ঢাকা, বুধবার 12 April 2017, ২৯ চৈত্র ১৪২৩, ১৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সংসদ প্রসঙ্গে টিআইবির রিপোর্ট

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ-টিআইবি তার সর্বশেষ রিপোর্টে বর্তমান তথা দশম জাতীয় সংসদের কার্যক্রম সম্পর্কে গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছে। গত ৯ এপ্রিল রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পর্যবেক্ষণ আকারে উপস্থাপিত রিপোর্টের মূলকথায় দশম সংসদকে একটি ব্যর্থ ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিজেদের অভিমতের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে টিআইবি প্রধান পাঁচটি কারণ ও বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, এই সংসদের প্রধান বিরোধী দলের অস্তিত্ব ও ভূমিকা নিয়ে সঙ্গত কারণে সংশয় ও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, একই জাতীয় পার্টি একদিকে মন্ত্রিত্ব নেয়াসহ সরকারে রয়েছে, অন্যদিকে আবার প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালনেরও চেষ্টা চালাচ্ছে। এই দ্বিমুখী এবং পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে একথা প্রমাণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে যে, দশম জাতীয সংসদে সত্যিই কোনো বিরোধী দল রয়েছে। টিআইবির রিপোর্টে দ্বিতীয় প্রধান বিষয় হিসেবে প্রাধান্যে এসেছে সংসদের কোরাম সংকট। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ অধিবেশন পর্যন্ত সাত অধিবেশনের ১০৩টি বৈঠকে প্রতিদিন কোরাম সংকট হয়েছে ২৮ মিনিট করে। সে হিসাবে সাত অধিবেশনের মোট কোরাম সংকট ছিল ৪৮ ঘণ্টা ২৬ মিনিটের। এটা অনুষ্ঠিত অধিবেশনগুলোর মোট সময়ের ১২ শতাংশ। এর অর্থিক ক্ষতির পরিমাণও চমকে দেয়ার মতো। টিআইবি হিসাব করে দেখিয়েছে, প্রতি অধিবেশনে প্রতি মিনিটের জন্য ব্যয় হয় এক লাখ ৬২ হাজার টাকারও বেশি। সে হিসাবে কোরাম সংকটের কারণে সাত অধিবেশনে অপব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।
টিআইবির রিপোর্টে গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় বিষয় হিসেবে সংসদে অশালীন ভাষা এবং অসংসদীয় বক্তব্য রাখার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আলোচ্য সাত অধিবেশনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির এমপিরা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ এমন সব দলের বিরুদ্ধে দু’ হাজার ১০১ বার নোংরা ও অশালীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন এবং বক্তব্য রেখেছেন, যে দলগুলোর কোনো প্রতিনিধি সংসদে নেই। তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আয়োজিত নির্বাচন নামের প্রহসনে অংশ নেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও দলগুলোর বিরুদ্ধে দশ-বিশ বা শতবার নয়, দু’ হাজার ১০১ বার নোংরা, অশালীন ও অসংসদীয় ভাষায় আক্রমণাত্মক বক্তব্য রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ ও জাপার এমপিরা। নিজেদের মধ্যেও আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণ কম চালাননি তারা। টিআইবির হিসাবে সাত অধিবেশনে ৪৩৩ বার অশালীন ও অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন দল দুটির মন্ত্রী ও এমপিরা। এ ভারি লজ্জার কথাই বটে।
মাননীয় স্পিকারের ভূমিকা নিয়েও আপত্তি রয়েছে টিআইবির ওই রিপোর্টে। কারণ, অশালীন ও অসংসদীয় ভাষায় আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণের মধ্যেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে নীরব ও নিষ্ক্রিয় দেখা গেছে। অথচ প্রতিটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা, সংশ্লিষ্ট এমপিদের সতর্ক করা এবং প্রয়োজনে তাদের মাইক বন্ধ করে দিয়ে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করা স্পিকারের কর্তব্য ছিল। কিন্তু তাকে তৎপর হতে দেখা যায়নি। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে দু’ হাজার ১০১ বার নোংরা, অশালীন ও অসংসদীয় ভাষায় আক্রমণাত্মক বক্তব্য রেখেছেন সংসদের প্রধান দুই দলের ‘নির্বাচিত’ এমপিরা। অথচ সংসদে যে দলের প্রতিনিধিরা নেই সে দলের বিরুদ্ধে বিশ্বের কোনো দেশের পার্লামেন্টেই কাউকে বক্তব্য রাখতে দেয়া হয় না। অন্যদিকে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তেমন সুযোগ তো দিয়েছেনই, তার বিরুদ্ধে এমনকি গোপনে উৎসাহ যোগানোর অভিযোগও রয়েছে।
টিআইবির রিপোর্টে জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে এবং এমপিদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে একের পর এক দ্বিপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের কার্যক্রমকে অসমর্থনযোগ্য বলা হয়েছে। টিআইবি জানিয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমন  ৫৯টি চুক্তি করেছে, যেগুলোর ব্যাপারে সংসদ সদস্যদের কিছুই জানানো হয়নি। সরকার পেশ না করায় চুক্তিগুলো নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনাও হতে পারেনি। অথচ সংবিধানের নির্দেশনা হলো, যে কোনো আন্তর্জাতিক বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে চুক্তিগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত করতে হবে এবং এমপিদের সমর্থন ও অনুমোদন নিতে হবে। অন্যদিকে সব চুক্তিই সরকার করেছে সংসদকে অন্ধকারে রেখে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই টিআইবি বলেছে, বর্তমান পর্যায়ে সরকারের উচিত ভারতের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সকল চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সংসদে পেশ করা এবং সেগুলোকে এমপিদের ভোটে পাস ও অনুমোদন করিয়ে নেয়া।
এভাবে সব মিলিয়ে টিআইবির রিপোর্টে বর্তমান সংসদ সম্পর্কে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তাকে নৈরাশ্যজনক ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে কঠিন এ সত্যটুকুই বেরিয়ে এসেছে যে, নামে একটি সংসদ থাকলেও বাস্তবে সেটা ব্যর্থ ও অকার্যকর শুধু নয়, জাতীয় জীবনের কোনো ক্ষেত্রেও এই সংসদ কোনো অবদান রাখতে পারছে না। এমন অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে রয়েছে এর গঠন প্রক্রিয়া তথা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, প্রহসনের যে কর্মকাণ্ডে ১৫৪ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন। অন্যরাও সংসদে এসেছেন ভ’তুড়ে ভোটারদের ভোটে। মূলত সে কারণেই সংসদকে কার্যকর করার ব্যাপারে তারা কোনো ভূমিকা পালন করার দায়িত্ব বোধ করছেন না।
আমরা মনে করি, কেবলই প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে সরকারের উচিত টিআইবির আলোচ্য রিপোর্টের মূলকথাগুলো অনুধাবন করা এবং বিশেষ করে জনগণের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ সকল দলকে নিয়ে নতুন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উদ্যোগী হয়ে ওঠা। আমরা সংসদে শুধু জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্যদেরই দেখতে চাই। একই সাথে চাই, দেশে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটুক এবং সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিসহ সকল বিষয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হোক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ