ঢাকা, রোববার 16 April 2017, ৩ বৈশাখ ১৪২৩, ১৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঋতুর নায়ক গ্রীষ্ম

এইচ এম মুশফিকুর রহমান : বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ। এর মধ্যে গ্রীষ্মকাল হচ্ছে ঋতু গণনার প্রথম মাস, যা বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসকে ধারণ করে। আমরা সহজভাবে বলে থাকি বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ- এই দুই মাস নিয়েই গ্রীষ্মকাল।
বৈশাখ মাস হচ্ছে বাংলা সালের প্রথম মাস। এই মাসে বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ফসল তোলার প্রস্তুতি চলে। বৈশাখ মাসের প্রথমদিন, অর্থাৎ বাংলা বছরের প্রথমদিন মানেই পহেলা বৈশাখ। এই পহেলা বৈশাখকে ঘিরে আমাদের দেশে অতীতকাল থেকেই চলছে নানারকম উৎসব।
গ্রীষ্ম সাধারণত এমন একটি ঋতু, যখন তাপমাত্রা থাকে গরম। দুপুরের পর থেকেই খুব ক্লান্ত, শ্রান্ত, অবসন্ন লাগে। এর পেছনে কিন্তু কারণ সেই একই-গরম। তাপে শরীরের প্রয়োজনীয় পানি বের হয়ে যায় ঘাম হিসেবে, আর সেই পানির সাথে বের হয়ে যায় প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানসমূহ।
ফলে ডায়রিয়া, বদহজম, বমি, জ্বর ইত্যাদি নানা রোগের সাথে হিট স্ট্রোকের মতো বড় দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে এসময়। তবে নিজেরা স্বাস্থ্যসচেতন থাকলে গ্রীষ্মকাল উপভোগ করা যায় সুন্দর এবং স্বাভাবিকভাবেই।
এ সময় রাত থাকে শীতকালের রাতের চেয়ে ছোট। দিন বড় হওয়ায় বাইরে ঘোরাঘুরি এবং কাজের জন্য হাতে অনেক সময় পাওয়া যায়। ছুটি কাটাতে ও পানিতে সাঁতার কাটতে এই সময়ের তুলনা হয় না।
এই সময়ে সূর্যের প্রচণ্ড তাপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভূমি, পানি শুকিয়ে যায়, অনেক নদীই নাব্য হারায়, পানিশূন্য মাটিতে ধরে ফাটল। গ্রীষ্মকালের শেষার্ধ্বে সন্ধ্যাসমাগত সময়ে ধেয়ে আসে কালবৈশাখী ঝড়, যা লণ্ডভণ্ড করে দেয় আমাদের পরিবেশকে।
গ্রীষ্মকাল মানেই তো নানারকমের রসালো, ঠাণ্ডা, মিষ্টি ফলের সময়; আম, তরমুজ, জামরুল, লিচু, কাঁঠাল- কোনটা ছেড়ে কোনটা খাই। এই সময়েই ফোটে গোলাপ, টগর, বকুল, বেলী, পলাশ, জবাসহ নানারকমের সুগন্ধী ফুল, সন্ধ্যাবেলা যাদের মধুর সুবাসে মন ভালো হয়ে যায়।
ঋতুর নায়ক গ্রীষ্মের রূপ বৈচিত্র্য নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের রচনা আমাদের সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ।
প্রকৃতির রূপ-লাবণ্য আমরা নতুনভাবে উপলব্ধি করার রসদ পেয়েছি। গ্রীষ্মের কবিতার একটি বড় অংশজুড়ে আছে বৈশাখ ও কালবৈশাখী ঝড়। কবিরা আপনার মনের মাধুরি মিশিয়ে গ্রীষ্মের প্রথম মাসের বর্ণনা দিয়েছেন কাব্যিক উপমায়। কবি সুফিয়া কামাল বৈশাখকে চিত্রিত করেছেন তার কবিতায়,
‘উন্মত্ত, তা বিক্ষিপ্ত বৈশাখের বায়ু
ধ্বংস করে না শুধু,
বাড়ায় সে পৃথিবীর আয়ু।’
গ্রীষ্মের কবিতায় জ্যৈষ্ঠের খরতাপ এবং তাপদাহও উঠে এসেছে নানা কবির কাব্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার দুই ‘বিঘা জমি’তে লিখেছেন-
‘সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম    কুড়াবার ধুম।
 জ্যৈষ্ঠ নিয়ে আরও অনেক কবিতা আছে, যেগুলোতে আমরা গ্রীষ্মের ভিন্ন ভিন্ন রূপ প্রত্যক্ষ করি। কবি ফজলুর রহমান তার কবিতায় লিখেছেন-
‘ঘাম ঝরে দর দর গ্রীষ্মের দুপুরে
মাঠ-ঘাট চৌচির,
জল নেই পুকুরে।’
‘রোদ যেন নয় শুধু ঘন ফুলকি
আগুনের ঘোড়া যেনো ছুটে চলে দুলকি।’
গ্রীষ্ম শুধু ধ্বংস, খরতাপ কিংবা নতুনের আহ্বান নিয়েই আসে না। আসে মওসুমি ফলের সম্ভার নিয়ে। তাইতো পল্লী কবি জসীমউদ্দীন তারই প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন ‘মামার বাড়ী’ কবিতায়-
‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ