ঢাকা, বুধবার 12 April 2017, ২৯ চৈত্র ১৪২৩, ১৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিশু রাজন হত্যায় ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল

 

স্টাফ রিপোর্টার : সিলেটের সবজি বিক্রেতা শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলায় চারজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে যাবজ্জীবন পাওয়া আসামী নূর মিয়ার সাজা কমিয়ে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া আরো পাঁচজনের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা বহাল রয়েছে। এদিকে প্রধান আসামী কামরুল ইসলামসহ চারজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান আলম।

গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। 

রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া চার আসামী হলেন- কামরুল ইসলাম, সাদিক আহমদ ময়না ওরফে ময়না চৌকিদার, তাজউদ্দিন আহমদ বাদল ও জাকির হোসেন পাভেল। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া নূর মিয়া শুধু ঘটনার ভিডিও করায় তার শাস্তি কমিয়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া সাত বছর করে কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে কামরুল ইসলামের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ও শামীম আহমদের। এক বছর করে দণ্ড বহাল রয়েছে দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীর। 

রায়ের পর রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান আলম বলেন, বিচারকদের প্রতি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশা করছি, দ্রুত সাজা কার্যকর হবে। আমার ছেলেকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, আর কারো সন্তান যেন এ রকম হত্যার শিকার না হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম বলেছেন, এই মামলা জনগণের কাছে শিক্ষণীয়। এ ধরনের অপরাধ করলে অপরাধীদের বা দোষীদের ফাঁসিতে ঝোলাসহ যেকোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। রাজনের ঘটনার মতো যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে সমাজকে নিরাপদ রাখতে রাষ্ট্রসহ সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যথাযথ শিক্ষার অভাবে দেশের অধিকাংশ মানুষের আইন সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। জনগণকে আইন ও আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন করতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রচারমাধ্যম, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা ও শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সামাজিক আন্দোলন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইন সম্পর্কে সচেতনতার জন্য বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

পর্যবেক্ষণে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম বলেন, পুলিশ ছাড়া সাধারণ ব্যক্তি যদি কোনো অভিযোগে কাউকে ধরে, তাহলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানাতে হবে। থানায় পাঠাতে হবে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত বা ধারণা সঠিক নাও হতে পারে। এই মামলায় আসামীপক্ষ দাবি করেছে, রাজন ভ্যান চুরি করেছে বলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। কিন্তু তা কোনো পক্ষের সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়নি। প্রত্যাশার বাইরে যখন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, তখন তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে যায়। 

বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের দেয়া রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম এই পর্যবেক্ষণ দেন। মূল রায়ের সঙ্গে এটি যুক্ত হবে বলে জানান আদালত।

আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, রাজনকে নির্যাতনের পর পানি না দেয়ার ঘটনাটি অমানবিক। আদালত বলেছেন, এই মামলায় উদ্দেশ্য খোঁজার (ইনটেনশন) প্রয়োজন নেই। ঘটনার প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য তৈরি হতে পারে।

আদালত বলেন, নির্যাতনের পর শিশুটি পানি চেয়েছিল, তা না দেয়া অমানবিক। ঘটনাটি নিষ্ঠুর ও নৃশংস। ভিডিও ফুটেজে প্রতীয়মান হয়, নির্যাতনের কারণেই ঘটনাস্থলে শিশুটি মারা যায়।

আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ঘটনাস্থলে যারা ছিল, তারা সেখানে দলগতভাবে পশুর মতো আচরণ করেছে। হারিয়েছিল মানবিকতা। তাদের আচরণ ছিল অমানবিক। আসামীপক্ষ ভিডিও ফুটেজ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ না করার যে কথা বলেছে, এর পেছনে আদালত কোনো যুক্তি খুঁজে পায়নি। এই মামলায় ভিডিও ফুটেজটি অবশ্যম্ভাবীভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য।

এর আগে ২০১৫ সালের ৮ নবেম্বর রাজন হত্যা মামলায় আসামী কামরুল ইসলামসহ চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালত। ওই সময় একজনকে যাবজ্জীবন ও পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। বেকসুর খালাস দেয়া হয় তিনজনকে।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া প্রধান আসামী সিলেটের জালালাবাদ থানাধীন শেখপাড়া গ্রামের কামরুল ইসলাম, পীরপুর গ্রামের সাদিক আহমদ ময়না ওরফে ময়না চৌকিদার, শেখপাড়া গ্রামের তাজ উদ্দিন বাদল ও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের জাকির হোসেন ওরফে পাভেল। এর মধ্যে জাকির হোসেন ওরফে পাভেল বর্তমানে পলাতক।

আদালত জালালাবাদ থানাধীন পূর্ব জাঙ্গাইল গ্রামের নূর মিয়া ওরফে নূর আহমদকে যাবজ্জীবন, শেখপাড়া গ্রামের দুলাল আহমদকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। লাশ গুমের চেষ্টার দায়ে আসামী কামরুলের মুহিদুল ইসলাম মুহিত, আলী হায়দার ও শামীম আহমদকে সাত বছর করে এবং সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার জাহাঙ্গীরগাঁও গ্রামের আয়াজ আলীকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। তাদের মধ্যে আসামী শামীম আহমদ পলাতক। খালাস পান জালালাবাদ থানাধীন হায়দরপুর গ্রামের রুহুল আমীন, কুমারগাঁও গ্রামের আজমত উল্লাহ ও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দক্ষিণ কুর্শি ইসলামপুর গ্রামের ফিরোজ আলী।

গত ১২ মার্চ আসামীদের করা আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষ হয়। তার আগে গত ৩০ জানুয়ারি আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শুরু হয়। গত বছরের ১০ নবেম্বর রাজন হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে এসে পৌঁছায়। পরে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়।

২০১৫ সালের ৮ জুলাই চুরির অপবাদে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন শেখপাড়ায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার বাদেয়ালি গ্রামের সবজি বিক্রেতা শিশু সামিউল আলম রাজনকে। লাশ গুম করার সময় ধরা পড়ে একজন। হত্যাকারীদেরই এক সহযোগী নির্যাতনের দৃশ্য ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিলে সারা দেশে তৈরি হয় তীব্র ক্ষোভ। পরে পুলিশ বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ