ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 April 2017, ৩০ চৈত্র ১৪২৩, ১৫ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হাসিনা ভারতকে সব দিয়ে খালি হাতে ফিরেছেন

গতকাল বুধবার গুলশান বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া -সংগ্রাম

# ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থনেই জনবিচ্ছিন্ন সরকার ক্ষমতায় এখনো টিকে রয়েছে

# প্রতিনিধিত্বহীন সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার রাখেন না

# আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা কারো দয়া-দাক্ষিণ্য বা করুণার বিষয় নয় 

# গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেই কোনো রাষ্ট্রের কাছ থেকে জাতীয় স্বার্থ আদায় সম্ভব 

# কওমী মাদরাসা সনদকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে সব দিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে কতগুলো আশ্বাস নিয়ে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, অতীতের ধারাবাহিকতায় ভারতের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও প্রস্তাবিত বিষয়গুলোতেই কেবল অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা সই করা হয়েছে। এই সফরকে দেশবাসী কেবল দেয়ার এবং কিছু না পাওয়ার এক চরম ব্যর্থ সফর বলেই মনে করে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে গতকাল বুধবার গুলশানে নিজের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। 

সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, হাফিজউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান, মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, রুহুল আলম চৌধুরী, ডা.এজেডএম জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, শওকত মাহমুদ, আমানউল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, আবদুল কাউয়ুম, শামা ওবায়েদ, খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

২০ দলীয় জোটের দলগুলোর নেতাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম ছাড়া জোট নেতা টিআইএম ফজলে রাব্বী, এম এ রকীব, আবদুল করীম, শফিউল আলম প্রধান, আবদুল করীম আব্বাসী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জেবেল রহমান গানি, আজহারুল ইসলাম, আবু তাহের চৌধুরী, গরীবে নেয়াজ, সাঈদ আহেমেদ, মহিউদ্দিন ইকরাম, মাওলানা শফিকউদ্দিন, সাইফুদ্দিন মনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন ।

খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা গত সাত থেকে দশ এপ্রিল ভারত সফর করে ফিরে এসেছেন। গত মঙ্গলবার সফরের ওপর তিনি সাংবাদিক সম্মেলনও করেছেন। সফরকালে বাংলাদেশের জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে দু’দেশের মধ্যে অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সেগুলোর বিশদ বিবরণ ব্রিফিংকালে প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, এই সফরের আগে থেকেই দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও যথেষ্ঠ উদ্বিগ্ন ও শংকিত ছিলাম। কারণ প্রস্তাবিত চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে সফরের আগেও রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি এবং কারো মতামত নেয়া হয়নি। তাদের একতরফা কথিত পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হয়নি। এই গোপনীয়তার কারণে সকলের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছিলো সফরের পর তা যথার্থ প্রমাণিত হয়েছে। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বাংলাদেশী রফতানি-পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার মতো বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোতে এই সফরে কোনোই অগ্রগতি হয়নি। জনগণের দাবি সত্ত্বে¡ও আমাদের ঐতিহ্য ও গৌরবের সুন্দরবন-বিনাশী এবং পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান পরিবর্তনের জন্য তিনি একটি কথাও বলেননি। বরং প্রধানমন্ত্রীকে কতগুলো আশ্বাস নিয়ে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, অতীতের ধারাবাহিকতায় ভারতের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও প্রস্তাবিত বিষয়গুলোতেই কেবল অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা সই করা হয়েছে। এই সফরকে দেশবাসী কেবলই দেয়ার এবং কোনো কিছুই না পাবার এক চরম ব্যর্থ সফর বলেই মনে করে।

দেশজাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ স্বার্থ জড়িত রয়েছে এমন কোনো বিষয়ে বিএনপি নীরব থাকতে পারে না মন্তব্য করে সাবেক এ পধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে নির্বাচনের নামে একটি প্রহসন করেছিল। ১৫৪টি আসনের প্রার্থীদেরকে কোনো রকম প্রতিদ্বন্ধিতা ছাড়া নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। বাদবাকী আসনগুলোতেও বিএনপিসহ উল্লেখযোগ্য কোনো বিরোধী দলই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এই প্রহসনে শামিল হননি। ভোটাররাও একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন সেই নির্বাচনী প্রহসন ব্যাপকভাবে বর্জন করেন। এমন প্রহসনের মাধ্যমে নির্বাচিত বলে ঘোষিত সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত সংসদে কার্যকর কোনো বিরোধী দলের অস্তিত্বও নেই। ফলে দেশে বলবৎ রয়েছে জবাবদিহিতাহীন একতরফা স্বৈরশাসন। এতোবড় প্রহসন ও জালিয়াতির মাধ্যমে গঠিত সরকারের নৈতিক কোনো ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। জনগণের সম্মতি ও প্রতিনিধিত্বহীন এ ধরণের সরকারের জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার ও অধিকারও থাকে না। 

তিনি বলেন, কলঙ্কিত ও প্রহসনের নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের তদানীন্তন সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে খুবই ন্যক্কারজনকভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল। ভারতের তদানীন্তন বিদেশ সচিব বাংলাদেশ সফরে এসে ক্ষমতাসীনদের প্রহসনের নির্বাচনের নীল-নকশা বাস্তবায়নে প্রকাশ্যে যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তা কারো অজানা নয়। জনগণ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে ভারতের বিগত সরকারই আওয়ামী বলয়ের শাসন ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার ক্ষেত্রে সরাসরি সহায়তা করেছে এবং তাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনেই এদেশের জনবিচ্ছিন্ন সরকার ক্ষমতায় টিকে রয়েছে। এ জন্যই বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি বা সমঝোতার ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারেনি বা করেনি। তারা কেবল কৃতজ্ঞতার ঋণই ক্রমাগত শোধ করে চলেছে। এতে বিসর্জন দেয়া হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা। 

খালেদা জিয়া বলেন, এই সফরে প্রতিরক্ষা বিষয়ক কোনো চুক্তি ও সমঝোতা সই না করার ব্যাপারে সফরের আগেই বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুধীসমাজ ও সচেতন নাগরিকবৃন্দ প্রকাশ্যেই তাদের মতামত জোরালোভাবে ব্যক্ত করেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি জাতীয় ঐক্যমত গড়ে উঠেছিলো। বিএনপির পক্ষ থেকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের মতামতের প্রতিধ্বনি করে আমরাও এ ধরনের কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না করার দাবি জানিয়েছিলাম। তা সত্ত্বে¡ও জনসাধারণের মতামতকে উপেক্ষা করে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই করা হয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আমরাও শংকিত। তিনি বলেন, বিএনপি দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার কায়েমের জন্য গুম, খুন, নির্যাতন, জেল, গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়েও সাধ্যমতো আন্দোলন চালিয়ে আসছে। অনেক বিষয়েই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আমাদের মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব রয়েছে। তা সত্ত্বে¡ও জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রথা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার বিষয়ে আমরা সকলে মিলে একটি অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের পক্ষে। 

ভারতের সঙ্গে কোনো বৈরীতা নেই মন্তব্য করে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা বলেন, অগণিত প্রাণদান ও ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতার কথা আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে অর্থনীতি, বাণিজ্য, পানিসম্পদ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাবলীর নিরসনের নীতিতে আমরা বিশ্বাসী। ভারতের জনগণের সঙ্গে শান্তি ও সহযোগিতার আবহে আমরা পাশাপাশি বাস করতে চাই। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বে¡ও প্রতিবেশী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ব্যাহত করতে ভারতের বিগত শাসকদের একতরফা ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। আমরা আশা করি ভারতের বর্তমান সরকার অতীতের সেই ভুল থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের মনোভাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন। গণবিচ্ছিন্ন কোনো পক্ষের সঙ্গে কোনো চুক্তি করা বা চাপিয়ে দেয়াই বড় কথা নয়। মানুষের সমর্থন ছাড়া কোনো সমঝোতা বা চুক্তিই যে কেবল গায়ের জোরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, তার প্রমাণ নিকট ইতিহাসেই রয়েছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ‘শান্তিচুক্তি’ নামে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি সরকার পরিবর্তনের পর দীর্ঘকাল যে একটি কাগুজে দলিলে পর্যবসিত হয়েছিল তা আমরা সকলেই দেখেছি। তাই জাতিকে অন্ধকারে রেখে, জনগণের মতামত যাচাই না করে দু’দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে চুক্তি বা সমঝোতা করে অবিশ্বাস আরো ঘণীভূত করা হয়েছে বলেই আমরা মনে করি। 

ভাটির দেশ হিসেবে সকল আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের অধিকার উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, এটা কারো কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য বা করুণার বিষয় নয়। তিস্তার পানি বন্টনের বিষয়টি দুই সার্বভৌম দেশের মধ্যকার বিষয়। এ জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকেই বিষয়টি ফয়সালা করতে হবে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে দুই দেশের মধ্যেকার আলোচনায় সংশ্লিষ্ট করায় বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে। প্রতিরক্ষা খাতে দেয়া ৫০ কোটি ডলারের সহায়তার আওতায় ভারত কোন্ ধরনের সমরাস্ত্র সরবরাহ করবে জানতে চাওয়া হলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন যে, এখনও এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি, তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পছন্দকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, শেখ হাসিনা যাই বলুন না কেন একমাত্র ভারতই হবে ওই ঋণের আওতায় একমাত্র অস্ত্র সরবরাহকারী। এই সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যেভাবে ভারতের সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে তার ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস, কারিকুলাম ও অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়াদি অযাচিত হস্তক্ষেপের মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করার জন্য যে শুল্ক ও অশুল্ক বাধাগুলো দূর করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়নি।

খালেদা জিয়া বলেন, পাট রফতানির ক্ষেত্রে ভারত যে এন্টি-ডাম্পিং ক্লজ প্রয়োগ করে থাকে তা তুলে নেয়ার ব্যাপারেও এই সফরে প্রধানমন্ত্রী কিছুই করতে পারেননি। সফর শেষে প্রকাশিত দু’দেশের যৌথ ইশতেহারে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার কথা বলা হলেও এই প্রতিশ্রুতি অতীতের মতোই অন্ত:সারশূন্য হয়ে থাকবে বলে দেশবাসীর মতো আমাদেরও আশঙ্কা। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের ব্যাপারে ভারতের সম্মতি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনা এখন এই প্রকল্পের উপযোগিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। এখন আরো পিছিয়ে গিয়ে প্রকল্পটির স্থান পরিবর্তন এবং নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভারতীয় প্রস্তাব তিনি মেনে নিয়েছেন। 

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, দেশে জনসমর্থিত ও গণতান্ত্রিক কোনো সরকার না থাকলে তাদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের কাছ থেকে জাতীয় স্বার্থ আদায় করে আনা সম্ভব নয়। সে কারণেই বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ সরকার যতই বন্ধুত্বের বুলি আওড়াক না কেন, প্রতিবেশী ভারতের কাছ থেকেও সমমর্যাদার ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে তারা পারেনি, পারবেও না। তাই সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি দিল্লীতে কিছু চাইতে যাননি। কেবল বন্ধুত্বের জন্য গিয়েছিলেন এবং সেটা তিনি পেয়েছেন। কিসের এই বায়বীয় বন্ধুত্ব তা দেশবাসীই বিচার করে দেখবেন। তবে এই কথার মাধ্যমে শেখ হাসিনা প্রকারান্তরে মেনে নিয়েছেন যে, ভারত থেকে তিনি দেশের জন্য কিছুই নিয়ে আসতে পারেননি। বরং ভারতের চাহিদা মোতাবেক সবকিছুই দিয়ে এসেছেন।

খালেদা জিয়া বলেন, চুক্তি ও সমঝোতাগুলো প্রকাশ করার বদলে তিনি তার নিজের উপর আস্থা রাখতে বলেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তার ওপর আস্থা রেখে দেশবাসী আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই অর্জন করতে পারেনি। বরং ভোট দেয়ার অধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার হারিয়েছে। অতীতে জনগণ দেখেছে তিনি একের পর এক জাতীয় স্বার্থবিরোধী অসংখ্য চুক্তি করেছেন। ভারতকে একতরফাভাবে কেবল দিয়েই এসেছেন। বিনিময়ে কিছুই আনতে পারেননি। এবারেও নিরাপত্তা সহযোগিতা, অস্ত্র ক্রয়, লাইন অব ক্রেডিট ঋণ, পারমাণবিক প্রকল্পে সহযোগিতা, ডিজেল ও বিদ্যুৎ আমদানি, কানেকটিভিটি বৃদ্ধি, মহাকাশ সহযোগিতা ও সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি যেসব চুক্তি ও সমঝোতায় সই করেছেন তাতে বাংলাদেশের ওপর ভারতের সামরিক, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যই কেবল বাড়বে। 

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নে শহীদ জিয়াউর রহমান এবং আমাদের সরকার কী কী করেছে তা দেশবাসী জানেন। শহীদ জিয়াই অবজ্ঞা ও অবহেলার ইতিহাস মুছে দিয়ে সশস্ত্রবাহিনীকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন এবং এর মর্যাদা ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনিই সশস্ত্রবাহিনীকে আধুনিক করে গড়ে তুলেছিলেন। মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে এই সত্যকে কখনো ম্লান করা যাবে না। পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশের সম্পৃক্ততার ফলে বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জিত মান ও স্বাতন্ত্র্য সমঝোতার নামে ব্যাহত হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। 

খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনা ভারত সফরের আগে আলেম সম্মেলন করেন। ফিরে এসে আবার হেফাজতে ইসলাম প্রভাবিত কওমী মাদরাসার ওলামায়ে কেরামদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলেমদের সঙ্গে তার অতীত আচরণ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ক্রমাগত আঘাতের কথা দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি। এখন তিনি নিজেই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন। অতীতেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার লক্ষ্যে দেশে ইসলামী শরিয়তী আইন চালুর জন্য একই ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এখন কওমী মাদরাসা সনদকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলে ধোঁকা দিচ্ছেন। আমাদের সরকার দায়িত্বে থাকার সময় মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন করা হয়েছিলো। ২০০৬ সালে কওমী মাদরাসা সনদের স্বীকৃতি আমাদের সরকার দিয়েছিল। সেটা গেজেট নোটিফিকেশনও হয়েছিল। পরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা কার্যকর হয়। গত ১১ বছরে মাদরাসা-বিরোধী সরকারগুলোর নেতিবাচক মনোভাবের কারণে বিষয়টি আর এগুতে পারেনি। শেখ হাসিনার অভিযোগের জবাবে আমি বলতে চাই, সশস্ত্রবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিএনপি কখনো ব্যবহার করেনি। তারাই করেছেন। তারা সশস্ত্র বাহিনী সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে একমাত্র রাজনৈতিক দল বাকশাল-এর অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। জেনারেল এরশাদ ও মঈনের ক্ষমতা দখল এবং জেনারেল নাসিমের সামরিক অভ্যূত্থান প্রচেষ্টায় তারাই প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিলেন। কাজেই নিজেদের অপরাধ অন্যের কাঁধে চাপিয়ে তারা পার পাবেন না। 

খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফরকালে শেখ হাসিনাকে কে স্বাগত জানালো, কোথায় রাখা হলো, কেমন সংবর্ধনা দেয়া হলো, তার এবং তার পিতার কী কী প্রশংসা করা হলো তাতেই বাংলাদেশের জনগণ খুশি নয়। বাংলাদেশের মানুষ আপ্যায়নের চাইতে তাদের ন্যায্য পাওনা কী এসেছে সেটা জানতে চায়। দু’দেশের যৌথ ইশতেহারে যে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশে এখন সেই গণতন্ত্র নেই। জনগণের কোনো অধিকার নেই। আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার নেই। জনগণ তাদের অধিকার ও গণতন্ত্র ফিরে পাবার জন্য সংগ্রাম করছে। গণতান্ত্রিক ভারতের অবস্থান সেই গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকবে সেটাই সকলের প্রত্যাশা। তাহলেই দু’দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরো দৃঢ় ও ফলপ্রসূ হবে। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার দল ক্ষমতায় গেলে দেশের স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি ও সমঝোতা পুনর্বিবেচনা করবে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে শেখ হাসিনা বিএনপি আমলে চীনের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তির বিষয়টি তুলে বলেছেন, তিনি দেশের স্বার্থ ক্ষুণœ করে কোনো চুক্তি করেননি।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ব্যর্থ হয়েছে- এর ব্যাখা জানতে চাইলে খালেদা বলেন, জনগণ ব্যর্থ মনে করে। আমরা জনগণের সঙ্গে আছি। জনগণ যা মনে করে আমরাও তাই মনে করি।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশের রামপাল নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। এ বিষয়ে বিএনপি কোনও কমর্সূচি দেবে কি না- জানতে চাইলে জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা আগেও অনেক কর্সসূচি দিয়েছি, আরও দেবো। কারণ রামপাল হলে ভারতও ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

আগামী নির্বাচনে ভারতের প্রভাবের আশঙ্কা করছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, আমরা সব সময় বলেছি, বিএনপি সব সময় জনগণের রায়ে ক্ষমতায় এসেছে। আমরা গণতান্ত্রিক দল। নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা বার বার ক্ষমতায় এসেছি। আমরা চাই কোনও দেশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেন হস্তক্ষেপ না করুক।

সুপ্রিম কোর্টে গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপন প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, আমাদের কাছে কেউ এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আসেননি। আমরা জানিও না কে কি বলেছে। আর যেহেতু এটা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ। তাই এ বিষয়ে কী করবেন, না করবেন সেটা প্রধান বিচারপতি বিচার করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ