ঢাকা, রোববার 16 April 2017, ৩ বৈশাখ ১৪২৩, ১৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সৈনিক রাজিব

বিলকিস আক্তার : কিশোরগঞ্জের কিশোর রাজীব। ভট্টাচার্য পাড়ায় জন্ম। ভট্টাচার্য পাড়ার এমন কোনো আনাচে-কানাচে নেই যেখানে তার বিচরণ নেই। মন চাইলে সে করিমগঞ্জের রাস্তা ধরে বাসের পিছনে দৌড়ের পাল্লা দেয়। বাড়ির পাশে মাঠের পরে যে ভাঙা মন্দিরটি আছে সেখানে তার রোজ একবার যেতেই হবে। গ্রামের লম্বা খালে সাঁতার কাটতে হবে। রুস্তম ব্যাপারির সান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে গোসল করতে হবে। বরফ-পানি না খেললে তো তার দিনটি মাটি। স্কুলে যাওয়া-আসা চলে নামে মাত্র। পড়ালেখার বালাই নেই। রাজীব তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড়। বাবা বড় সন্তান হিসেবে তার প্রতি একটু বেশি দুর্বল তো বটেই।
ছেলের গায়ের রঙ দুধে-আলতা। ছোট ভাই রাজ্জাক, বোন রমনি কেউ বড় ভাইয়ের ছিটেফোটাও পায়নি। ওরা দুই ভাইবোন একটু বেটে এবং শ্যামল বর্ণ। বড়ভাই লম্বা-চওড়া এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তো আছেই। এভাবে চলে যায় অনেক দিন। ওরা বেড়ে উঠছে প্রকৃতির খোলা হাওয়ায়, নির্মল পরিবেশে।
রাজিব আঠারো বছরে পা রেখেছে। ওর খালাতো ভাই গোলাপ। নামেই গোলাপ নয়। দেখতেও গোলাপের মতোই সুন্দর। দু’জন খুব ভালো বন্ধু। যেখানে যাবে, যা করবে দু’জনে একসাথেই থাকতে হবে। সুস্থ, সুন্দর জীবনের জন্য ভালো বন্ধু আবশ্যক। সেই অর্থে রাজিব আর গোলাপ দু’জনে যেন মানিকজোড়। একজন আরেকজনকে চোখে চোখে রাখে। আসলামও ওদের দু’জনের বন্ধু। রাজিবের বাড়ি থেকে শহরটা বেশ খানিকটা দূরে। যাতায়াতের ব্যবস্থা খুব ভালো না হলেও তেমন খারাপ না।
রাজিবের বাবা ওদের বাড়ির সামনে রাস্তা ঘেঁষে যে জায়গা আছে সেখানে একটা মুদি দোকান দিয়েছে। দোকানেই বেশিরভাগ সময় তিনি কাটান। ছেলেদের খুব বেশি একটা ডাকেন না তিনি। যতটুকু সম্ভব নিজেই দোকানে থাকেন। একদিন রাজিবের বাবা একটা জরুরি কাজে বাইরে যাবেন তখন তিনি রাজিবকে দোকানে বসতে বলেন। গোয়ালা তিন ভাই-বোনের জন্য রোজকার দুধ দোকানেই দিয়ে যান। বাবা তা একটা পাত্রে রেখে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
রাজিব কেমন যেন আনমনে বাবাকে বলে ফেলে, বাবা আপনি দোকানেই থাকেন আর দুধ আপনিই রাখেন।
বাবা তো খুব রেগে গেলেন বড় ছেলের প্রতি। রাজিবের বাবা চটি ব্যবহার করতেন না। তিনি কাঠের তৈরি খড়ম ব্যবহার করতেন। বাবা রেগেমেগে দৌড়ে গেলেন খড়ম দিয়ে ছেলেকে মারতে। রাজিব তো ভয়ে পড়ি কি মরি করে দিলেন ভোঁ দৌড়।
দৌড়ে চলে গেলেন রুস্তম ব্যাপারির পুকুরঘাটে। সেখানে গিয়ে মিলন ঘটল বন্ধু গোলাপ ও আসলামের।
ত্রি-রতœ মিলে ঠিক করল বাড়ি ফিরে যাবে না তারা। যেকোনোভাবে যেকোনো কাজের সন্ধান করতে হবে তাদের। তিন বন্ধু মিলে রওনা দিল শহরের পথে। শহরে তারা পাশা স্টেশন রোডে, যে ডাকবাংলো আছে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য সেখানে মানুষের ঢল দেখে তিন বন্ধু উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে গেল ডাকবাংলোর দিকে। গন্তব্যে পৌঁছে ওরা জানতে পারল সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগ চলছে। শহরের এবং শহরের আশপাশের এলাকা থেকে অনেক যুবক এসেছে সেই মিলনমেলায়। কয়েকজন অফিসার এবং আরো গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সেখানে উপস্থিত। যারা প্রার্থী সবাই আগে নাম লিখিয়েছে। কিন্তু রাজিবরা তিন বন্ধু তা করেনি।
একে একে নাম ধরে সবাইকে ডাকা হচ্ছে। প্রার্থীদের উচ্চতা মাপা হচ্ছে। ওজন মাপা হচ্ছে। কোন রোগ আছে কিনা তার একটা সাময়িক চেকআপ করা হচ্ছে। যারা মনোনীত হচ্ছে তাদেরকে একপাশে বসানো হচ্ছে। বাকিদের বিদায় দিয়ে দিচ্ছেন। রাজিব গিয়ে দাঁড়ালো অফিসারদের সামনে। রাজিব জানালো তার নাম লিখানো হয়নি। ও দেখতে-শুনতে এবং উচ্চতায় ঠিক থাকলেও ওজনে কিছু কম হলো। সঙ্গত কারণেই তাকে বাদ দিয়ে দেয়া হলো। ওর দুই বন্ধু উচ্চতায় আসেনি ওরাও বাদ পড়ে গেল। ভাঙা মন নিয়ে তিন বন্ধু ডাকবাংলো থেকে বেরিয়ে আসছে। এমন সময় রাজিব পাশেই একটা টিউবওয়েল দেখতে পেল। চট করে ওর মাথায় একটা বুদ্ধি খিলে গেল। রাজিব চিৎকার দিয়ে বলে উঠল একটা বুদ্ধি পেয়েছি। গোলাপ আর আসলাম তো অবাক। যা বাবা এখানে কি বুদ্ধি পেলি?
রাজিব তখন টিউবওয়েল দেখিয়ে বলল, ওজন কম হয়েছে না? দেখ পাঁচ কেজি পানি খেয়ে নিলেই তো ল্যাটা চুকে গেল। রাজিব টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে দুই হাতের আঁজলা টিউবওয়েলের মুখে ধরল। গোলাপকে বলল, টিউবওয়েলে চাপ দিতে। যতক্ষণ পারল পানি পান করে পেটটাকে টইটম্বুর করে ফেলল। তারপর পিছন ঘুরে চলে এলো সেনাবাহিনির অফিসারদের কাছে।
রাজিব একজন অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বলে, স্যার আমার ওজনটা আরেকবার মাপা যাবে?
অফিসার বললেন, তোমাকে একবার ওজন করা হয়েছে না?
রাজিব বলল, স্যার আমার পাটা মাটিতে ঠেকানো ছিল কিনা আমি বুঝতে পারিনি। অনুগ্রহ করে যদি আমাকে আর একবার সুযোগ দেন স্যার...।
অফিসার রাজিবের আচরণে সদয় হলো তার প্রতি। রাজিবকে ডাকা হলো এবং ওজন নেয়া হলো। অফিসার তো অবাক। ওর ওজন এখন ২.৫০ কেজি বেশি হচ্ছে।
কপালের লিখন না যায় খ-ন। রাজিবের কথায় অফিসার সদয় না হলে হয়ত জীবনটা অন্যরকম হয়ে যেতেও পারত।
আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না, পড়েও না। ভাগ্যক্রমে রাজিব মনোনীত হলো।
ডাকবাংলো খেকে মনোনীত সবাইকে ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে চিটাগাং। রাজিবের কাছে টাকা-পয়সা বলতে ছিল এক টাকা। অবশ্য ওখানে ব্যক্তিগত কোনো খরচ নেই।
অনেক প্রার্থীরা আগে থেকেই বাক্স-পেটরা গুছিয়ে এসেছিল। রাজিব খালি হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। মনের মণিকোঠায় অনেক কষ্ট উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। রাজিব বাড়ি যাবে না। এখান থেকে সরাসরি চলে গেল চট্টগ্রামে। সেখানে ট্রেনিং হলো দীর্ঘ ছয় মাস। অনেক কষ্ট হলো ট্রেনিং করতে। কিন্তু রাজিব হার মানল না কষ্টের কাছে। বিজয়ী হলো রাজিব। ছয় মাস পর রাজিবের চাকরি সুনিশ্চিত হলো। রাজিব হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন গর্বিত সৈনিক। শান্তি-শৃঙ্খলায় সর্বদা নিবেদিত প্রাণ এক সৈনিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ