ঢাকা, বুধবার 12 April 2017, ২৯ চৈত্র ১৪২৩, ১৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচিত্র দেশের বিচিত্র মানুষ

মো. সাইফুল্লাহ মজুমদার : বিচিত্র দেশ এ জন্য বলছিলাম যে, পৃথিবীর এমন কোন দেশ বা এমন কোন ভূখ- খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল এলাকার মধ্যে ষোল কোটি মানুষ বাস করে। আবার এ বিচিত্র দেশের মধ্যে এত বিচিত্র চরিত্রের মানুষ বসবাস করে যে, তা কোন লেখকের পক্ষে লিখেও শেষ করা যাবে না। ষোল কোটি মানুষের এ রকম একটি অদ্ভুত জনবহুল দেশে আমরা বসবাস করছি, যেখানে প্রত্যেকটি মানুষের চরিত্র স্বতন্ত্র এক বিচিত্র ধরনের। এই দেশে শত শত লেখক, কবি, সাহিত্যিক গত হয়েছে, কিন্তু কেহই এই বিচিত্র দেশের বিচিত্র মানুষের চরিত্র লিখে শেষ করতে পারেননি। তবে শেষ পর্যন্ত এ বিচিত্র দেশের মানুষেরা বিচিত্রই রয়ে গেছে। এখন যে কারণে এ লেখা শুরু করেছিলাম সে আসল কথায় আসা যাক।
বিচিত্র মানুষ-১
বুয়া
বাসা পরিবর্তন করে নিজ বাসায় উঠলাম। নিজের বাসা, স্বাধীন বাসা, স্বাধীনভাবে বসবাস করব। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি স্বাধীনভাবে বসবাস করা যায়? হাজারো রকমের সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা তাহলো খাওয়ার সমস্যা। অসুস্থ বউ, তাই ঘরের নানাবিধ কাজ, রান্না-বান্না ইত্যাদি একাকী করতে পারে না। তাই প্রয়োজন একজন সহকারী বা কাজের বুয়া। কিন্তু চাইলেই কি বুয়া পাওয়া যায়? ঘরের কাজের বিশ্বস্ত বুয়া পাওয়া যে কতকঠিন কাজ তা ভুক্তভোগী মহলেই জানে। যাহোক পাশের বাসার বুয়ার সহযোগিতায় একটা বুয়া অবশেষে পাওয়া গেল। লিকলিকে পাতলা ও লম্বা গঠনের এই বুয়ার নাম আসমা। ঠিক ছোট বেলায় পড়েছিলাম কবি জসীম উদ্দিনের ‘আসমানী’ কবিতার আসমানীর কথা, তার সাথে হুবহু মিল রয়েছে। যাহোক এই আসমানী বা আসমার সহযোগিতায় ঘরের দৈনন্দিন কাজ ও রান্না-বান্নার কাজ চলছিল। এই হাড্ডিসার বুয়াটি মাঝেমধ্যে লাপাত্তা অর্থাৎ কাজে Unauthorize absent. তখন আমাদেরও বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, সে নিশ্চয়ই অসুস্থ। এ অবস্থায় পাশের বাসার বুয়ার মাধ্যমে তাঁর খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করি, তাকে দেখে আসার জন্য গিন্নিকে অনুরোধ করি। টাকা পয়সা দিয়ে অষুধ কেনার ব্যবস্থা করে সুস্থ করার চেষ্টা করি। কারণ বেচারী অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরাও যে সুস্থ থাকতে পারবনা। কারণ ঘরের কাজকর্ম, কাপড়-চোপড় ধোয়া, ঘর মোছা, রান্না-বান্না যে প্রায় বন্ধ। তাই নিজের স্বার্থেই তাকে সুস্থ করে তোলা জরুরি। এমন স্বার্থপর ভাল কাজ কিন্তু আমরা মাঝে মধ্যে করে থাকি। আসমাকে খুশি রাখার জন্য আমার স্ত্রী মাঝে মধ্যে তাকে ভাত-তরকারী দেয়, পুরাতন কাপড়-চোপড় দেয়, তার ছেলেমেয়েদের জন্যও খাবার পাঠায়, অর্থাৎ তাকে খুশি রাখা যে আমাদের জন্য জরুরি। কিন্তু হঠাৎ এ কাজে ছন্দ-পতন। আসমা আর আসবেনা, অর্থাৎ আমার বাসায় কাজ করবে না জানিয়ে দিল। সে গার্মেন্টস-এ কাজ করবে, আগেও সে কোন এক গার্মেন্টস-এ কাজ করত। আমার স্ত্রীর মাথায় হাত। এখন সে কি করবে? কি করে ঘর সামলাবে। কোথায় পাবে একটা বিশ্বস্ত বুয়া। কিন্তু আসমা নিজেই ঠিক করে আনল আর একটা বুয়া। নতুন বুয়া শুধু আমার ঘরেই নতুন নয়, শহরেই সে নতুন এসেছে। অপরের ঘরে সে কোনদিন কাজ করে নাই। একেবারে অজপাড়া গাঁ থেকে এসেছে। গ্যাসের চুলা সে দেখে নাই, জ্বালাতেও জানে না, রুটি বানাতে জানে না। এখন উপায় কি? আম্মা বললেন, কোনো সমস্যা নেই, আমি তাকে সবকিছু শিখিয়ে দেব। নিয়মিত আসা যাওয়া চলল, এর মধ্যেই আম্মা তাকে সবকিছু শিখিয়ে দিলেন। এখন আর কোনো অসুবিধে হয় না। আসমার মত এ আর ওরকম অসুস্থ হয়ে Unauthorize absent হয় না। কিন্তু মনে শুধু একটু অসন্তুষ্টি ভাব। বেতন কিছু বাড়িয়ে দেয়া চাই, যা আম্মাকে বলেছিল। চিন্তা করলাম বাড়িয়ে তো দেয়াই যায়। যেখানে আসমাকে সুস্থ রাখতেই বেতনের বাইরে অনেক টাকা চলে যেতো, এখন তাকে কিছু বেতন বাড়িয়ে দিলে অসুবিধে কোথায়? কিন্তু অসুবিধে যে আশপাশের বাসার অন্য বন্ধুরা। কারণ আমার বাসার বুয়ার বেতন বাড়ালে যে, অন্য বাসার বুয়ারা জেনে যাবে, তখন অন্য বাসার বুয়ারাও বেতন বাড়ানোর জন্য তাগিদ দেবে। এমতাবস্থায় অন্য বন্ধুরা আমার ওপর ক্ষেপে যাবে। কি মুশকিল! বলুনতো? বুয়ার বেতনও বাড়ানো যাবে না। প্রথম বুয়া আসমাকে তেরশ টাকা দিতাম, পরে এটা বেড়ে যখন পনর শত করলাম তখন আশপাশে সবাই প্রতিবাদ করল, বলল, আমরা বুয়াকে মাত্র একহাজার টাকা দিই। আর না তিনি তেরশত টাকা, তার উপর বাড়িয়ে আবার পনের শত টাকা। পাঠক সমাজ চিন্তা করুন তো? কত টাকা কত দিকে চলে যায়। এক কেজি ফল কিনলেওতো দেড়-দুইশত টাকা চলে যায, অথচ যে বুয়াটা দৈনিক আমার এত কাজ করিয়ে দেয়, কাপড়-চোপড় ধোয়, ঘর মোছে, মাছ তরকারী কুটে দেয়, এমন উপকারী মানুষটিকে একটু সাহায্য করা কি অন্যায়? পাঠক সমাজ ভেবে দেখুন, ভাল কাজ করাটাও অন্যের চোখে একটা অপরাধ। চিন্তায় পড়লাম, এখন কি করা যায়? আম্মাকে বললাম, কুসুমকে বলবেন বেতন বাড়ানোর কথা কাউকে বলা যাবে না। শুধু সে জানবে আর আমরা জানবো। গত মাসে বেতন দেয়ার সময় পনের শত টাকার স্থলে সতেরশ টাকা দিলাম। খুশিতে এমন হাসি দিল, কথায় বলে তার খুশিতে আল্লাহও খুশি হবেন। এমন উপকারী মানুষদের উপকার করতে আমি আনন্দ পাই।
লেখক : সিনিয়র প্রিন্সিপ্রাল অফিসার, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ, স্টেশন রোড শাখা, চট্টগ্রাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ