ঢাকা, রোববার 16 April 2017, ৩ বৈশাখ ১৪২৩, ১৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ইলিয়াস আলী-আনসার ফিরবেন এখনও বিশ্বাস দুই পরিবারের

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ঠিকই পরিবারের কাছে একদিন ফিরবেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী। রাজধানীর বনানী থেকে রাতের বেলায় ‘নিখোঁজ’ হওয়ার পাঁচ বছর পরও এই বিশ্বাসে বিন্দুমাত্র চিড় ধরেনি ইলিয়াসের স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা ও আনসারের স্ত্রী মুক্তা বেগমের। দুটি পরিবারের অপরাপর সদস্যের সাথে আশায় বুক বেঁধে স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় এখনও তারা। তিন সন্তানকে নিয়ে তাহসিনা থাকেন ঢাকার বনানীতে। আর এক সন্তান এবং স্বামীর মা ও ভাইবোনদের নিয়ে মুক্তা থাকেন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চি ইউনিয়নের গমরাগুল গ্রামে। 

পাঁচ বছর আগে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট) ইলিয়াস আলী নিজ বাসায় যাওয়ার পথে বনানী থেকে নিখোঁজ হন। তার সঙ্গে গাড়িচালক আনসারও নিখোঁজ হন। আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকলেও একই এলাকার হওয়ায় ইলিয়াসকে চাচা বলে ডাকতেন আনসার। ইলিয়াসও তাকে ভাতিজা বলে ডাকতেন। এখন বিএনপির কোনো পদে নেই ইলিয়াস আলী। তার নিখোঁজ হওয়ার পর সভা, সমাবেশ, হরতাল, মিছিল হয়েছে। এসবের কোনটাই ইলিয়াছকে ফেরাতে পারেনি। সর্বশেষ তার স্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হয়েছেন, আশ্বাসও পেয়েছেন, কিন্তু দু‘নজরে স্বামীকে দেখেননি লুনা। 

ইলিয়াসের স্ত্রী তাহসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার। তিনি বলেন, তার স্বামী ফিরে আসবেন, এটা তিনি বিশ্বাস করেন। ইলিয়াস আলীর এলাকার মানুষও এটা বিশ্বাস করে। তিনি এ-ও বলেন, ‘বাস্তব পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন, অনেকের কাছে অনেক কিছু মনে হতে পারে, তবে বিশ্বাস করি একদিন না একদিন সে ফিরবেই। ’

৩২ বছরের যুবক আনসার টানা ২০ বছর ইলিয়াস ও তার পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। দুই বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। আনসারের স্ত্রী মুক্তা বেগম তার গ্রামের একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খ-কালীন শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘যেখানেই আছেন আনসার, ইলিয়াসের সঙ্গেই আছেন। তারা জীবিত আছেন, একদিন ঠিকই ফিরবেন। ’

ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তার স্ত্রী। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে ইলিয়াসের খোঁজ চেয়ে রিটও করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালতে পুলিশ কয়েক ডজনবার প্রতিবেদন দিয়েছিল। এখন কী অবস্থায় আছে, সে খবর আর রাখেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘মামলা তো পুলিশ নিল না। এখন জানি না পুলিশের অগ্রগতি কী?’

ইলিয়াস ও তার গাড়িচালকের নিখোঁজের বিষয়টি তদন্ত করে বনানী থানা-পুলিশ। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ২৪টি তদন্ত প্রতিবেদন উচ্চ আদালতে দাখিল করেন থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাজী মাইনুল ইসলাম। যদিও এসব প্রতিবেদনে তার নিখোঁজ হওয়ার আগের অবস্থান ও গাড়ির বিবরণগুলো ঘুরেফিরে এসেছে। বনানী থানার বক্তব্য, এই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। ওই প্রতিবেদনগুলোর পর আর কোনো প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য নেই। 

ইলিয়াসের কাজগুলোও করছেন তাহসিনা : বনানী সিলেট হাউসের সবকিছু আগের মতোই আছে। নেই শুধু ইলিয়াস আলী। বাড়ির নিচের তলায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল ইলিয়াস আলী নিখোঁজের পর। এর আগে এটি ছিল না। চাকরি, তিন ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খবর রাখা, সম্পত্তি দেখাশোনো করতে হয় তাহসিনাকে। এত কিছুর পরও ইলিয়াস আলীর নির্বাচনী এলাকা ও গ্রামের বাড়িতে যেতে ভুল করেন না। সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হলেও ইলিয়াসের নির্বাচনী এলাকার সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত আছেন তিনি। অবশ্য সেখানকার নেতা-কর্মীরাও ইলিয়াসের অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রীকে সবকিছুতে ডাকেন। 

তাহসিনা রুশদীর বললেন, ইলিয়াস আলীর নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিতই যান তিনি। সেখানকার নেতাদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখেন। তারা কাউন্সিল, প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজে অংশ নিতে বলেন। যেহেতু এগুলো ইলিয়াস আলীর কাজ, তাই তার সাময়িক অনুপস্থিতিতে সেগুলো করেন। 

ইলিয়াসের দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে আবরার ইলিয়াস যুক্তরাজ্যের লন্ডনে একটি কলেজে আইন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে লাবিব সারার এইচএসসি পাস করেছেন। একমাত্র মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। 

আনসারের মুঠোফোনে এখনো ফোন করেন স্ত্রী : আনসার আলীর বাবা নেই। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। পরিবারে মা, স্ত্রী, ভাইবোন ছাড়াও রয়েছে তার একমাত্র কন্যাসন্তান। নিখোঁজ হওয়ার সময় মেয়ে মারিয়া মাহজাবিনের বয়স ছিল তিন বছর, সে এখন আট বছরে, পড়ছে দ্বিতীয় শ্রেণিতে । 

আনসারের মা নূরজাহান বেগম (৬১) বলেন, তার ছেলের বেতনের টাকা প্রতি মাসে ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। পাঁচ বছর ধরে এ দায়িত্ব পালন করছেন ইলিয়াস আলীর স্ত্রী। এ টাকা আর ছেলের বউয়ের শিক্ষকতার বেতনে চলে সংসার। সংসারে অভাব, টানাপোড়েনের চেয়ে আনসারের কোনো খোঁজ না পাওয়াই স্ত্রী ও মায়ের কাছে সবচেয়ে কষ্টের। 

স্ত্রী মুক্তা বেগম বলেন, গাড়িচালকের চাকরি পাওয়ার পর আনসার ব্যস্ত হয়ে পড়েন। স্বামী নেই, বিষয়টি মানতে নারাজ তিনি। বললেন, হয়তো সরকার বদল হলে তাদের খোঁজ মিলবে। মুক্তা বলেন, প্রায়ই তিনি আনসার আলীর মুঠোফোনে ফোন দেন। কখনো বন্ধ আবার কখনো খোলা পাওয়া যায়। আর মায়ের বিশ্বাস, ‘একটা ঝড়ে আমার পুতরে নিছে। আরেকটা ঝড়ে ফিরাইয়া দিব,এই বিশ্বাস আমার আছে, থাকবই। ’

বিভিন্ন কর্মসূচি : সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে গঠিত ইলিয়াস মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ বিগত দিনে বারবার এম ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে দেয়ার জোর দাবি জানানোর পরও সরকার নিশ্চুপ। গত ১০ এপ্রিল ইলিয়াস মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি দিলদার হোসেন সেলিম, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক, ইলিয়াস মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শেখ মখন মিয়া (চেয়ারম্যান), সদস্যসচিব এ টি এম ফয়েজ, জেলা বিএনপির নেতা শাহ জামাল নুরুল হুদা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক নাজিম উদ্দিন লস্কর, জেলা বিএনপি নেতা ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকী, কাউন্সিলর দিনার খান হাসু, জেলা জাসাসের আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজমল হোসেন রায়হান, জেলা তাঁতী দলের সাংগঠনিক সম্পাদক জয়নুল হক, বিএনপি নেতা শাহিদুল ইসলাম কাদির, বিএনপি নেতা মতিউর বারী চৌধুরী খুর্শেদ, স্বেচ্ছাসেবকদল নেতা দীপক রায়, দিলাল আহমদ, মহানগর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক লিটন কুমার দাস নান্টু, স্বেচ্ছাসেবকদল নেতা মোস্তফা কামাল ফরহাদ, দেয়ান নিজাম খান, লাহিন চৌধুরী, জেলা জাসাসের যুগ্ম আহ্বায়ক রায়হান এইচ খান, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জাহাঙ্গীর আহমদ প্রমুখ। 

বৈঠকে এম ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ ১৬ এপ্রিল বেলা ১১টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন পালন এবং কাল রোববার ১৭ এপ্রিল বাদ আসর শাহজালাল দরগাহ মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ