ঢাকা, বুধবার 12 April 2017, ২৯ চৈত্র ১৪২৩, ১৪ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চট্টগ্রামের নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সেক্রেটারির বিরোধ এখন তুঙ্গে

চট্টগ্রাম অফিস : চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং বর্তমান সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আ.জ. ম নাসিরউদ্দিনের বিরোধ এখন তুঙ্গে। সম্প্রতি মহিউদ্দিন চৌধুরী হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মেয়র আ.জ.ম নাসিরের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলে বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে। দুজনেই পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বক্তব্য দিচেছন।
 গত সোমবার এই দুই নেতার আহবানে তাদের সমর্থকরা নগরীতে পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করে। সোমবার বিকেলে নগরীর লালদীঘি মাঠে নির্ধারিত হোল্ডিং ট্যাক্স বহাল রাখার দাবিতে সোনালি যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী অভিযোগ করেন, বর্তমান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন সিটি করপোরেশনের দরজায় তালা মেরে সার্বক্ষণিক বন্দরের চেয়ারম্যানের কক্ষে বসে থাকেন। শুধু মেয়র নাছির নন, চট্টগ্রামের তিনজন সংসদ সদস্যও বন্দর চেয়ারম্যানের কক্ষে বসে থাকনে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, তারা সংসদে কথা বলে না, বলে বন্দরের চেয়ারম্যানের অফিসে। লজ্জা লাগে না। আপনি সংসদ সদস্য, বসে রইলেন বন্দরের চেয়ারম্যানের চেম্বারে। এটা কি আপনার দায়িত্ব? কি দায়িত্ব পালন করছেন। জাহাজের ব্যবসা, লোহার ব্যবসা, ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার ব্যবসা। সেটা তো আপনার কাজ নয়। নির্বাচনে কেউ এমপি হয়, পরবর্তীতে মন্ত্রী হয়। আবার কেউ মেয়র হয়, কেউ কাউন্সিলর হয়েছেন। তার ভাগ ভাগ আছে। কিন্তু সংসদে কথা বলবেন যারা, তারা সংসদে কথা না বলে বন্দরে বসে থাকেন। তিনি বলেন, চারটি স্টিভিডোরশিফ নিয়েছেন। একটা লোক একটা স্টিভিডোরশিফ নেবেন। কিন্তু কি কারণে, বাহুবলে চারটি নিয়েছেন। সেটা তো তার দায়িত্ব নয়। তবুও তিনি সেসব কাজগুলো করছেন। তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশনে একজন অ্যাস্টেট অফিসার আছে, একজন সিআরও (প্রধান রাজস্ব অফিসার) আছে। কিন্তু আরও ৭-৮ পদ আছে, সেখানে স্থায়ী কেউ নেই। অস্থায়ী লোকদের দিয়ে চালানো হচ্ছে। কিন্তু আবার দুজন চিফ ইঞ্জিনিয়ার আছে সেখানে। পাগলের আড্ডাখানা বানিয়ে ফেলছে সিটি করপোরেশনে। উনি (নাছির) থাকেন না, তালাভরে রাখেন। তার কিছু তল্পিবাহক, যারা তার নামে স্লোগান দেন তাদের সেখানে চাকরি দিয়েছেন।
এদিকে মেয়র নাসির গ্রুপের নেতাকর্মীরা সোমবার নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে মিছিল সমাবেশ করেছে। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এক অনুষ্ঠানে বলেন, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত সহ কোন বাধাই তার চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখতে পারবে না। নগরবাসীকে দেয়া প্রতিটি ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করাই তার অঙ্গীকার। মেয়র বলেন, মানুষের দোয়া ও ভালবাসা থাকলে কোন চক্রান্তই সফল হবে না। মেয়র অতিতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বাস্তব কিছু চিত্র উপস্থাপন করে বলেন, যারা নালা-নর্দমা ও ফুট-পাত দখল, প্লট বরাদ্দের নামে ধোঁকাবাজি, আয়বর্দ্ধক প্রকল্পের নামে সরকারী সম্পদ অপচয়, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য অবৈধ দখল সহ ভোগ বিলাসের জন্য বহুমুখী অবৈধ পন্থা অবলম্বন করেছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্তরের জ্বালা প্রশমিত করার জন্য নগরবাসীর সামনে মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, অতিতে অনেক দু:সময় ও প্রতিকুলতা মোকাবেলা করে জনগনের রায় নিয়ে ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে সততার সাথে সেবা করার মানসিকতায় দায়িত্ব পালন করছি। এ ক্ষেত্রে কোন অপশক্তি সফল হবে না। ৩ অর্থ বছরের মধ্যে নাগরিক সেবা শতভাগ নিশ্চিত করা হবে। উন্নয়ন, আলোকায়ন ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করে চট্টগ্রামকে বিশ্বমানের নগরীতে উন্নিত করা হবে। আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, পৌরকর নাগরিক সেবার একমাত্র উৎস। সরকারের বিধি-বিধান, আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি অনুসরন করে নাগরিকদের কাছ থেকে পৌরকর আদায় করার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। মেয়র ও তার পরিষদের পক্ষে পৌরকর ধার্য করার বা বৃদ্ধি করা কোন একতিয়ার নেই। উত্তরাধিকার সূত্রে ১৯৮৫ সন থেকে পৌরকর ধার্যকৃত হারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বর্তমানে কর পুন:মূল্যায়ন করছে মাত্র। এ বিষয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মত অন্তর জ্বালা প্রশমিত করার কোন সুযোগ নেই।
 এদিকে লালদীঘির মাঠে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমাবেশ প্রসংগে গতকাল মঙ্গলবার মেয়র আ, জ, ম নাসির সাংবাদিকদের কাছে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, লালদিঘীর মঞ্চে কারা ছিল, কে ছিলেন। তাকে চট্টগ্রামের পুলিশ, চট্টগ্রামবাসী, নন্দনকাননবাসী কী হিসেবে জানে। পাঠানটুলী ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি যে ২০১৩-১৪ সালে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধের আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর ছিল। এগুলো কীসের আলামত। উনার লজ্জা থাকা উচিত। আউটার স্টেডিয়ামের সুইমিং পুল নির্মাণকাজ বন্ধের আলটিমেটাম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মেয়র নাছির বলেন, এগুলো আমি থোরাই কেয়ার করি। উনি ইরাকে ১০ হাজার যোদ্ধা পাঠাবেন বলেছিলেন। পাঠাইছেন? কাস্টমসের দুর্নীতিবাজদের তালিকা করবেন বলেছেন। করেছেন? এমএ লতিফের মাথায় লাঠি মারতে বলেছেন। উনার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। একই ট্যাবিলে বসে ভাতও খাচ্ছেন। ছালাম সাহেবের ফাঁসি দাবি করেছেন, আবার উনার মেজবানে সবার আগে গিয়ে বসে থাকছেন। উনি তো অনেক কথা বলেন। নাছির বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলবেন, সেভাবে করবো। আমাদের হাইয়েস্ট বডি আছে। আমি ভুল করলে উনি কি অথরিটি? ভুলের সংজ্ঞা কী? একটি মিথ্যা বারবার বললে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ উনি ৩০ বছর ধরে মিথ্যাচার করছেন। আমি কোন পরিবারের সন্তান, কোন বংশের ছেলে, এ শহরে কতটুকু কী আছে সবচেয়ে বেশি উনি জানেন। চট্টগ্রাম শহরে থাকার মতো মাথাগোঁজার ঠাঁই উনার ছিল না। এগুলো বলতে চাইছি না। আমরা কারও চরিত্র হনন করার পক্ষপাতি নই। নিচু মনের মানসিকতা আমার নেই। কালকে উনি যা করেছেন, সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না।
এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর জিইসি মোড়ের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ঈঙ্গিত করে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ‘১৭ বছর মেয়র থাকা অবস্থায় আমি যদি কোন অন্যায় করে থাকি, তাহলে আপনাকে বলতে হবে কি অন্যায় করেছি। কখনো জুলুম করিনি, কারো জায়গা দখল করিনি। আমি চেষ্টা করেছি ট্যাক্স ছাড়া বাইরে থেকে টাকা এনে টুইনসিটির মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে উন্নতি করতে। এখানে আমার অপরাধটা কোথায়? কোন অপরাধ করিনি, চ্যালেঞ্জ করলাম।’ মহিউদ্দিন বলেন, ‘অন্যায় আমি করি বা আপনি করেন, যেই করেন, তা সামনে আনার দরকার আছে। সংশোধন হওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নয়, তাকে আমি মেয়র হিসেবে বলেছি। খারাপ আচরণ করা ঠিক নয়। উঠতি একজন মেয়রের উক্তি সুন্দর হওয়া চাই। আলাপ-আলোচনা-কথাবার্তায় গাম্ভীর্য না থাকা ঠিক নয়। যে খারাপ উক্তি করেছেন, তার জন্য আমি দুঃখিত নই।’ ‘প্রশ্ন করুন, সত্য বিষয় আমি উদঘাটন করবই। জনগনের ডিমান্ড নিয়ে আমার কথা বলার দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে বলে মনে করি। লালদীঘি মাঠে সভা ডেকেছি অধিকার নিয়ে, কারো বিরুদ্ধে বলার জন্য সভা ডাকিনি। অন্যায় যে করবে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। বললে সংশোধন হবে। এখানে হয়তো বা কেউ মনঃক্ষুন্ন হতে পারে। মনঃক্ষুন্ন হওয়ার কিছু নেই, আপনি অন্যায় করলে, আপনার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, সংশোধন করা, কথা বলার অধিকার আমি রাখি। তাছাড়া আমি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সাথে এটা গ্রুপিং নয়, দ্বিধা-দ্বন্ধও নয়। আমার সাধারণ সম্পাদক যদি অন্যায় করে থাকে, আমার দায়িত্ব তাকে সংশোধন করা। তিনি বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাকে প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন দিয়েছেন, আমি সমর্থন করেছি। অন্তর্জালা থাকলে তো সমর্থন করতাম না। কিন্তু মেয়র হিসেবে তিনি অযোগ্য, অথর্ব। তিনি যদি সংশোধন হয়ে আসেন তাহলে আবারও তার পাশে থাকবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ