ঢাকা, শুক্রবার 14 April 2017, ১ বৈশাখ ১৪২৩, ১৬ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খোশ আমদেদ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ 

বছর ঘুরে অবারও এসেছে পহেলা বৈশাখ। আজ ১৪২৪ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখকে বরণ করা হয় সর্বজনীন উৎসবের মধ্য দিয়ে। এ বছরও উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে থেকে। পান্তা-ইলিশ খাওয়া থেকে বৈশাখী মেলায় ঘুরে বেড়ানো পর্যন্ত সবকিছুর জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছে এক শ্রেণীর মানুষ। বিশেষ করে শহুরে অবস্থাপন্নদের জন্য এবারের পহেলা বৈশাখও আনন্দের একটি দিনে পরিণত হতে চলেছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে অবশ্য এই আনন্দ উপভোগ করার সম্ভাবনা নেই। 

প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গাব্দ তথা বাংলা বর্ষের ইতিহাস স্মরণ করা দরকার। বাংলা এই সালের সূচনা করেছিলেন মুসলিম মুঘল সম্রাট আকবর। উদ্দেশ্য ছিল  ফসলের ঋতুর ভিত্তিতে খাজনা আদায় করা। এর ফলে খাজনা দেয়ার সময় অর্থাৎ কখন খাজনা দিতে হবে তা মনে রাখা কৃষকের পক্ষে সহজ হতো। সরকারও বছরের বিশেষ সময়ে সহজে খাজনা আদায় করতে পারতো। নববর্ষের উৎসবও শুরু হয়েছিল তখন থেকেই। 

ঐতিহাসিক এ তথ্যের আলোকে বলা যায়, নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ সম্পূর্ণরূপেই কৃষিভিত্তিক একটি দিন। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল সেটাও ছিল কৃষিভিত্তিক। এদেশের মানুষের জীবনেও এর রয়েছে নানামুখী প্রভাব। দিনটিকে শুভ মনে করা হয় বলে অনেক কৃষক পহেলা বৈশাখে জমিতে হাল দেয়, ফসলের বীজ বোনে, রোপণ করে শস্যের চারা। দোকানদার, মহাজন ও ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের সূচনা করে। গ্রাম থেকে শহর-নগর-বন্দর পর্যন্ত সর্বত্র আয়োজিত হয় বৈশাখী মেলা। এসব মেলায় হরেক রকমের পণ্য নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসে কামার-কুমার ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা। মেলায় থাকে মাটির খেলনা, আম কাটার চাকু এবং দই ও মুড়ি-মুড়কির মতো উপাদেয় নানা খাবার। মেলা পরিণত হয় মানুষের মিলন মেলায়। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে রাজধানী ও বড় বড় কিছু শহরের বৈশাখী মেলা ও অনুষ্ঠানমালা অবশ্য নববর্ষের মূল চেতনা ও অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে গেছে। বলা চলে, সুচিন্তিতভাবেই সরিয়ে নেয়া হয়েছে। যেমন রাজধানীতে নববর্ষের উৎসব শুরু হয় রমনার বটমূলে। সেখানে পান্তা-ইলিশ ভোজনের মধ্য দিয়ে ‘বাঙালিয়ানা’ দেখানোর বিলাসিতা করেন এক শ্রেণীর মানুষ। এদের নোংরা রকমের ধনী বা ফিলদি রিচ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তারা পহেলা বৈশাখকে বেছে নিয়েছেন টাকা দেখানোর এবং বিলাসিতা করার উপলক্ষ হিসেবে। অথচ পান্তা-ইলিশ খাওয়া কখনো গ্রাম বাংলার তথা বাংলাদেশের ঐতিহ্য ছিল না। এটা চালু করেছেন ফিলদি রিচেরা। বিষয়টিকে বাংলা নববর্ষের মূল চেতনার সঙ্গেও মেলানোর উপায় নেই। কারণ, গ্রাম বাংলার কোনো অঞ্চলেই বছরের এ সময়ে ইলিশ পাওয়া যায় না। এটা ইলিশের মওসুমও নয়। সরকার বরং জাটকা ইলিশ নিধন বন্ধ করার জন্য এ সময় ইলিশ শিকারই নিষিদ্ধ করে থাকে। এবার তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও পহেলা বৈশাখে ইলিশ খেতে মানা করেছেন। তা সত্ত্বেও কিছু মানুষ সে ইলিশকে নিয়েই মেতে ওঠেন। সঙ্গে আবার খান পান্তা ভাত! অথচ গ্রাম বাংলার মানুষ কখনো ইলিশ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার কথা কল্পনা করতে পারে না। তারা পান্তা খায় লবণ-পেঁয়াজ আর শুকনো মরিচ দিয়ে। সেটাও খায় বাধ্য হয়ে- ভালো কিছু খাওয়ার উপায় নেই বলে। 

এখানে মঙ্গল শোভাযাত্রা ধরনের আনুষ্ঠানিকতা নিয়েও বলা দরকার। মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে যেসব জীব-জন্তুর কুৎসিত মূর্তি এবং বীভৎস নানান প্রতিকৃতি নিয়ে রাজধানীতে মিছিল করা হয় সেগুলোর সঙ্গে ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। এগুলো বরং মূর্তি পূজার কথাই মনে করিয়ে দেয়- ইসলাম যার বিরোধিতা করে। আমরা মনে করি, নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের চিন্তা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটানো দরকার। একই সাথে নববর্ষ উদযাপনের মূল অবস্থানে ফিরে যাওয়ার সময় এসেছে বলেও আমরা মনে করি।

নতুন বছরের শুরুতে জাতীয় জীবনের অন্যসব দিকেও দৃষ্টি ফেরানো দরকার। হত্যা-গুম ও রাজনৈতিক দমন-নির্যাতনের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অবস্থা এমন হয়েছে যেন মানুষের জীবন ছেলেখেলার বিষয়! অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এজন্যই বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা সমালোচনায় সোচ্চার হয়ে উঠেছে। তাদের বিভিন্ন রিপোর্টে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানো হচ্ছে। আমরাও গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের এবং মানুষকে নিশ্চিন্তে জীবন যাপনের অধিকার দেয়ার দাবি জানাই। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে উৎসব আনন্দের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারেও উদ্যোগী হওয়া দরকার। প্রকৃতির প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ, সামনে রয়েছে কাল বৈশাখীর পালা। পাশাপাশি রয়েছে বন্যার মতো দুর্যোগের আশংকা। ওদিকে ভারতের পানি আগ্রাসনের পরিণতিতে বাংলাদেশের নদ-নদী খাল-বিল সব শুকিয়ে গেছে। দেশ মরুভূমি হওয়ার পর্যায়ে এসে গেছে। অথচ সরকারকে পানি আগ্রাসন প্রতিহত করার এবং ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরও এই ক্ষেত্রে সুফল বয়ে আনতে পারেনি। আমরা এমন অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারি না। 

১৪২৪ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে সরকার এবং সকল রাজনৈতিক দলসহ দেশবাসীর প্রতি আমাদের আহ্বান, আসুন আমরা জাতিকে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যোগী হই। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দৈনিক সংগ্রাম-এর সকল পাঠক, লেখক, সংবাদদাতা, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, হকার ও শুভানুধ্যায়ীর প্রতি আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা। নতুন বছরে সুখী-সমৃদ্ধ হোক মানুষের জীবন। শুভ নববর্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ