ঢাকা, বুধবার 12 April 2017, ২৯ চৈত্র ১৪২৩, ১৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

যে ভালোবাসা বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়

পেঙ্গুইন আর মানুষের ভালোবাসার অসাধারণ এক দৃষ্টান্ত। একটি পেঙ্গুইনের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন ব্রাজিলের এক জেলে। এখন প্রতিবছর সাগরে থেকে এসে প্রাণরক্ষাকারীর সঙ্গে দেখা করে যায় সেই পেঙ্গুইন, ভালোবাসায় সিক্ত হয় দু’জন। ছ’বছর আগে মাছ ধরতে গিয়েই ‘জিনজিং’-এর দেখা পেয়েছিলেন হোয়াও পেরেরা ডি. সুজা। জিনজিং-ই সেই পেঙ্গুইন, যাকে দেখতে প্রতিদিন ইউটিউবে হুমড়ি খায় হাজার হাজার মানুষ।
২০১১ খ্রীষ্টাব্দে সাগরের জলে ভাসমান তেলে আটকে মরতে বসেছিলো জিনজিং। দেখে বড় মায়া হয় ডি. সুজার। কোলে করে নিয়ে যান ঘরে। সেবা দিয়ে বাঁচিয়েও তুলেন। বেঁচে উঠে কিন্তু সাগরে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেনি জিনজিং। গতিবিধি দেখে ডি. সুজার মনে হয়েছিল, সাউথ অ্যামেরিকান ম্যাগেলানিক পেঙ্গুইনটি বুঝি সাগরে আর ফিরবেই না। কিন্তু  একদিন ঠিকই সাগরে উধাও হলো জিনজিং। ডি. সুজা তো ধরে নিয়েছিলেন, জিনজিং এবার তাকে ভুলেই যাবে। ৭১ বছর বয়সি ডি. সুুজার এই ভুলও ভাঙে এক বছর না পেরোতেই। প্রাণ বাঁচানো প্রিয় মানুষটির কাছে একদিন ঠিকই ফিরে এলো জিনজিং। সেই থেকে প্রতিবছরই পাঁচ হাজার মাইল সাগর পাড়ি দিয়ে চলছে বন্ধুর নিকট আসা-যাওয়া। প্রতিবছর একবার ডি. সুজার বাড়িতে আসে জিনজিং। এসেই উঠে পড়ে কোলে। খিদে পেলে হা করে থাকে। মুখে তখন একটা একটা করে সার্ডিন মাছ তুলে দেন ডি. সুজা। গোসলের সময় আদুরে সন্তানের মতো চোখ বুজে থাকে। ডি. সুজা যেন তার পরম বন্ধু বা পিতা। অন্যের বেলায় জিনজিং একেবারে অন্যরকম। কেউ আদর করতে গেলেই ঠুকরে দেয়। তা দেখে ডি. সুজা বলেন, ‘আমি এই পেঙ্গুইনকে আমার সন্তানের মতো ভালোবাসি। আমার ধারণা পেঙ্গুউনটিও ভালোবাসে আমাকে। অন্য কাউকেও কাছেই ঘেঁষতে দেয় না, কাছে গেলেই ঠুকরে দেয়। অথচ দেখুন কিভাবে ও আমার কোলে এসে বসে থাকে, গোসল করাতে দেয়, সার্ডিন খাওয়ানোর সময় চুপ করে হা করে থাকে।’ (তথ্যসুত্র দৈনিক সংগ্রাম-৩০-০৩-২০১৬ খ্রিঃ)
পৃথিবীতে বিরল কিছু ঘটনা ঘটে, এটি তারই একটি নমুনা। উপকারীর উপকার স্বীকার করার ক্ষেত্রে বিশ্বের সকল ধর্মই মানুষকে সতর্ক করে। মানুষ সেটি ভুলে গিয়ে অকৃতজ্ঞ হয়ে পরার নজির অনেক। কিন্তু প্রাণীজগতের বহু প্রাণীর প্রভুভক্তের ঘটনা অসংখ্য। এমনকি ঘৃনিত প্রাণী কুকুরের প্রভুভক্তের ঘটনা কে না জানে। মা হারা ছাগলের ছানা, বাঘের ছানা, বানরের ছানা, এমনকি বিড়ালের ছানাকেও নিজ স্তনের দুধ পান করিয়ে আদর করার দৃশ্য এখনো চোখে পড়ে। স্টীমার থেকে পড়ে গিয়ে জনৈক পানিতে হাবুডুবু খেয়ে মরার সময় প্রভুভক্ত কুকুর জীবন রক্ষায় যে প্রাণ বাজি রেখেছিল সেটিও অনেকেই জানে। যে কারণে বিংশ শতাব্দীর সভ্যসমাজে পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিরাপত্তার প্রয়োজনে কুকুর কে আজও  ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনি ভাবে ঘোড়া, ঈগল, ময়না, কবুতর, বিড়াল, বানর, হাতি ইত্যাদি প্রাণীর প্রভুভক্তের বহু ঘটনার নজির রয়েছে। কিন্তু জিনজিং পেঙ্গুইন পাখিটি জীবন বাঁচানোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যে অসাধারণ, আশ্চর্য, অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য এবং অদ্ভুত ঘটনার অবতারণা করে চলেছে তা বিশ্ববিবেককে দারুন ভাবে নাড়া দিচ্ছে। পাখিটির নিকট থেকে তাবত দুনিয়ার মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করলে লোভ, হিংসা, অহংকার, পালিয়ে গিয়ে মানবিক গতিশীলতার সাইমুম এক সময় গোটা পৃথিবীকে গড়ে তুলবে নিরাপদ বাসযোগ্য শান্তির নীড়। এজন্য মানুষকে প্রকৃতি ও সৃষ্টিকুল থেকে শিক্ষাগ্রহণের বিষয়ে শ্রষ্ঠা বার বার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।    
পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জীবনের নিরাপত্তা ও বাঁচার অধিকার দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- ‘ভুপৃষ্ঠে বিচরণশীল সকল প্রাণী এবং নিজ ডানায় উড্ডয়নশীল পাখি তোমাদের মতোই জাতি। আমি লিখার মাঝে কিছুই বাদ দিইনী। তারপর তারা স্বীয় প্রতিপালকের সামনে একত্রিত হবে।’ (সূরা আন্য়াম: ৩৮) এ আয়াতের ভাব অর্থ থেকে বুঝা যায়, পাখিদেরও মানুষের মতো বাঁচার অধিকার রাখে। পাখিরাও মানুষের মতো সামাজিক জাতি।
আল্লাহ্র সৃষ্টিজীবকে কষ্ট দেয়া নিষিদ্ধ বিধায় অতিথি পাখিসহ সকল পাখি শিকার করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে বিধিনিষেধ আছে। মহানবী পাখিকে কষ্ট দেয়া অপরাধ মনে করতেন। হযরত আবদুুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন- ‘আমরা কোন এক সফরে রাসূল (সাঃ) সঙ্গে ছিলাম, এক স্থানে একটি চড়ুই পাখির দু’টি বাচ্চা সহ দেখতে পেলাম। আমরা বাচ্চা দু’টিকে হাতে তুলে নিলাম। ফলে (মা) চড়ুইটি অস্থির হয়ে তাদের মাথার উপরে ঘোরা-ঘুরি করতে লাগলো। প্রিয় নবী (সাঃ) তখন বললেন, বাচ্চা ছিনিয়ে নিয়ে কে তাকে কষ্ট দিয়েছে? তার বাচ্চা তাকে ফিরিয়ে দাও।’ (আবু দাউদ) এ বর্ণনায় পাখিদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মহানবী (সাঃ) আরো বলেন- ‘যে ব্যক্তি নিছক খেলার বশে কোন ছোট্ট চড়–ইপাখি হত্যা করবে, সেই হত্যাকৃত পাখিটিও বিচার দিনে ফরিয়াদ করে বলবে, হে আমার আল্লাহ্- সে নিছক চিত্তবিনোদনের জন্য আমাকে হত্যা করেছে।’ (নাসাঈ)। অন্যত্র নবী (সাঃ) বলেন- ‘যে ব্যক্তি কোন প্রাণী কে লক্ষবস্তু হিসেবে ব্যবহার করে, আল্লাহ্ তার প্রতি অভিসম্পাত করেন।’ (বুখারী ও মুসলিম )। ইসলাম ক্ষুদ্রতম প্রাণী পাখিদের প্রতি যে সুন্দর দয়া ও অধিকার প্রদর্শন করে  তাতে ধর্মের মাহাত্ত ও পূর্ণাঙ্গতাই প্রকাশ পায়। তা ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য ও সৌন্দর্য্য রক্ষার জন্য অতিথি পাখিদের পূর্ণ নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের হত্যা করা অমানবিক। তবে পোশা প্রাণী ও পাখির বিষয়ে ইসলামের বিধি অনুসরণে কোন বাধা নিষেধ নাই।
শীতের মৌসুমে হাজার হাজার সমদ্রের পথ পারি দিয়ে লাখ লাখ অতিথি পাখি কিচির-মিচির কলরবে বিশ্বের মানচিত্রকে একাকার করে দিয়ে ছড়িয়ে পরে দেশহতে দেশান্তরে, প্রান্তথেকে তেপান্তরে, দ্বীপথেকে দ্বীপান্তরে। পৃথিবীর উত্তারাঞ্চলের দেশগুলোয় শৈতপ্রবাহ ও তুষারপাতের হাত থেকে রক্ষা পেতে নাতিশীতোষ্ণ সুন্দর নির্মল শান্ত আবহাওয়ার পরিবেশে খাদ্যের সন্ধানে অতিথি পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে বেড়ায় দেশে দেশে। এসব পাখিদের আগমন সবুজ শ্যামল রূপ বৈচিত্র, মাধুরী প্রকৃতিকে করে নয়নাভিরাম।
নদী, হাওড়, বাঁওড়, বিল, বোটানিকাল গার্ডেন, লেক, সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, বন, জঙ্গল, গাছ-পালায় চেনা-অচেনা শতপ্রজাতির পাখির কলতানে প্রকৃতিকে করে বিমোহিত ও বিকশিত। এ সব চিত্র-বিচিত্র দৃশ্য ক্যামেরা/ ভিডিও হয়ে ছড়িয়ে পরে বিশ্বময়। কর্মযজ্ঞে রাত দিন ব্যস্ত থাকায় প্রকৃতির অপার  সৌন্দর্য্য যাদের দেখার সময় হয় না তারা এ দৃশ্য দেখে প্রাণ জুড়ায়।
অপর দিকে এক শ্রেণীর মানুষ লোভে পড়ে কিংবা অর্থের লোভে এসব অতিথি পাখি শিকার করে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের এরূপ নির্দয় পেশা থেকে অন্যকোন পেশা বেছে নেয়া দরকার। এতে করে এক দিকে যেমন নিজেদের পাপ মুক্ত রাখা যায়, অপর দিকে  অতিথি পাখিদের নিরাপত্তার বলয় শক্তিশালী হয়ে প্রকৃতির রূপ হয়ে উঠে অপরূপ।
-অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ