ঢাকা, রোববার 16 April 2017, ৩ বৈশাখ ১৪২৩, ১৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আয়াতুল কুরসীর ফযীলত ও মর্যাদা

প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলীল মিঞা : “মহান আল্লাহ! তিনি ব্যতীত অন্যকোন উপাস্য নেই। তিনি চিরজীবন্ত ও নিত্য বিরাজমান তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তার সব কিছুরই একচ্ছত্র মালিকানা তাঁর। কে আছে এমন, যে তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন; তাঁর অন্তর জ্ঞানের কোন বিষয়ই কেউ ধারণা করতে পারে না; কিন্তু তিনি যা ইচ্ছা করেন তদ্ব্যতীত। তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আকাশ ও পৃথিবীর সর্বত্র পরিব্যাপ্ত। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত করে না। মূলত তিনিই হচ্ছেন এক মহান ও শ্রেষ্ঠতম সত্ত্বা।” সূরা আল বাক্বারাহ ২ : ২৫৫।
আয়াতুল কুরসী- এই মহা-মহিমান্বিত আয়াত মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ‘আয়াতুল কুরসী” নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এখানে মহান আল্লাহ তা’আলার এমন পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি পেশ করা হয়েছে, যার নজির আর কোথাও নেই। এমনকি তাওরাত, যাবুর, ইনজীল প্রভৃতি জগতের যাবতীয় প্রত্যাদিষ্ট গ্রন্থমালার মধ্যেও এর তুলনা নেই। তাই সহীহ হাদীসে একে কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে উল্লেখিত মূল শব্দ কুরসী। সাধারণত এ শব্দটি কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও রাষ্ট্রশক্তি অর্থে রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। (বাংলা ভাষায় এরি সমজাতীয় শব্দ হচ্ছে “গদি”। গদীর লড়াই বলতে ক্ষমতা কর্তৃত্বের লড়াই বুঝায়।) কুরসী হলো আমাদের রবের পাদানী। তিনি আরশে সমাসীন এবং পদযুগল রেখেছেন কুরসীতে। এ কুরসীতেই সপ্ত আসমান ও সপ্ত জমিন এবং এগুলোতে যে সকল মাখলুক আছে সবকিছুই একটি থলে সদৃশ এই কুরসীতেই লুকায়িত রয়েছে। তথ্যসূত্র : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-১ম খণ্ড।
আয়াতুলকুরসীর বিশেষ ফযীলত। এ আয়াতটি কুরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত। হাদীসে এ আয়াতের অনেক ফযীলত ও বরকত বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) এটিকে সবচাইতে উত্তম ও মর্যাদা বিশিষ্ট আয়াত বলে উল্লেখ করেছেন। উবাই ইবনু ক্বা’ব (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহুত) কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করেন : আল্লাহ তা’আলার কিতাবে সর্বাপেক্ষা বড় ও মর্যাদা বিশিষ্ট আয়াত কোনটি? তিনি উত্তরে বলেন : আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-ই সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি পুনরায় এটাই জিজ্ঞেস করেন। বারবার প্রশ্ন করায় তিনি বলেন : ‘আয়াতুল কুরসী”। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) তখন তাঁকে বলেন : হে আবুল মানযার! মহান আল্লাহ তোমার জ্ঞানে বরকত দান করুন। যে মহান আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তাঁর শপথ করে আমি বলছি যে, এর জিহ্বা হবে, ওষ্ঠ হবে এবং এটা প্রকৃত বাদশাহর পবিত্রতা বর্ণনা করবে ও আরশের পায়ায় লেগে থাকবে। তথ্যসূত্র: তাফসীর ইবনু কাসির-১ম, ২য় ও ৩য় খ-, পৃ: ৭০২।
আবূ যার  (রযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে জানতে চাইরেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)! কুরআনের সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন আয়াতে কারিমা কোনটি? তিনি উত্তরে বললেন : “আয়াতুল কুরসী: তথ্যসূত্র : তাফসীর ইবনু কাসির- ১ম, ২য় ও ৩য় খ-, পৃ: ৭০৩।
আবূ হুরাইরাহ (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) বলেছেন, রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন সূরা আল বাক্বারায় এমন একটি আয়াত রয়েছে যা কুরআনের অন্য সব আয়াতের সর্দার বা নেতা। সে আয়াতটি যে ঘরে পড়া হয়, তা থেকে শয়তান বেরিয়ে যায়। তথ্যসূত্র : তাফসীর মা’ আরেফুল কুরআন- ১ম খণ্ড, পৃ: ৬৭৬।
সুনান আন নাসায়ী’র এক বর্ণনাতে রয়েছে যে, হুজুরে আকরাম (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন : “যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয সালাতের পর আয়াতুল কুরসী নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য বেহেশতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া অন্য কোন অন্তরায় থাকে না। অর্থাৎ মৃত্যুর সাথে সাথেই সে বেহেশতের ফলাফল এবং আরাম-আয়েশ উপভোগ করতে শুরু করবে।
উবাই ইবনু ক্বা’ব (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) বলেন, ‘আমার একটি খেজুর পূর্ণ লে ছিল। আমি লক্ষ্য করিযে, ওটা হতেই প্রত্যহ খেজুর কমে যাচ্ছে। একদা রাত্রে আমি জেগে জেগে পাহারা দেই। আমি দেখি যে যুবক ছেলের ন্যায় একটি জন্তু আসলো। আমি তাকে সালাম দিলাম। সে আমার সালামের উত্তর দিলো। আমি তাকে বললাম : তুমি মানুষ না জিন? সে বলল : আমি জিন। আমি তাকে বললাম : তোমার হাতটা একটু বাড়াও তো। সে হাত বাড়াল, আমি তার হাতটি আমার হাতের মধ্যে নিলাম। হাতটি কুকুরের হাতের মতো ছিলও তার উপর কুকুরের মতো লোমও ছিল। আমি বললাম, জিনদের সৃষ্টি কি এভাবেই হয়? সে বলল  সমস্ত জিনের মধ্যে আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। আমি বললাম : আচ্ছা, কিভাবে তুমি আমার জিনিস চুরি করতে সাহসী হলে? সে বলল : ‘আমি জানি যে, আপনি দান করতে ভালবাসেন। তাই আমি মনে করলাম যে, আমি কেন বঞ্চিত থাকি? আমি বললাম : তোমাদের অনিষ্ট হতে কোন জিনিস রক্ষা করতে পারে? সে বলল : ‘আয়াতুল কুরসী।’ সকালে আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে রাত্রের সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলাম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বললেন : ‘খবীস তো এই কথাটি সম্পূর্ণ সত্যই বলেছে।’ আবূ ইয়া’লা।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাপ-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)! কুরআনের সবচেয়ে বড় আয়াত কোনটি? তিনি এই আয়াতুল কুরসীটিই পাঠ করে শুনান। তাবরানী।
আবূ আইয়্যূব আনসারী (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) বলেন : আমার ধনাগার হতে জিনেরা ধন চুরি করে নিয়ে যেত, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এজন্য অভিযোগ করি। তখন তিনি বলেন : যখন তুমি তাকে দেখবে তখন বিসমিল্লাহী আজিবী রসুলুল্লাহে পাঠ করবে। যখন সে এলো তখন আমি এটা পাঠ করে তাকে ধরে ফেললাম। সে বলল : আমি আর আসব না। সুতরাং আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে বললেন : তোমার বন্দি কি করেছিল? আমি বললাম : তাকে আমি ধরে ফেলেছিলাম। কিন্তু সে আর না আসার অঙ্গীকার রায় তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন : সে আবার আসবে। আমি এভাবে তাকে দু’তিনবার দরে ফেলি এবং অঙ্গীকার নিয়ে ছেড়ে দেই। আমি তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট বর্ণনা করি। তিনি বারবারই বলেন : সে আবার আসবে। শেষবার আমি তাকে বলি : এবার তোমাকে ছাড়ব না। সে বলে, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে এমন একটি জিনিস শিখিয়ে দিচ্ছি যে, কোন জিন্ ও শয়তান আপনার কাছে আসতেই পারবে না। আমি বললাম : আচ্ছা বলে দাও। সে বলল : ওটা ‘আয়াতুল কুরসী’। আমি তা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে বর্ণনা করি। তিনি বলেন, ‘সে মিথ্যাবাদি হলেও এটা সে সত্যই বলেছে। তথ্যসূত্র : মুসনাদ-ই আহমাদ, তাফসীর ইবনু কাসিম-১ম ২য় ও ৩য় খ-, পৃ: ৭০৪।
সহীহুল বুখারী’র মধ্যে কিতাবু ফাদাইলাল কুরআনী কিতাবুল ওয়াকালাত ও ছিকতু ইবলিস-এর বর্ণনায়ও এই হাদীসটি আবূ হুরাইরাহ (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) হতে বর্ণিত আছে। তাতে রয়েছেÑ আবূ হুরাইরাহ (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আমাকে রামাযানের যাকাতের উপর প্রহরী নিযুক্ত করেন। আমার কাছে একজন আগমনকারী আসে এবং ঐ মাল হতে কিছু কিছু উঠিয়ে নিয়ে সে তার চাদরে জমা করতে থাকে। আমি তাকে ধরে ফেলে বলি, ‘তোমাকে আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট নিয়ে যাব। সে বলে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি অত্যন্ত অভাবী। আমি তখন তাকে ছেড়ে দেই। সকালে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার রাত্রের বন্দি কি করেছিল? আমি বলি হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)! সে তার ভীষণ অভাবের অভিযোগ করে। তার প্রতি আমার করুণার উদ্রেক হয়। কাজেই আমি তাকে ছেড়ে দেই।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বলেন, সে তোমাকে মিথ্যা কথা বলেছে, সে আবার আসবে। আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর কথায় বুঝলাম সে সত্যই আবার আসবে। আমি পাহারা দিতে থাকলাম, সে আসলো এবং খাদ্য উঠাতে থাকল। আবার আমি তাকে ধরে ফেলে বললাম : তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে নিয়ে যাব। সে আবার ঐ কথাই বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। কেননা আমি অত্যন্ত অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি। তার প্রতি আমার দয়া হলো, সুতরাং তাকে ছেড়ে দিলাম। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ