ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতীয় ভিসা পেতে নানা জটিলতায় দালালদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে

খুলনা অফিস : ভারতীয় ভিসা পেতে নানা জটিলতায় দালালদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। টাকার বিনিময়ে দালালরা আবেদনকারীর প্রয়োজনীয় যে কোন কাগজপত্রের নকল তৈরি করে দিতে পারে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিদ্যুৎ বিলের কাগজ, নাগরিক সনদ, বিভিন্ন সংস্থার পেশাগত প্রত্যয়নপত্রসহ যে কোন সনদের ভুয়া কপি মুহূর্তের মধ্যে বানিয়ে দিতে পারেন তারা। ফলে ই-টোকেনের ঝামেলা না থাকলেও দালালদের দৌরাত্ম্য থেমে নেই। ভিসা পেতে আরও সহজ নিয়ম করার দাবি জানিয়েছেন ভিসা আবেদনকারীরা।
আকরাম হোসেন নামে একজন ব্যবসায়ী  অসুস্থ চিকিৎসার জন্য ভারতীয় ভিসার আবেদন করতে আসেন। তিনি বলেন, নিজের ঠিকানা প্রমাণের জন্য বিদ্যুৎ বিলের কপি দিতে হবে। কিন্তু আমার ভাড়া বাসায় প্রিপেইড মিটার। ফলে বিদ্যুৎ বিলের কাগজ আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। আমি শুনেছি টাকা দিলে দালালরা ব্যবস্থা করে দেবে।
কলেজ ছাত্রী আসমা তার অসুস্থ মা উষা মন্ডলকে নিয়ে ভারতীয় ভিসার আবেদন করতে এসেছেন। মায়ের উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে নেয়া জরুরি। ভিসা পেতে তাদের প্রয়োজন ভারত ও বাংলাদেশ ডাক্তারের অনুমতিপত্র। এমন খবরে দিশেহারা হয়ে পড়েন তারা। সহজ উপায় পেতে দালদের সাহায্য নেয়া হয়। তাই অতিরিক্ত দুই হাজার টাকায় এক ঘন্টায় তাদের মিলল কাক্সিক্ষত অনুমতিপত্র। এমন পরিস্থিতিতে দালালরাই তাদের কাছে আশির্বাদ হয়ে উঠেছে। আসমা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আরও সহজ নিয়ম হলে আমাকে দালালদের সাহায্য নিতে হত না এমনকি অতিরিক্ত টাকাও দিতে হত না।’
অভিযোগ রয়েছে, পাসপোর্ট অফিস ও ভিসা অফিসের সমন্বয় না থাকায় একই কাগজ আবেদনকারীকে দু’বার দিতে হয়। পাসপোর্ট তৈরির সময় আবেদনকারীর পুলিশ ভেরিফিকেশন ও ঠিকানা যাচাই হলেও ভারতীয় ভিসা আবেদনের সময় ঠিকানা প্রমাণের জন্য বিদ্যুৎ বিলের কপি দিতে হয়। এই বিলের কাগজ অনেক সাধারণ মানুষের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হয় না। ফলে তারা দালালদের সাহায্য নিতে বাধ্য হন। একইভাবে ব্যাংক স্টেটমেন্টও নকল তৈরি করে দেয় দালালরা। শহরে অধিকাংশ বাড়িতে প্রি-পেইড মিটার থাকায় বিদ্যুৎ বিলের কাগজ দিতে ঝামেলায় পড়তে হয় ভিসা আবেদনকারীকে। এছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রামে যারা বসবাস করেন তাদের অনেকেরই বাসায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। ফলে এর বিকল্প সমাধান না হলে নকল বিদ্যুৎ বিলের কপি ভিসা আবেদনের সাথে দেওয়া বন্ধ হবে না বলে মনে করেন সমাজের সচেতন মানুষ। সম্প্রতি ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট দাখিলের প্রমাণ পেয়েছে ভারতীয় ভিসা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। শাখা প্রধানের ফেসবুক পেজে এমনই একটি পোস্ট দেয়া হয়েছে। এমনকি যে সকল দালাল দ্বারা এই নকল স্টেটমেন্ট বানানো হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে ওই পোস্টে।
খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যালয়ের পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে সকল কাগজপত্র দিতে হবে তা নির্ধারণ করেন সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ। এতে আমাদের কিছু করার নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মেনেই আমরা পাসপোর্ট দিয়ে থাকি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যাম্বাসি আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
খুলনা ভারতীয় ভিসা প্রদানকারী এস্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসা পেতে হলে আবেদনকারীকে জাতিয় পরিচয়পত্র, বিদ্যুৎ বিলের কপি, ব্যাংক স্টেটমেন্টস ও পেশাগত সনদ/প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে। পেশায় ছাত্র হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে। কৃষক হলে তাকে জমির কাগজ অথবা ঋণ গ্রহণের প্রমাণপত্র দিতে হবে। চিকিৎসা করাতে গেলে তাকে ভারতীয় চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাতের প্রমাণপত্র ও নিজ দেশের চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের প্রমাণপত্র দিতে হবে। ভারতের স্টুডেন্ট ফিসা পেতে গেলে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমতিপত্র দিতে হবে। এতসব ঝামেলা এড়াতে অধিকাংশ মানুষই সাহায্য নেন দালালদের। ফলে ই-টোকেনের ঝামেলা না থাকলেও দালাদের আধিপত্য ঠিকই থাকছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা গ্রামের সহজ-সরল মানুষ এ সব নিয়ম শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন। ফলে সহজ ভিসা পেতে দালালদের সাহায্য নিতে হয় তাদের। ভারতীয় ভিসা অফিসের আশপাশ ঘিরেই রয়েছে দালালদের নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারে সহজেই প্রয়োজনীয় সকল কাগজের নকল তৈরি হয়ে যায়। গ্রাফিক্সের কারসাজি ও নকল সীলে ভুয়া কাগজপত্র চাওয়া মাত্র পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে দালাদের ধরতে প্রায়শ অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে দালালরা ধরা পড়লেও টাকার বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে যায়। তাই পুলিশের অভিযানে দালালদের গ্রেফতারেরও কমতি নেই। দালালদের অভিযোগ নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে তাদের কাজ করতে হয়।
রফিকুল ইসলাম নামে একজন ভারতীয় ভিসা আবেদনকারী অভিযোগ করে বলেন, একই কাগজপত্র দিয়ে পাসপোর্ট বানিয়েছি। তবে কেন আবার একই কাগজ ভিসা করতে দিতে হবে। আমাকে তো যাচাই-বাছাই করার পর পাসপোর্ট দেয়া হয়েছে। আর একই কাগজ দ্বিতীয়বার প্রমাণের কেন প্রয়োজন হবে?
এছাড়াও রয়েছে ডলার এনডোর্সমেন্ট’র (বিদেশি মুদ্রা দেশের বাইরে নিতে হলে পাসপোর্টে উল্লেখ করা) ঝামেলা। এনডোর্সমেন্টের ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে বিশেষ ক্রেডিট কার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার। কিন্তু প্রচারের অভাবে এ সম্পর্কে ধারণা নেই সাধারণ মানুষের। ফলে এক্ষেত্রেও দালালদের সহযোগিতা নিতে হয় ভিসা আবেদনকারীকে।
এ সকল জটিলতার সাথে একমত পোষণ করেছেন স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া খুলনা শাখার ব্যবস্থাপক মানিক চক্রবর্তী। তিনি বলেন, পাসপোর্টের বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তনশীল। তাই আবেদনকারীর বর্তমান ঠিকানা প্রমাণের জন্য বিদ্যুৎ বিলের আবশ্যকতা রয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশন থেকে এভাবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে প্রি-পেইড মিটারে বিলের কাগজে ঠিকানা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে আমরাও চিন্তিত। ঠিকানা প্রমাণের জন্য আমাদের বিকল্প উপায় বের করতে হবে। চিকিৎসার জন্য আবেদনকারীকে ভারতে যে চিকিৎসকে দেখাবেন তার এপয়েন্টমেন্ট’র যেকোন কাগজ হলেই চলবে। আবেদনকারী কোন বিষয়ে ভোগান্তি হলে সে ব্যাপারে হাইকমিশনের সাথে আলোচনা করে সহজ উপায় বের করা যাবে বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ