ঢাকা, শুক্রবার 14 April 2017, ১ বৈশাখ ১৪২৩, ১৬ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মেঘবিহীন খর বৈশাখে

শফি চাকলাদার : বৈশাখ নিয়ে নজরুল অসংখ্য কাজ করেছেন। সঙ্গীতে। প্রবন্ধ-গল্প-উপন্যাসে। কেবল সঙ্গীত নিয়েই ভাবিতে থাকলে অন্য সকল হারিয়ে যেতে বসে। আলোচনাহীন হয়ে থাকলে সাহিত্য-মরিচা ধরে। বৈশাখ নিয়ে নজরুল সঙ্গীতে অসাধারণ বেশ ক’টি গান বাংলা সঙ্গীত ভা-ারে যুক্ত করেছেন। বিশেষ করে ‘মেঘবিহীন খর- বৈশাখে’ গানটি- এমন গান রচেছেন বলেই মনে হয় বৈশাখ বেশি করে মনে পড়ে। চির অম্লান এই গানটি কণ্ঠে ধারণ করে পরিবেশন না করলে মনে হবে ‘সুর’ কি যেন হারায়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই গানটি ‘মর্যাদা’য় বসবাস করবে অনন্তকাল। তেমনি কবিতা প্রবন্ধ-গল্প-উপন্যাসেও নজরুল এই বৈশাখকে নিয়ে সংলাপ সাজিয়েছেন। উপমা করেছেন। যার ফলে কবিতা-গল্প-উপন্যাস হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়। তাই বৈশাখ এলে যখন খর-তাপে মানুষ-প্রকৃতি উদভ্রান্ত হয়ে ওঠে অসহ্য নিদাঘে তখন নজরুল-কলমের বৈশাখ-লেখাগুলো আনন্দ দেবে। ঐ যে প্রচলিত ঝড় ‘কাল-বোশেখী’ যখন হয় মাত্র কটা মিনিটের মধ্যে সব ল-ভ- করে একাকার করে দিয়ে যায়। হঠাৎ নীলাকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। বিদ্যুৎ-বজ্রে-গুমোট প্রকৃতি যখন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, মানুষ সন্ত্রস্ত হয়ে ঝড়ের অপেক্ষা করে তখন নজরুল উপমা খুঁজে বেড়ায়- ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়’-এর মধ্যে। বৈশাখ-এর আকাশে ফালগুনী বাতাসের আলাদা রূপ প্রত্যক্ষ করে জন-মানব। কখনো নীল আকাশ। কখনো পুঞ্জীভূত মেঘ-তূলোর মত সাদা-কখনো কালো। নিদাঘের প্রচ- দাবদাহ। ঝড়ের পর পৃথিবী নীরব। শান্ত প্রকৃতি। কোলাহল আবার শুরু হয়। এইতো বৈশাখ। এই বৈশাখ নিয়ে নজরুলের গান-বাঁধা নিয়ে লিখেছি। এখানে গদ্য কবিতাতে নজরুলের বৈশাখী অবদান লক্ষ্য করি। কবিতায় নজরুলের বৈশাখী অবদান। 

ক্স আমি ঘূর্ণটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর  - বিদ্রোহী

ক্স এলোকেশে তব দুলুক ঝঞ্ঝা/কালবৈশাখী ভীম তুফান- রক্তাম্বরধারিনী মা

ক্স কালবৈশাখী ঝঞ্ঝার সঙ্গে করি/রণ-উন্মাদিনী নাচে রঙে মরি-জাগৃহি

ক্স যাস কোথা সই একলা ও তুই অলস বৈশাখে? - 

জল নিতে যে যাবি ওলো কলস কই কাঁখে?     দুপুর অভিসার

 

ক্স ‘আয় অতিথ, আয়রে আয়-’/বৈশাখী ঝড় সুর হাঁকায়- প্রবর্তকের ঘুর-চাকায়

ক্স ওড়ে তার ধূলি রাঙা গৈরিক পতাকা

    বৈশাখের বাম করে। ক্ষত-চিহ্ন আঁকা ---    দ্বারে বাজে ঝন্ঝার জিঞ্জীর

ক্স ‘কাল-বৈশাখী’ কবিতাটি সম্পূর্ণই বৈশাখ’-এর উপর নিবেদিত। ২৪ লাইনের কবিতাটি থেকে শুধু ‘বৈশাখ’ যে লাইনগুলোতে রয়েছে তা-ই তুলে ধরছি---

-বারে বারে যথা কাল-বৈশাখী ব্যর্থ হলো রে পুব-হাওয়ায়,

-বৈশাখী’ কাল-বৈশাখী’

-হেথা বৈশাখী জ্বালা আছে শুধু, নাই বৈশাখী ঝড় হেথায়।

-কাল বৈশাখী আসিলে হেথায় ভাঙিয়া পড়িত কোন সকাল

-এলে হেথা কাল- বৈশাখী

কাল-বৈশাখী আসেনি হেথায়, আসিলে মোদের তরু-শিরে

-এরি মাঝে হায়, কাল-বৈশাখী স্বপ্ন দেখিনি কে তোরা বল্্!

* তরু ভেঙে পড়ে তাই বলে ঝড় আসিবে না বৈশাখী! - দুর্বার যৌবন

* ঘন গৈরিকে আকাশ রাঙায়ে বৈশাখী ঝড় আসে, - ভয় করিওনা, হে মানবাত্মা

* দূরে ওই ওড়ে যেন বৈশাখী ঝড়ের বিজয়-কেতন তার। -বাসন্তিকা (৪র্থ দৃশ্য)

* বৈশাখী ঝড় আসে নাকো ভৈরব প্রলয়োল্লাসে।

 দেশেতে কাহার বক্ষে উঠেছে কাল-বৈশাখী ঝড়?  -অগ্রনায়ক

ক্স আমি জানি এই ফাগুন ফুরাবে, খর-বৈশাখ এসে

কি যেন দারুণ আগুন জ্বালাবে তোমাদের এই দেশে। -আত্মগত

 

ক্স বিণু!

 তোমায় আমায় ফুল পাতিয়েছিনু

মনে কি তা পড়ে?

যেদিন সাঁঝে নতুন দেখা বোশেখ মাসের ঝড়ে

আমবাগানের একটি গাছের তলায়                         

দুইটি প্রাণই দুলেছিল হিন্দোলেরই দোলায়।    --- চিঠি

মোট তেরোটি কবিতায় নজরুল ‘বৈশাখ’ নামটি ব্যবহার করেছেন। কখনো খর- বৈশাখ, বৈশাখ-ঝড়, কখনো বৈশাখী ঝড়ের বিজয় কেতন, কখনো কাল-বৈশাখী ভীম তুফান, কখনো বৈশাখী ঝঞ্ঝা ইত্যাদি। কবিতার চরিত্র নানান হলেও বৈশাখকে যখনই উচ্চারণ করেছেন তখনই নজরুলের ঝড়ের কথা মনে হয়েছে। আবার বৈশাখের পতাকা প্রকৃতির ধূলো রাঙা বেশে দেখেছেন। একটি কবিতাই রচেছেন বৈশাখকে উদ্দেশ্য করে। এখানেও কবি মূল করেছেন ‘কাল- বৈশাখকেই নানান শব্দ মাধ্যমে কবিতার চরিত্র সাজিয়ে দেন চারটি স্তবকের চব্বিশটি লাইনে। তবে ‘দুপুর অভিসার’ কবিতায় নজরুল বৈশাখকে অন্যরূপে দেখেছেন। অলস বৈশাখ বলেছেন। বৈশাখের পৃথক একটি চরিত্র পাওয়া যায়। দুপুরের রৌদ্রভেজা শান্ত উষ্ণ বৈশাখী পরিবেশের চিত্র ফুঠে ওঠে ‘জল নিতে যে যাবিগুলো কলস কই কাঁখে?’র মাধ্যমে। ‘দুর্বার যৌবন’-এ কবি বৈশাখ হাজির করেছেন আলাদা কল্পনায়। যেটা আসার সেটা আসবেই। যেটা হবার সেটা হবেই। যেটা অনিবার্য তাকে রুখবে কে? এবং এটাই তো বাস্তব। কারো জন্য কেউ বসে থাকে না। বৈশাখী আসবেই বৈশাখ এলে। গাছ ভাঙবে, ঘর পড়বে, তাই বলে বৈশাখী আসবে না. এখানে ক্ষতিটা বড় করে দেখা নয় এখানে বৈশাখীর চরিত্র বৈশাখীর কাজ কি সেটাই কবি বলতে চেয়েছেন।

গদ্যেও কবি বৈশাখ নিয়ে কথা সাজিয়েছেন। এই গদ্য বলতে প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, চিঠিপত্র, নাটক ইত্যাদিকে আমি যুক্ত করেছি। এখানেও বৈশাখের নানান রূপ পাওয়া যায়-

ক্স দু’চোখ হাত দিয়ে টিপে কাল-বৈশাখীর উড়ো ঝনঝার মতো উন্মাদ বেগে সে ছুটে গেল। আমি টাল খেয়ে মাথা ঘুরে পড়তে পড়তে শুনতে পেলাম আর্ত-গভীর আর্তনাদের সঙ্গে বিয়ে বাড়ির ছালনা-বাঁধা আঙিনায় কে দড়াম করে আছড়ে পড়ে গোঙিয়ে উঠল, ‘মা-গো? =অতৃপ্ত কামনা

কিন্তু এ আমি বলবই যে, এটা তোদের অনেকটা একগুঁয়েমি, তোদের মনের অতৃপ্ত কামনা একটা তরুণ বুকের ¯েœহ-ভালোবাসা পাবার আশায়, দুটি টানা চোখ মদিরাভরা শিথিল চাউনির আবশের ক্ষুধায়, একটি কম্পিত পাতলা ঠোঁটের উষ্ণ পরশের তৃষ্ণায় হা হা করে ছাতি ফেটে মরছে-বোশেখ মধ্যাহ্নের আতপ-তৃপ্ত ভুখারি ভিক্ষুকের মতো।=বাঁধন হারা (ঙ)

ক্স নারী, বিশ্বের সবকিছু কোমলতা আর মাধুর্য সুষমা দিয়ে গড়া নারী, হাজার কষ্টেও তার বুকে কান্না জাগে না, বেদনাও আঘাত দিতে পারে না। এর যাতনা আর ছটফটানি বুঝিয়ে বলবার নয় রে, বোন, এ কষ্টে যার হৃদয় কখনো এমনি শুকিয়ে ঠনঠনে পাথর হয়ে গিয়েছে সেই বুঝবে।

বৈশাখের কান্না দেখেছিস? তার ঐ হু-হু-হু-হু রোদ্দুরে, ধু-ধু-ধু-ধু গোবি সাহারায় ধুলোবালি, শন-শন-শন-শন, শুকনো ঝড়-ঝঞ্ঝা, পাহাড়-কাটা শুষ্কতার বিপুল চড়চড়ানি, দীর্ণ।

বিদীর্ণ রুক্ষ খোঁচা-খোঁচা উলঙ্গ মূর্তির রুদ্র বীভৎসতা আর খাঁ খাঁ নগ্নতার হাহাকার ব্রুন্দন শুনেছিস? তার ঐ কঠোর কাঠচোটা অট্টহাসির খনখনে কাংস্য আওয়াজের মাঝে সারা বিশ্বের বিধবার অশ্রুহারা সকরুণ কান্নার নীরব ধ্বনি শুনেছিস? এ বিষাক্ত তিক্ত কাঁদন বুঝিয়ে বলবার নয় রে, বোন, এর লক্ষ ভাগের এক ভাগও বাইরে প্রকাশ করে দেখানোর ক্ষমতা আমার নেই! – বাঁধন হারা বিতনস্ট্রিট, কলিকাতা প্রথম বৈশাখ (সকাল)

ক্স সাহসিকাদি! বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে গেল। ঝড়ঝঞ্ঝা যত বইবার, বয়ে গেল আমার জীবনের ওপর দিয়ে। কিন্তু আজো বৃষ্টি থামেনি। আজ পয়লা আষাঢ়। আমার জীবনের এ আষাঢ় বুঝি আর ফুরোবে না। আশীর্বাদ করো দিদি, সত্যিই এ আষাঢ়ের যেন আর শেষ না হয়--শেঙান-বাঁধন হারা

ক্স বাঁশি বাজছে, আর এক বুক কান্না আমার গুমরে উঠছে। আমাদের ছাড়াছাড়ি হলো তখন, যখন বৈশাখের গুমোটভরা উদাস-মদির সন্ধ্যায় বেদনাতুর পলু-বারোয়া রাগিনীর ক্লান্ত কান্না হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বেরুচ্ছিল। --মেহের-নেগার, ঝিলম-ক

 

ক্স * নিদাঘ মধ্যাহ্নের তাপ-দগ্ধ রুদ্র-বৈশাখী ঝড়ে ঝড়ে দিতায়-ভস্মীভূত তোমাদের বিষ স্ফূলিঙ্গ উড়ে বেড়াবে দিগন্তের কোলে কোলেÑ গৃহীর প্রাঙ্গণে প্রাঙ্গণে, বলদর্পীর মহলে মহলে। বিষয় বাণী

ক্স * কাল-বৈশাখীর মেঘ এমনি করিয়াই দেখা দেয়। যেখানে দুঃখের বরষা, বজ্রপাতও হয় সেই খানেই শান্ত নদীতীরে তারও চেয়ে শান্ত ভগ্ন-কুটির এমনি করিয়াই কোন এক দুর্যোগের নিশীতে ভাসিয়া যায়। কুহেলিকা- নয়।

ক্স * (সহসা আকাশ অন্ধকার করিয়া কাল বৈশাখীর মেঘ দেখা দিল। ধুলায় শুখনো পাতায় প্রমোদ উদ্যান ছাইয়া ফেলিল। মেঘের ঘন গর্জনে দিগন্ত কাঁপিয়া উঠিল) আলেয়া ১ম অঙ্ক

ক্স মীনকেতু: (হাসিয়া) ভয় নেই, রঙ্গনাথ। ঐ ঝড়ই আমার না-আসা বন্ধুর পদধ্বনি। শুনছ নাÑ বজ্রে বজ্রে তার জয়ধ্বনি, কালবৈশাখীর মেঘে তার বিজয় পতাকা? চলো প্রাসাদের অলিন্দে বসে আজ মেঘ-বাদলেরই নৃত্যোৎসব দেখি গিয়ে। Ñ আলেয়া ১ম খ-।

ক্স * এ যেন কালবোশেখীর মেঘের মতো, যত ভয় করে, তত দেখতেও ইচ্ছে করে। - জিনের বাদশা

ক্স * আজ দেখতে পাচ্ছি ভারতের রাষ্ট্রে, সমাজে, ধর্মে প্রায় ষোলো আনা ঘুণ ধরে গেছে। আজ প্রলয়ের দেবতা ধ্বংসের নেশায় যতই মত্ত হন ততই মঙ্গল। আজ রুষে আসুক কালবৈশাখীর উন্মাদ ঝঞ্চা র-পাথারের অবারিত ¯্রােতে অযুত ফনা বিস্তার করে, আজ সব অগ্নিবাণ নাগ-নাগিনী বিপুল উল্লাসে বিচরণ করুক। -আজ চাই কি

ক্স * সহসা এল ঊর্ধ্ব-গগনে বৈশাখী ঝড়, প্রগাঢ় নীলকৃত্ত মেঘমালাকে জড়িয়ে। ঘন ঘন গম্ভীর ডমরু ধ্বনিতে, বহ্নিবর্ণা দামিনী-নাগিনীর ত্বরিত চঞ্চল সম্ভারণ আমার বাহিরে- অন্তরে যেন অপরূপ আনন্দ তরঙ্গায়িত হয়ে উঠল। সহসা আমার কণ্ঠে গান হয়ে, সুর হয়ে আবির্ভূত হলোÑ ‘এল রে প্রলয়ঙ্কর সুন্দর বৈশাখী ঝড় মেঘমালা জড়ায়ে।’ আমি সজল ব্যাকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলাম, ‘তুমি কে-কে?’ মধুর সহজ কণ্ঠে উত্তর এল, ‘তোমার প্রলয়-সুন্দর বন্ধু।’ Ñ আমার সুন্দর

ক্স * আমাদের লক্ষ্য হইবে এক, কিন্তু পথ হইবে বহুমুখী। যে দুর্ধর্ষ, সে কালবৈশাখীর কেতন উড়াইয়া অসম্ভবের অভিযানে যাত্রা করুক; যে বীর তাহার জন্য রহিয়াছে ংগ্রাম ক্ষেত্র, যে কর্মী তাহার জন্য পড়িয়া রহিয়াছে কর্মের বিপুল উপত্যকা; কিন্তু যে ধ্যানী, যে সুন্দরের প্রজারী, সে কল্পপাখায় ভর করিয়া উড়িয়া যাক স্বপ্নলোকে, উদার নিঃসীম নীল নভে। - তরুণের ষাধনা (সঙ্গীত শিল্প)

ক্স * এমনই নয়। ফালগুনের সময়-সমীর বৈশাখে দেখা দেয় কাল-বৈশাখী-রূপে, শাবণে সে-ই আসে পুবের হাওয়া হয়ে। হৈমন্তীর আঁচল ভরে উঠে তারি শিশিরাশ্রুতে, আঁচল দুলে ওঠে তারই হিমেল হাওয়ায়। পউষে তারি ধীর্ঘশ্বাস পাতা ঝরায়। Ñ মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা।

ক্স * ব্রজেন: কেলো, এটাতো কার্তিক মাস চলতে, সামনের বৈশাখে আসতে বল। - সুদখোর ব্রজেন মুখার্জী

ক্স * ‘রহস্যময়ী’ চৈত্রের সওগাতে যাবে না, বোধহয় বৈশাখে যাবে। Ñ ১৯২৮ এর কোন সময় মোতিহারকে লেখা পত্র।

ক্স * ‘মাধবী প্রলাপ পাঠালুম। বৈশাখেরই দিও। Ñ শৈলজাকে লেখা পত্র।

ক্স গদ্য-প্রবন্ধ-উপন্যাস-নাটকেও নজরুলের বৈশাখ-ভাবনা লক্ষ্যণীয় পর্যায়ে উপস্থিত। বৈশাখকে নজরুল প্রায় ক্ষেত্রেই কাল-বৈশাখী, তাপ দগ্ধ রুদ্র বৈশাখ, বৈশাখী ঝড় হিসেবেই দেখেছেন। বৈশাখের একটা রুদ্র-ভয়ঙ্কর রূপ নজরুল-রচনায় ফুটে উঠেছে। বৈশাখ তো অনেকটাই এমন। ‘বোশেখ মধ্যাহ্নের আতপ-তপ্ত’ বলেছেন। ভয়ঙ্কর রূপ বর্ণনায় নজরুল দৃশ্য আঁকেন ‘কাল বোশেখীর উড়ো ঝনঝার মতো উন্মাদ বেগে’ রূপে। প্রায় ষেঅলটি স্থানে নজরুলের ‘বৈশাখ’ ভাবনা লক্ষ্য করি।

ক্স সঙ্গীতেও নজরুলের বৈশাখ-ভাবনা উল্লেখের দাবি রাখে। এখানেও বৈশাখ বর্ণনা সঙ্গীতকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপনা করেছেন নজরুল। নানান ধরনের সুর সংযোজনা বাংলা সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা সঙ্গীত ভা-ারে যে কটি ধরন রয়েছে তার প্রতিটি বিভাগের সর্বশ্রেষ্ঠ গানটি নজরুলের। এই বৈশাখের গানেও ‘মেঘ বিহীন খর বৈশাখে’ তার প্রমাণ। এখানে বৈশাখ নিয়ে গানগুলোর প্রথম লাইনগুলো উল্লেখ করছি)

ক্স ১। অগ্নি-ঋষি। অগ্নি-বীণা তোমায় শুধু সাজেÑ (দুর্বামা হে! রুদ্র তড়িৎ হানছিলে বৈশাখে)।

ক্স ২। তোরা সব জয়ধ্বনি কর। ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়।

ক্স ৩। এসএসএস ওগো মরণ (মুক্তিদাতা মরণ। এসো কাল-বোশেখীর বেশে)।

ক্স ৪। কারার ঐ লৌহ কবাট (নাচে ঐ কালবোশেখী)।

ক্স ৫। আমারে চোখ ইশারায় (পাঠালে ঘূর্ণি-দূতী ঝড় কপোতী বৈশাখে সখি)।

ক্স ৬। নম: নম: নমো বাংলাদেশ মম (গ্রীষ্মে নাচে বামা কাল- বোশখী ঝড়ে)।

ক্স ৭। এ কুঞ্জে পথ ভুলি কোন (নাহি আর চৈতী হাওয়া, বহে আহি বৈশাখী তুফান)।

ক্স ৮। হায় ঝরে যায় মোর আশা-কুসুম বারে বারে (বহিল বৈশাখী ঝড়,ঝরিয়া গেল বনফুল)।

ক্স ৯। একি অপরূপ রূপে মা তোমায় (রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে)।

ক্স ১০। এলএল রে বৈশাখী ঝড় (ঐ বৈশাখী ঝড় এল এল মহীয়ান সুন্দর)।

ক্স ১১। তুমি ভোরের শিশির রাতের (তুমি কোটার আগের ঝরা মুকুল বৈশাখী হাওয়াতে)।

ক্স ১২। ওগো বৈশাখী ঝড় লয়ে যাও/ অবেলায় ঝরা এ মুকুল।

ক্স ১৩। তোমারি আঁখির মত আকাশের দুটি তারা  বৈশাখী ঝড়ে রাতে চমকিয়া উঠি জেগে)।

ক্স ১৪। হংস-মিথুন ওগো যাও কয়ে যাও (বৈশাখী তৃষ্ণার জল কোথা পাও)।

ক্স ১৫। হে মায়াবী বলে যাও (বৈশাখী তৃষ্ণার জল কোথা পাও)।

ক্স ১৫। হে মায়াবী বলে যাও (কেন ফালগুন এনে আনো বৈশাখী ঝড়)।

ক্স ১৬। ধূলি-পিঙ্গল জটাজুট মেলে- বৈশাখী পূর্ণিমা চাঁদের তিলক তোমারে পরাব)।

ক্স ১৭। ফাগুন ফুরাবে যবেÑ সুখ-শশী অস্ত যাবে/ আসিবে জীবনে তব বৈশাখী ঝড়)।

ক্স ১৮। কেমনে রাধার কাঁদিয়া বরষ যায় (খবর বৈশাখে কি দহন থাকে/ বিরহিনী একা জানে)।

ক্স ১৯। বৈকালী সুরে গাও চৈতালীগান (ধূলিধূসর হলো দিক? আসে বৈশাখ অভিয়ান)।

ক্স ২০। যৌবনে যোগিনী সাজিয়া লোসজনি (হেরেছি বৈশাখে তার মোহন-চ’ড়া কৃষ্ণচূড়ায়)।

ক্স ২১। আমার বিছানা আসে বালিকা আছে বৌনাই মোর গাটে (বৈশাখ মাস, বৈশাখে প্রাণ ভরসা)।

ক্স ২২। মেঘলা-মতীর ধারা-জলে করো ¯œান (হে ধরনী)। (তব বৈশাখী ব্রত শেষে, ম্যাম সুন্দর বেশে)।

ক্স ২৩। ছন্ন-ছাড়া বেদের দল আয়রে আয় (কাল-বোশেখীর ঝড়-তুফান আনরে তোর দৃপ্ত পায়)।

ক্স ২৪। দূর বনান্তের পথ ভুলি’ কোন বুলবুলি (হায় পুড়িয়া বৈশাখে এলি ভিজিতে/ অশ্রুর এ বরষায়)।

ক্স ২৫। ও-মা, বোশেখ মাস, তা গায়ে চাদর কেন গো? সংলাপযুক্ত গান

ক্স ২৬। ও জেলো তুই গেলি সাগরে (ও জেলো তুই বোশেখ মাসে গেলিরে/ জলদড়া খারুই লয়ে রে)।

ক্স ২৭। ঝরে যায় বিরহের প্রখর বৈশাখে (মেল-মেলন-গীতি সংলাপ)।

ক্স ২৮। মেঘ-বিহীন খর বৈশাখে। 

ক্স এ নিবন্ধতে চেষ্টা করেছি বৈশাখ’ নিয়ে নজরুলের নানান বিষয়ে অবদান। সামান্য একটু কথায় বলতে চাই গানগুলোর মধ্যে বেশ কিছু গান রয়েছে তা শুধু বৈশাখেই নয় সকল ঋতুতেই পরিবেশন করা যাবে। গানগুলোতে চোখ বুলালেই বুঝে নেয়া সহজ হবে। তবে বৈশাখের উপর শ্রেষ্ঠতম গানটিই নজরুলের। ‘সেই ‘মেঘ-বিহীন খর বৈশাখে’ গানটি তাই উদ্ধৃত করছিÑ বৈশাখ নিয়ে গাঁথা সর্বশ্রেষ্ঠ বর্ণন, সুর শ্রুতিতে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয় এবং করে রাখবে অনন্তকালÑ

ক্স মেঘ-বিহীন খর-বৈশাখে

ক্স তৃষায় কাতর চাঁতকী ডাকে ॥

ক্স সমাধি-মগ্না উমা তপতীÑ

ক্স রৌদ্র যেন তার ত্যেজ জ্যোতি,

ক্স ছায়া মাঘে ভীতা ক্লান্তা কপোতীÑ

ক্স কপোত-পাখায় শুস্ক শাখে ॥

ক্স শীর্ণা তটিনী বালুচর জড়ায়ে

ক্স তীর্থে চলে যেন শ্রান্ত পায়ে।

ক্স দগ্ধা-ধরনী যুক্ত-পানি

ক্স চাহে আষাঢ়ের আশীষ বাণী

ক্স যাপিয়া নির্জলা একাদর্শীর তিথি

ক্স পিপাসিত আকাশ যাচে কাহাকে ॥

ক্স ত্রিতালে নিবন্ধ এ গানটির সুর বাণী ‘বৈশাখ’ কে যে আকুল আবেদনে প্রকাশ করেছে তা বাংলা সঙ্গীত ভা-ারকে করে তুলেছে সমৃদ্ধ। শিল্পী ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র’র অসাধারণ পরিবেশন গানটিকে অমর করে রেখেছে। এত মাধুর্য গানটির সুর যে তান- আলাপও শ্রুতিতে মুগ্ধ করে দেয়। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ