ঢাকা, বুধবার 12 April 2017, ২৯ চৈত্র ১৪২৩, ১৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হাজারীবাগে কর্মরত ২ লাখ লোক বেকার হচ্ছে ॥ শঙ্কায় উদ্যোক্তারাও

এইচ এম আকতার : ট্যানারিশিল্পকে কেন্দ্র করে হাজারীবাগ ও আশপাশে গড়ে উঠেছিল চামড়া সংশ্লিষ্ট নানা রকমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসব ট্যানারি ব্যাকলিংকেজ কারখানার সাথে জড়িত রয়েছে প্রায় ২ লাখ লোক। সম্প্রতি ট্যানারিগুলোর বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ওইসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। চামড়ার ঝুট কেনাবেচা, নন-ব্র্যান্ডের জুতা-স্যান্ডেলের উৎপাদক ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ব্যবসা হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।

জানা গেছে, পরিবেশ দূষণের হাত থেকে হাজারীবাগকে রক্ষা করতে ট্যানারি স্থনান্তরের উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। এ জন্য ২০০৩ সালের সম্পাদিত স্মারক অনুযায়ী সাভারে শিল্পনগরী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ১৫ বছরেও সাভারের ট্যানারি শিল্পের ৫০ ভাগও বাস্তবায়ন হয়নি। এ দীর্ঘ সময়ে তাদের নিয়ে কোন চিন্তা করেনি সরকার। তাদের কর্মসংস্থান কিংবা কোন প্লটের কথা ভাবেনি বিসিক। এ অবস্থায়ই সব ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরকার। এতে করে বিপাকে পড়েছে সংশ্লিষ্ট শিল্প মালিকরা।

ট্যানারিশিল্প নিয়ে চিন্তা করলেও সরকার এর সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্প নিয়ে কখনও চিন্তা করেনি। এখনও তাদের কোন চিন্তা নেই। প্রশ্ন হলে ব্যাকলিংকেজ কারখানা ছাড়া কিভাবে চামড়া শিল্প চলবে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট কেমিক্যাল কোথায় পাবে ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়াও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সরকার যদি ট্যানারি মালিকদের প্লট দিতে পারেন তাহলে কেন এসব ব্যাকলিংকেজ শিল্পের জন্য প্লট দেয়া হবে না। তাহলে সরকার কি চায় না এসব স্থায়ী ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকে থাকুক।

জানা গেছে, এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ক্যামিকেলের প্রতিষ্ঠান। রয়েছে চামড়ার ঝুট কারখানা, বিভিন্ন নন ব্র্যান্ডের জুতা-স্যান্ডেল। এর সাথে রয়েছে বেশ কয়েকটি গামের কারখানা। এসব কারখানায় কর্মরত রয়েছে প্রায় ২ লাখ শ্রমিক। এখানে চামড়া শিল্প না থাকলে এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে এসব কল- কারখানা। এদের জন্য সরকার সাভারেও কোন প্লট বা দোকানের ব্যবস্থাও করেনি। পুঁজি হারা এসব ক্ষুদ্র কারখানার মালিকরা কোথায় যাবে তা কেউ জানে না।

অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা ট্যানারি শিল্পের স্থানান্তর প্রক্রিয়া থেকে সুবিধা পাচ্ছেন না। হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে চামড়ার প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে জড়িত বৃহৎ ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ওই এলাকার প্রায় শতভাগ লোকই কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল চামড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়।

স্থানীয়রা জানান, সব মিলে সাড়ে ৩০০ ট্যানারি রয়েছে হাজারীবাগে। এতে কাঁচা চামড়া থেকে শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী লেদার তৈরি পর্যন্ত অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করতে হয়। সবগুলো স্তরের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে বৃহৎ ট্যানারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সেখানে দেড়শর মতো। চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার এ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে নানা ধরনের কেমিক্যালের প্রয়োজন হয়। এপেক্স, বে-বেঙ্গল, ক্রিসেন্টের মতো বড় ট্যানারিসহ বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল নিজেরাই আমদানি করে। কিন্তু ছোট ছোট ট্যানারিতে কেমিক্যালের সরবরাহের জন্য রয়েছেন বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ওই ব্যবসায়ীরা বড় বড় আমদানিকারকের কাছ থেকে কেমিক্যাল নিয়ে ছোট উদ্যোক্তাদের সরবরাহ করেন। তেমনি একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সজীব কেমিক্যালসের উদ্যোক্তা টিপু মিয়া। স্থানীয় ওই যুবক বলেন, সাধারণত কাঁচা চামড়াকে ওয়েট-ব্লু করার জন্যই সবচেয়ে বেশি কেমিক্যাল প্রয়োজন হয়। গত দুই মাসে সিংহভাগ ট্যানারির ওয়েট-ব্লুর কাজ সাভারে চলে গেছে। কেবল সেটিং, বাইবেডিং, টাগল ও প্লেটিংয়ের মতো কার্যক্রম চলছিল হাজারীবাগে। ফলে ছোটখাটো কেমিক্যাল ব্যবসা বন্ধ রয়েছে। এখন হাজারীবাগে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর হতে বাধ্য। কিন্তু সাভারের হেমায়েতপুরে এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাবেন কীভাবে? তার কোনো ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ ওই উদ্যোক্তাদের।

এদিকে এলাকায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ওইসব ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সার্চ লেদার নামে অপর একটি ছোট্ট দোকানে গিয়ে দেখা গেল, প্রায় সব নামি ব্র্যান্ডের জুতা-স্যান্ডেলই সেখানে পাওয়া যাচ্ছে। ওই দোকানের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আমীন জানান, তারা মূলত হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে ঝুট চামড়া কিনে থাকেন। সেগুলোর পাশাপাশি পুরান ঢাকার প্লাস্টিক কোম্পানিগুলো থেকে আসে বিভিন্ন মানের সোল। এসবের মাধ্যমেই কয়েকজন কারিগর নিয়োগ করে তিনি তৈরি করছেন সব ধরনের জুতা-স্যান্ডেল। ওই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ধানমন্ডি-১৫ নম্বর রোড থেকে শুরু করে হাজারীবাগের বিভিন্ন অলিগলিতে এমন কয়েক হাজার দোকান রয়েছে। একইভাবে কাজী আলাউদ্দিন রোড বেচারাম দেউরি, হাতির পুল এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব ব্যাকলিংকেজের দোকান। এসব দোকানে হাতে তৈরি করা লেদারের জুতা-স্যান্ডেলসহ সব ধরনের লেদার পণ্য পাওয়া যায়। সেগুলোর একটি আলাদা বাজার রয়েছে। প্রচলিত ব্র্যান্ডের চেয়ে এসব পণ্যের দাম অর্ধেক হওয়ায় এর রয়েছে বেশ জনপ্রিয়তা। কিন্তু ট্যানারি স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে ঝুট-চামড়াসহ বিভিন্ন কাঁচামাল দুর্লভ হয়ে পড়ছে।

আমীন বলেন, এ মুহূর্তে ১২০ জন কারিগর কাজ করেন কারখানায়। মূল ট্যানারিশিল্প স্থানান্তর হলেও চামড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য লিংকেজ শিল্পের সরবরাহ থাকলে এ ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া যেত।

এ প্রসঙ্গে ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, এখানে ট্যানারিশিল্প চলছে প্রায় ৬০ বছর আগে। ফলে এতে জড়িয়ে পড়েছে এখানকার মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রা। হাজারীবাগ এবং এর আশপাশ এলাকার প্রায় ২ লাখ লোক সরাসরি জড়িত এ পেশার সঙ্গে। এছাড়া পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে আরও অন্তত ২০ হাজার। সব লোকের জন্য সামগ্রিক আয়োজন সাভারে করা হয়নি।

সরেজমিন আইয়ুব ব্রাদার্স ট্যানারির ভেতরে ঘুরে দেখা গেছে, ছয় তলাবিশিষ্ট বিশাল ট্যানারির মধ্যে কয়েকশ স্তুপে পড়ে আছে প্রক্রিয়াজাতকৃত চামড়া। ওই প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার আকবর হোসেন জানান, প্রায় ৪৫ কোটি টাকার রফতানি আদেশ ঝুলে গেছে। চামড়াগুলো প্লেটিং, সিলেকশন ও মান যাচাইয়ের পরই শিপমেন্ট করা যেত। ক্রিসেন্ট ট্যানারিতেও এমন অবস্থা দেখা গেছে। সেখানকার শ্রমিকরা জানান, এ চামড়া পচে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। ফলে বড় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সাময়িক এ ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু চামড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘুরে দাঁড়াতে হলে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ