেই। গানের ও ঠিক একই অবস্থা। ভালোমন্দ নির্ভর করে বিষয়বস্তু উপর।
আয়েশা (রাঃ) বলেছেন কিছু কবিতা ভালো হয়, কিছু কবিতা খারাপ হয়, ভালোটা গ্রহণ কর, খারাপটি পরিত্যাগ কর। তাই ইসলাম পরবর্তী যুগেও কাব্য প্রতিভার এ গুণটি কেবল পুরুষদের সাথে সংযুক্ত ছিল না বরং নারীরাও এর সাথে সংযুক্ত ছিল। ইসলাম পরবর্তী যুগেও এমন অসংখ্য নারীর পরিচয় পাওয়া যায় যারা কবিতা ও সংগীত উভয়ই একম নৈপুণ্য দেখিয়েছেন যে তাদের কথা আরবি কাব্য সাহিত্যে একেকটি সৌন্দর্যে পরিনত হয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ) এর কাব্য প্রতিভা নিকছাদ ইবনুল আসওয়াদ বলেছেন ‘রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীদের মদ্যে কাব্যে ও ফারায়েজ আয়েশা (রাঃ) চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে এমন কাউকে জানিনে।
উপরোক্ত উক্তি থেকেই আয়েশা (রাঃ) এর কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে ধারনা করা যায়। আর এ গুণটি তিনি তার পিতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। উরওয়া (রাঃ) বলেছেন হযরত কাব ইবন মালিকের (রা:) একটি পূর্ণ কাসীদা হযরত আয়েশা (রা:) এর মুখস্ত ছিল। একটি কাসীদায় কম বেশি চল্লিশটি শ্লোক ছিল।
জাহেলী ও ইসলামী যুগের কবিদের বহু কবিতা এবং মুখস্ত ছিল সেই সকল কবিত বা তার কিছু অংশ সময় ও সুযোগমত উদ্ধতির আকারে উপস্থাপন করতেন। তার বর্ণিত বহু কবিতা বা পভক্তি হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্নিত হয়েছে।
কবিতা সম্পকে আয়েশা (রাঃ) এর ভাষ্য-
“তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শেখাও। তাতে তাদের ভাষা মাধুরীময় হবে।”
তিনি কবি যুহাইব ইবনে যানাবের নিম্নোক্ত পঙ্গক্তি দুইটি আবৃত করেছেন।
তুমি ওঠাও তোমার দূর্বলকে তার দুর্বলতা তোমার বিরুদ্ধে কোন দিন যুদ্ধ করবে না। অতঃপর সে মা অর্জন করেছে তার পরিনতি লাম করবে। সে তোমাকে প্রতিদান দিবে অথবা তোমার প্রশংসা করবে। তোমার কর্মের যে প্রশংসা করে সে ঐ ব্যক্তির মত যে প্রতিদান দিয়েছে।
হয়রত আয়েশা (রাঃ) নিম্নের দুইটি বয়ান দিয়ে প্রায়ই মিকাল দিতেন চলচক্র যখন তার বিপদ মুসীবত সহ কোন জনমন্ডলীর উপর দিয়ে বিপদ হয তখন তা আমাদের সর্বশেষ জাতিটির কাছে গিয়ে থামে আমাদের এ বিষয় দেখে মারা উৎফল্ল হয় তাদের বলে দাও তোমরা সতর্ক হয়। খুব শিগরই তোমরাও মুখোমুখি হবে যেমন আমরা হয়েছি।
হযরত আয়েশা (রাঃ) ভাই আবদুর রহমান মারা যাওয়ার পর মক্কায় দাফন করা হয়। তিনি যখন সেখানে যান নিম্নের স্লোগ দু’টি আবৃত্তি করেছেন আমরা দুইজন বাদশাহ জাহাঙ্গীর দুই সহচরের মতো একটা দীর্র্ঘ সময় এ সাথে থেকেছি। এমনকি লোকে আমাদের সম্পর্কে বলাবলি করত যে আমরা আর কখনও দুর্বল হবো না। অতঃপর আমরা যখন বিছিন্ন হয়ে গেলাম তখন আমিও মানিক যেন দীর্ঘকালসহ অবস্থান সত্ত্বেও একটি রাতও এক সাথে কাটাইনি।
মদিনায় প্রথম দিকে আসার পর সবাই যখন অসুস্থ হয়ে পরেছিল সে কষ্টের মুহূতেও সে কবিতা আওরাতেন। তিনি হাসনান বিন সাবেত কেও তার কাব্য প্রতিভার জন্য পছন্দ করতেন কবিতা শুনতেন। উষ্ট্রের যুদ্ধের  সময় ও তিনি কিছু কবির কবিতা আওরাতেন ও খুব কাদতেন। হযরত আয়েশা (রা:) ভাষাশৈলী ভাষার অলংকরণ সৌন্দর্য ছিল অসাধারন। যেমন তিনি ইফকের ঘটনার এক নির্মম রাতের বর্ননা রূপক ভাবে দিয়েছেন। সারা রাত আমি কাদলাম। সকাল পর্যন্ত আমরা অশ্রুও শুকায়নি এবং চোখের ঘুমের শুরমাও লাগায়নি (ঘুম আসেনি)
সর্বপরি তার সাহিত্য প্রতিভা কাব্য চর্চায় বড় কবিবাও হার মেনেছে।
খানসা সার্বিক ভাবে শ্রেষ্ঠ আরব কবি। তার কবিতা খন্ড খন্ড। অত্যন্ত বিশুদ্ধ প্রাঞ্জল, সূক্ষ শক্ত গঠন ও চমৎকা ভ’মিকা সম্বলিত। তার কবিতায় গৌরক যার প্রাধান্য প্রতি সামান্য। যতটুকু আমরা দেখেছি। বিশেষত তার দুই ভায়ের মৃত্যুতে তিনি যে দুঃসহ ব্যথা পান সে জন্য মরসিয়ার প্রাধান্য অনেক বেশি। তার মরসিয়ার অর্থ স্পষ্ট সূক্ষ কোমল এবং আবেগ অনুভূতির সঠিক মুখপত্র। তাতে অত্যাধিক দুঃখ ও এবং দুই ভাইয়ের প্রশংসায় অতিরঞ্জন থাকা সত্বেও তা বেদুইন পদ্ধতি ও স্টাইলের তিনি তার দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে অনেক মরসিয়া রচনা করেন। যেমন- ‘হে আমার দুই চোখ উদার হও কার্পণ করনা তোমরা কি দানশীল সাখরের জন্য কাদবে না? তোমরা  কি কাদবেনা তার মত একজন সাহসী ও সুন্দর পুরুষের জন্য? তোমরা কি কাদিবে না তার মত একজন যুব নেতার জন্য?
তার দুই ভাইয়ের গুণের কথা নিম্নোক্ত ভাষায় উপস্থাপন করেন। আল্লাহ্র কসম সাখর দিল অতিত সময়ের একটি ঢাল এবং পাট হাতি নেয়ার বিষাক্ত লাল ফলা। আর আল্লাহ্র কসম মুয়াবিয়া যেমন বক্ত তেমনি ফরিৎকর্মাও।
হযরত খানসা (রাঃ) এর কাব্য প্রতিভা-
আরবি কবিতার প্রায় সকল অঙ্গনে খানসার (রাঃ) বিচরণ। তবে মারসিয়া রচনায় তার জুড়ি মেলা ভার। আল্লামা ইবনুল আসীরে লিখেছেন আরবী কাব্য শাস্ত্রে প-িতরা এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে খানসার পূর্বে ও পরে তার চেয়ে বড় কোন মহিল দুনিয়ায় জন্ম হয়নি।
উমাইয়া যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জাবরে কে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল- আরবের শ্রেষ্ঠ কবি কে? জবাবে তিনি বলেছিলেন যদি খানসা না থাকতেন তাহলে আমিই।
বাশশার বিন বুরদ ছিলেন আব্বাসী যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আরব কবি। তিনি বলেন আমি যখন মহিলা কবিদের কবিতায় গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করি তখন তাদের প্রত্যেকেয় কবিতায় একটা না একটা ক্রুটি ও দুর্বলতা প্রত্যক্ষ করি। লোকেরা প্রশ্ন করলো খানসার কবিতার ও কি একই অবস্থা? বললেন তিনি তো পুরুষ কবিদেরও উপরে।
আধুনিক যুগের মিসরীয় পন্ডিত ডা. উমর ফারুখ হযরত খানসার কাব্য প্রতিভা ও তার কবিতার মূল্যায়ন করেছেন এভাবে।
সাখর হচ্ছে শীতকালের উষ্ণতা আর মুয়ারিয়া হচ্ছে বাতাসের শীতলতা। তারপর নিচের পঙ্ক্তি দুইটি আবৃত্তি করেন তারা দুইজন হলো দুঃসাহসী রক্তলাল তাজাওয়ালা সিংহ রুগ্ণ মেজাজ বুদ্ধি জালচক্রের মধ্যে দুইটি সাগর সভা সমাবেশে দুইটি চ- সমুদ্র ও মর্যাদায় পাহাড়ের মত নেতা ও স্বাধীন জাহেলী যুগে সমুদ্র আবুবের রীতি ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল পরস্পর মত বিনিময় শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রদর্শন ও প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন জায়গায় মোবার পর উমায়ের বাজারে সর্র্বশেষ মেলা হত। কবি খানসা (রাঃ) সেই সকল মেলা ও সমাবেশে অংশগ্রহণ করতেন এবং ঐ সময়ের মেলায় তার মরশিয়া অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে স্বীকৃত দিল। সবাই তার কবিতা শোনার জন্য কবির আগ্রহে বসে থাকতো। এসব মজলিসে খানসার বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক স্বরূপ তার তাঁবুর দরজায় একটা পতাকা উড়িয়ে দেখা হতো এবং তাতে লেখা থাকতো। যার অর্র্থ আরবের শ্রেষ্ঠ মরিচির রচয়িতা। উকাজ মেলায় শুধুমাত্র তার জন্য লাল তাঁবু নির্মাণ করা যেত। যেটা ছিল বিরল মর্যাদার প্রতীক। তার হাওয়াটি থাকতো বিশেষ ভাবে চিহ্নিত। উন্নত মানের কবিতা রচানার কারনে তাকে আন নাবিগা বলা হয়। আবু উবায়দা তার সস্পর্কে লিখেছেন। সকল কবির পুরোপুরি অবস্থানকারী প্রথম স্থানের অন্যতম কবি তিনি। কবি আন নাবিগার সভাপতিতে অনুষ্ঠিত কবি সম্মেলনেও তিনি যোগদান করেছেন। তিনি হাসসান বিন সাবিতের চেয়েও ভাল কবি ছিলেন। তার কবিতায় একটি দিওয়ান ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বেরুতের একটা প্রকাশনা সংস্থা সর্বপ্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করেন।
এমন আরো অনেক মুসলিম মহিলারা বিভিন্ন ভাবে সাহিত্যে চর্চা করতেন এবং সাফল্যম-িত অবস্থান ছিল অনেকরই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ