ঢাকা, মঙ্গলবার 11 March 2017, ২৮ চৈত্র ১৪২৩, ১৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির রক্ষার্থে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিশাল বনায়ন

সরওয়ার কামাল মহেশখালী (কক্সবাজার) : উপমহাদেশে হিন্দু র্ধমালম্বীদের সর্ব বৃহৎ র্তীথ স্থান আদিনাথ মন্দিরকে সাগরের ভাংগনের করাল গ্রাস হতে রক্ষার জন্য নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কক্সবাজারের মহেশখালীর আদিনাথ পাহাড়ের পাদ দেশে জেটি সংলগ্ন এলাকায় বাইন গাছের বিশাল বনায়ন করেছেন এক অসহায় মুক্তিযোদ্ধা রামহরি দাশ। নগন্য এক নিভৃতচারী, ধার্মিক, দেশপ্রেমিক,সামান্য বেতনভোগী এক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর বুকে সারা জীবন লালন করে আসছেন এই এক ব্যতিক্রমী স্বপ্ন। উপকূলীয় পরিবেশ রায় নিজেকে কিভাবে সম্পৃক্ত করে মানুষ ও পৃথিবীকে বাঁচিয়ে নিজেকে স্মরণীয় করে রাখা যায় সেই ভাবনা তাঁর। সেই অসাধারণ মানুষটির নাম মুক্তিযোদ্ধা রামহরি দাশ। জন্ম তার কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল কুতুবদিয়া উপজেলার বড় ঘোপ ইউনিয়নের আমজা খালী গ্রামে। বাবা স্বর্গীয় যুগল হরি দাশ, মাতা স্বর্গীয় মঞ্জুরী রাণী দাশ। ১৯৮৫ সালে এম,এল,এস,এস পদে সরকারী চাকুরী পেয়ে উপকুলীয় দ্বীপ মহেশখালী উপজেলার কেরুনতলী ভূমি অফিসে যোগদানের মাধ্যমে তার মহেশখালী আসা। চাকুরী পাওয়ার আনন্দে পুজো দিতে তিনি একদিন মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী আদিনাথ মন্দিরে গিয়ে দেখতে পান মৈনাক পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরটির চতুর্পাশে পরিবেশ যেন খাঁ খাঁ করছে।
নেই কোন গাছপালা। ন্যাড়া পাহাড়ের টিলায় ধুধু মরু শিলা আর মাটির মরা পাহাড়। মন্দিরের পূর্ব পাশে মহেশখালী চ্যানেল। সেই চ্যানেলের জোয়ার-ভাটায় সাগরের ঢেঊয়ে প্রতিনিয়ত ভাঙছিল আদিনাথ মন্দিরের পাহাড়টি। চ্যানেলের তীরবর্তী জেগে উঠছে চর।
রাম হরি অনুভব করেন এই চরে বনায়ন করলে এই আদিনাথ মন্দিরকে রক্ষা করা যাবে। আর ন্যাড়া পাহাড়ে বাগান করে মন্দিরে বনায়ন করা যাবে। সেই উপলব্ধিতে রাম হরি ১৯৯২ সালে মন্দির সংলগ্ন পূর্ব পাশে জেগে ওঠা চরে ২২ হাজার বাইন গাছের চারা লাগান। তিনি আদিনাথ মন্দিরের আশাপাশের সমগ্র এলাকাকে নিজের স্বল্প আয়ের বেতনের অর্থ দিয়ে সৃষ্টি করেন এ বাগান। বর্তমান আদিনাথ জেটির উভয় পাশে বিশাল আকারের যে প্যারাবন শোভা পাচ্ছে তা একমাত্র তারই অবদান। তার বেতনের টাকা,জিবি ফাউন্ড থেকে বিপুল পরিমান লোন,স্থানীয় কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ ও বন্ধু বান্ধব থেকে টাকা ধার নিয়ে মন্দির রক্ষার্থে ২২ হাজার বাইন গাছের চারা লাগান । শুধু তাই নয় তিনি আদিনাথের উন্নয়নে দিয়েছেন বহু কায়িক শ্রম। ফলে উপকূলীয় নদী সিকস্তিতে জেগে উঠেছে প্রায় ২’শত ৫০ একর জমি। জেগে উঠা ভরাট জমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের খাস খতিয়ানভূক্ত হয়েছে প্রায় ৬০ একর। মন্দিরের উভয় পাশে রক্ষা হয়েছে জনসাধারণের ৬০ একর এবং আদিনাথ মন্দিরের ৮০ একর জমি। এ সবই রাম হরি দাশের অকান্ত পরিশ্রমের ফসল। কথা হয় সেই অসাধারণ মানুষটি মুক্তিযোদ্ধা রামহরি দাশের সাথে তিনি আক্ষেপ করে বলেন মাননীয় প্রধান মন্ত্রী প্রতিবছর বনায়নের জন্য সরকারীভাবে সারা দেশ থেকে পুরস্কারের জন্য বাছাই করার আহবান জানান। আমি এশিয়া মহাদেশের সনাতন র্ধমাবলম্বীদের বিখ্যাত একটি আদিনাথ মন্দির রায় এবং পরিবেশ রায় একক ভাবে নিজের প্রচেষ্টায় ২২ হাজার চারা লাগালেও এখনো আমার কপালে পুরস্কার তো দূরের কথা, কোন স্বীকৃতিও মিলেনি। রাম হরি দাস শুধু বনায়ন করেনি, আরো কাজ করেছেন। মহেশখালীর হতদরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সুদুর ভারতের গয়া কাশি ধামে ও গঙ্গা সাগরে গিয়ে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানাদি পালন করতে পারেনা। যাদের টাকা আছে তারাই শুধু ভারতে গিয়ে এই পুজা করতে পারে। তাই তিনি হতদরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কথা চিন্তা করে আদিনাথ মন্দির সংলগ্ন স্থানে গয়াধাম,গঙ্গা-বিষ্ণু মন্দির স্থাপন করে সহজে গয়া কাশির ধর্মীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য মন্দিরের পাশে তৈরী করেছেন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য একটি শ্মশান,একটি গয়াধাম, গঙ্গা মন্দির ও গঙ্গা পুকুর (ব্যাস কুন্ড)। তাঁর স্ত্রী মন্দ্রিকা রাণী দাশ নির্মাণ করেছেন নবগ্রহ মন্দির ও মগধ্বেশরী মন্দির। বর্তমানে আদিনাথ জেটি হওয়ার কারণে পর্যটক সমাগম বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে আদিনাথ মন্দিরের পরিচিতিও প্রসার ঘটেছে। তিনি ১৯৮৭ সনে আদিনাথ মন্দিরের সম্পদের রণাবেন ও উন্নয়ন কাজের জন্য সনাতনী বিত্তবানদের নিকট আর্থিক সাহায্যের জন্য ব্যক্তিগত ভাবে অনুরোধ ও আহবান করেছিলেন। কিন্তু কেউ অদ্যাবধি সাড়া দেয়নি। তার পরও তিনি থেমে নেই। নিজস্ব বেতন, ব্যাংক ও জি.পি ফান্ড হতে কর্জ নিয়ে তিনি সম্পাদন করেছেন এসব কাজ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ