ঢাকা, বুধবার 12 April 2017, ২৯ চৈত্র ১৪২৩, ১৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আমরা ভাটিতে আছি তিস্তার পানি আসবেই কেউ আটকাতে পারবে না -প্রধানমন্ত্রী

গণভবনে ভারত সফর নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাকিদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : ছবি-বাসস

# পানি চেয়েছিলাম, বিদ্যুৎ পেয়েছি

# ড. ইউনুস মামলায় হেরে যান দোষ হয় আমার 

# গঙ্গা ব্যারেজ বাস্তবায়ন হবে আত্মঘাতী

# পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাবেন না

# হতাশ হবার মতো কোন কিছু ঘটেনি

স্টাফ রিপোর্টার : ভারত সফরে তিস্তাচুক্তি না হলেও হতাশ নন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বরং তিনি বলেছেন, আমরা আছি ভাটিতে। আমাদের কাছে পানি আসবেই। কেউ আটকে রাখতে পারবে না।

গতকাল মঙ্গলবার বিকালে গণভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন। ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতে রাষ্ট্রীয় সফর নিয়ে বিস্তারিত জানাতে এ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় উপস্থিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, আওয়াম লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম প্রমুখ। 

পানির জন্য নিজস্ব কিছু ড্রেসিং পদক্ষেপ নিতে হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পানি দাও, পানি দাও করে চিৎকার করলে হবে না। পানি আসবেই, বৃষ্টি বেশি হলেতো পানি ছাড়তেই হবে। তখন সেটা আমাদের ধরে রাখতে হবে। খালি হাতে তো আসিনি। পানি চেয়েছিলাম, বিদ্যুৎ পেয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকায় এসে বলেছিলেন পানি দেবেন, আমার এবারের সফরেও তিনি পানি না দেওয়ার কথা কিন্তু বলেননি। তিনি আশেপাশের কিছু নদীকে মিলিয়ে যৌথসমীক্ষার কথা বলেছেন। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, তিস্তাচুক্তি হবে। তিনি যখন বলেছেন, আমরা অপেক্ষা করতেই পারি।’

তিস্তা চুক্তি এড়িয়ে মমতার বিকল্প প্রস্তাব উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমিও তাকে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছি। তোর্সা ও জলঢাকা নদী থেকে আমাদের পানি না দিয়ে তারাই বরং তা তিস্তায় নিয়ে যাক। তারপর সেখান থেকে আমাদের পানি দেওয়া হোক। 

প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তিস্তার গজলডোবায় বাঁধ যখন করা হয়, তখন যারা আমাদের এখানে ক্ষমতায় ছিল, তাদের এ নিয়ে বক্তব্য থাকা উচিত ছিল। এ ব্যারেজের পরিকল্পনা ভারতের বহু আগে থেকে। আজ যারা চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছে, তারা টু শব্দ করেনি কেন তখন? আমরা আবার সেই নদীতেই ব্যারাজ বানিয়েছি। এর ফল আমরা এখন ভোগ করছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বন্ধুপ্রতীম ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ তাৎপর্যময়। এছাড়া ভারতে বিভিন্ন বৈঠক ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয়াদি উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্য পাঠ করতে গিয়ে তিনি জানান, এ সফরে ভারতের সঙ্গে ৩৫টি দলিল, ২৪টি সমঝোতা স্মারক ও ১১টি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।

 শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতাকারী দেশ ভারত বন্ধুপ্রতিম। সেই দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ে প্রশ্ন তোলা সমীচীন নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ বজায় রেখেই সব করা হবে। সুতরাং এ বিষয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোলা অর্থহীন।

শেখ হাসিনা বলেন, তিনি দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো কাজ করবেন না। তিনি বলেন, চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই নিয়ে যাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁরা বলবেনই। তিনি বেঁচে থাকতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কিছু হবে না।

সমঝোতা বা চুক্তি নিয়ে লুকোছাপার কিছু নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে রাজনীতি করি না। দেশের মর্যাদা আমার কাছে অনেক বড়।’

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ও অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মামলায় হেরে যান তিনি (ইউনূস), আর দোষ হয় আমার।

সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের (হিলারি-ইউনূস) ষড়যন্ত্র বহু আগের। আপনারা এত পরে জানছেন কেন? ভারতের একটি পত্রিকায় এ ষড়যন্ত্র নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর আপনাদের নজরে এসেছে।

ড. ইউনূসের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমের সম্পাদক, মালিক এবং শান্তির দূত (ইউনূস) মিলে আমাকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র করেছিল। সফল হয়নি। জনগণ তাকে (ইউনূস) মেনে নেয়নি।

তিনি বলেন, আদালতের সিদ্ধান্তে তাকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরে যেতে হয়েছে। যা হয়েছে আইনের মাধ্যমে। এখানে আর কারও হস্তক্ষেপ ছিল না। তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই আমাকে গ্রেফতার করা হয়। এই শক্তি এখনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আজ যারা বিবেকের কথা বলেন, তখন তাদের বিবেক কোথায় ছিল।

বিমানবন্দরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেখে অবাক হয়েছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সত্য কথা বলতে কি যখন জানতে পারলাম যে বিমানবন্দরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন, তখন অনেকটাই অবাক হয়েছি। কারণ আমরা আগে থেকে জানতাম, তার বিমানবন্দরে আসার কথা নয়। তাকে দেখে রীতিমতো সারপ্রাইজড (আশ্চর্য) হই।

গঙ্গা ব্যারেজ নিয়ে এক প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় যে নকশা তৈরি করেছে তা পুরোপুরি ভুল। ওটা বাস্তাবায়ন করা ঠিক হবে না। এটা আত্মঘাতী হবে। তিস্তা ব্যারেজের মতই আত্মঘাতী হবে। তাই আমি নিজেই তা বাতিল করে দিয়েছি। এরকম কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবেই করতে হবে। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য এমন প্রকল্পের খরচও যৌথভাবে বহন করতে হবে।

সম্মেলন শেষে উঠে চলে যাওয়ার সময় হঠাৎ ‘কথা আছে, কথা আছে’ বলে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের থামান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি দাঁড়িয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনারা ইলিশ খাবেন না, ইলিশ ধরবেন না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত সফরটা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। সম্পূর্ণ তৃপ্তি আছে। তৃপ্তিতে কোন সন্দেহ নেই। যে কোন কাজ আমি করি, তা ভেবেচিন্তে করি, সিদ্ধান্ত নেই। হতাশ হবার কিছু নেই। হতাশ হবার মতো কোন কিছু ঘটেনি।

তিনি বলেন, ভৌগলিক দিক থেকে ভারতের তুলনায় আমরা হয়তো ছোট, জনসংখ্যায় কম। কিন্তু সার্বভৌমত্বের দিক দিয়ে আমরা সমান। তৃপ্তির বিষয়টা হচ্ছে, এ সফরে ভারত যে সম্মান দিয়েছে, এই প্রাপ্তিটা বাংলাদেশের জনগণের। 

তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য ছিলো আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলা, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা গড়ে তোলা। আমরা যেমন নিজেদের উন্নত করতে চাই, তেমনি প্রতিবেশী দেশের উন্নয়ন চাই। তা না হলে টেকসই উন্নয়ন হবে না। এটাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা চাই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে।

 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এটাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি পর্যায়ে প্রথম ভারত সফর। প্রধানমন্ত্রী এর আগে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে এক সরকারি সফরে ভারত যান। ২০১৫ সালে ফিরতি সফরে বাংলাদেশে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ