ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নারীর সহিংসতারোধে করণীয়

এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
২০১৫ ও ২০১৬ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি। সংস্থাটি জানিয়েছে, নারী নির্যাতনে জড়িত ৮৬ শতাংশ ব্যক্তির বয়স ৩৫ বছর বা এর কম। আর অভিযুক্ত পুরুষদের ৩৭ শতাংশের বয়স ১৮-২৪ বছর বয়সের।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- গত দুই বছরে ৯২ শতাংশ শিশু (১৮ বছরের নিচে) ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
বাংলা নিউজ ২৪ ডটকম এর ভাষ্যমতে- গত ২০১৫ ও ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ মাসে ৯৬৩৬ জন নারী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ ২২ মাসের সমানুপাতিক হারে চলতি বছর শেষে নারী সহিংসতার ঘটনা দাঁড়াতে পারে ১০৪৫৯ এ।
মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা সংক্রান্ত জরিপ ২০১৫ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই জীবনের কোনো না কোন পর্যায়ে নিজের স্বামীর শারীরিক, মানসিক, যৌন কিংবা অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি আরো জানান- ওই জরিপের  তথ্য অনুযায়ী মাত্র ২৩ শতাংশ নারী তার নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন এবং মাত্র ৩ শতাংশ নারী আইনী সহায়তার জন্য যোগাযোগ করেন। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়- পত্র পত্রিকায় যেসব ঘটনা আসছে তার থেকেও বেশী নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে।
সম্প্রতি নারীর প্রতি সহিংসতার কয়েকটি ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এর মধ্যে-
কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট সোহাগী জাহান তনু হত্যা।
সিলেটে খাদিজা বেগমকে বখাটে কর্তৃক প্রকাশ্যে হত্যার চেষ্টা
চট্টগ্রামের মিতু হত্যাকারী আজো- ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
ইভটিজিং এর শিকার মীরপুরের পিংকী ও তিষা হত্যা।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ১২ বছর বয়সের কাজলি গৃহকর্তার হাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে গত ১১ই মার্চ শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হসপিটাল- বরিশালে মৃত্যুবরণ করে।
গত ১৬ই মার্চ আরিফুন্নেসা আরিফা তার এক সময়ের বাল্যবন্ধু যাকে মা-বাবার অনুমতি ব্যতিরেকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিল তার অত্যচারে অতিষ্ঠ হয়ে যখন তাকে ডিভোর্স দেয় তার পরেই তার এক্স- স্বামীর হাতে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়।
এভাবে একটি ঘটনা আরেকটি সংঘটিত ঘটনাকে ঢেকে দিচ্ছে।
এটা প্রশ্ন থেকে যায় যে, প্রায় ২৫ বছর ধরে দুজন ক্ষমতাধর নারী দেশ পরিচালনা সত্ত্বেও নারী বৈষম্য ও সহিংসতার মাত্রা হ্রাস পাওয়া দূরের কথা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। সত্যি কথা বলতে যুগের পরিবর্তন হয়েছে ঠিক কিন্তু আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষের মন মানসিকতা ও আচরণের আজো তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ দূরের কথা ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না আমাদের কাজে কর্মে। নারী স্বাধীনতার রঙিন মোড়কে অনেক মন ভুলানো ও মুখরোচক কথা বলা হলেও বাস্তবে তারা শুধু উপেক্ষিতই নয় নানাভাবে তারা সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে।

নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ ও প্রতিকার
সামাজিক গবেষণায় নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার রূপ ফুটে উঠেছে। ঘরে বাইরে প্রতিনিয়ত এর শিকার হচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত। যেমন- যৌন নিপীড়ন, শিশু ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, পারিবারিক নির্যাতন- যৌতুক, গৃহকর্মী নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী কর্তৃক নিপীড়ন, মুজুরীতে বৈষম্য, হত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচণা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, চাকুরীর ক্ষেত্রে বৈষম্য ইত্যাদি নারী সহিংসতার বিভিন্ন রূপ।
সত্যিকার অর্থে আজ সারা বিশ্বব্যাপী মানবিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের সহিংসতা খুব স্বাভাবিক। কারণ নৈতিকতার যে ধস নেমেছে তার থেকে আমাদের ছোট্ট মুসলিম রাষ্ট্রটিও বের হয়ে আসতে পারেনি। শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে নৈতিক শিক্ষার বিলোপ সাধন এর প্রধান কারণ। ধর্মীয় শিক্ষা ও পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, অধিক বস্তবাদী চিন্তা চেতনা, ভোগবাদী মানসিকতা এর জন্য প্রধানত দায়ী। ‘কান টানলে মাথা আসে’ নারী সহিংসতাকে সব সময়ই খ-িতভাবে দেখা হয়েছে। নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে ও মানসিকতাকে উন্নত করতে যে ধর্মীয়বোধ, আল্লাহ ভীতি, পরকালীন জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে সেগুলোকেই উপেক্ষা করা হয়েছে বারবার।
যে ধর্মে নারীকে মায়ের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে, যার পায়ের নীচে জান্নাত ঘোষিত হয়েছে, সেই শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামকেই সবচেয়ে বেশী অবজ্ঞা করা হচ্ছে এবং নারী স্বাধীনতার প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করা হচ্ছে। তথাকথিত প্রগতিবাদী নারী নেত্রীরা মূল বিষয়ের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে আনুষঙ্গিক বিষয়ের ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং ধর্মবিরোধী শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন অনবরত। যার ফলশ্রুতিতে নারীরা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই চরমভাবে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবার আগে আমাদের মানসিকতাকে Change করতে হবে। নতুবা নারী মুক্তির পথ হবে সুদূর পরাহত।
এই বছরের নারী দিবসের যে শ্লোগান- “Be Bold for Change” এই Change আনতে হবে সাহসের সাথে আগে নিজের মাঝে, পরিবারের মাঝে তবেই তা সমাজে হবে প্রবাহিত। এ জন্য আমাদের যে সব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন :
১। সবার আগে আগামী প্রজন্মকে ধর্মীয় বিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন ও তার অনুশীলনে অভ্যস্ত করাতে হবে।
নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে।
নারী সমাজকে সমাজের বোঝা মনে না করে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে হবে।
সবাইকে নিজ নিজ ধর্মীয় বিধি-নিষেধ পালনে অভ্যস্ত করে তোলা।
যুব ও নারী সামজকে সচেতনতামূলক কর্মসূচির আওতায় আনা।
বিভিন্ন চ্যানেল ও নেটের অবাধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত করা।
সমাজে সুস্থ্য ও রুচিশীল সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা।
পারিবারিক এবং সামাজিক পর্যায়ে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তি, যৌতুক এবং মহিলাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দূরীকরণে ব্যাপকভাবে Motivational Program চালু করা।
প্রচলিত আইন-যেগুলো মহিলাদের জন্য নিপীড়নমূলক সেগুলোর সংশোধন এবং নিপীড়িত মহিলাদের বিশেষ সহায়তা দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করা।
সকল প্রকার নারী সহিংসতা সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা কারণ কথায় আছে- Justice delayed Justice denied.
নারীর জন্য সকল ক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক পরিবেশের ব্যবস্থা করা।
নারীদের জন্য পৃথক যানবাহন ও পৃথক কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা করা।
পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে ইসলাম নির্ধারিত পর্দার সীমা মেইন্টেইন করা।
পর্ণোগ্রাফি ও সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা।
বি.টি.আর.সি কে পর্ণো সাইট বন্ধ এবং এ ক্ষেত্রে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরালো করা।
বিচার ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বিশেষ বিশেষ সহিংসতার ক্ষেত্রে অপরাধীকে প্রকাশ্যে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ও সচেতনতা কার্যক্রমে পুরুষদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধ কার্যক্রমে তাদের অঙ্গীকার আদায় করা।
নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হচ্ছে নির্যাতনকারী শাস্তি না হওয়া। যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার হওয়ার কথা, বাস্তবে সেখানে ৫ থেকে ১০ বছর লেগে যাচ্ছে। বিচার দ্রুত হলে এবং মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হলে নারী নির্যাতনের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগ, গণ-মাধ্যম, শিক্ষক, কর্পোরেট সেক্টর, এনজিও, মসজিদের ইমাম এবং অন্যান্যদের সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি মনিটরিং এবং পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিটি নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগে সক্রিয়ভাবে যথাযথ কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে।
সর্বোপরি পরিবার থেকে শুরু করে কমিউনিটি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
ইসলাম নারীকে লাঞ্ছনা ও অবমাননা থেকে তুলে এনে এমন অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে যা অন্য কোন ধর্মে বা জাতিকে দেয়া হয়নি। একটি ছোট্ট উদাহরণ থেকে বুঝা যায়ঃ
“হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বলেছেন, নবী (সাঃ) এর যুগে আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে কথা বলতে এবং প্রাণ খুলে মেলামেশা করতেও ভয় পেতাম এই ভেবে যে, আমাদের সম্পর্কে কোন আয়াত নাযিল না হয়। নবী (সাঃ)-এর ইন্তিকাল হওয়ার পর আমরা প্রাণ খুলে তাদের সাথে মিশতে শুরু করলাম।” (বুখারী)
রাসূল (সাঃ) এর যুগে মুসলমানদের মনোভাব ছিল নারীদের ব্যাপারে কতটা সতর্কতামূলক!
আজ আমাদের বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যে- আমাদের দেশের তথাকথিত নারী স্বাধীনতার ধ্বজাধারী ও নারীবাদীরা “নারী মুক্তির ধর্ম” ইসলামকে বৈরী দৃষ্টিতে দেখে এবং ইসলামকে প্রগতির অন্তরায় মনে করে। তাদের এ মনোভাব মোটেই ঠিক নয়। ইসলামের প্রতি এ ধারণা আপন পায়ে কুড়াল মারার সামিল। তাই এ অবস্থা উত্তরণে আমাদের মত নারীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান-
নিজেকে চিনি
নিজের অধিকার সম্পর্কে জানি
সাহসিকতা ও আত্মোপলব্ধির সাথে এগিয়ে চলি-
জাগিয়ে তুলি গোটা সমাজকে। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ