ঢাকা, রোববার 16 April 2017, ৩ বৈশাখ ১৪২৩, ১৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কে আমার জীবনের হারানো বার বছর ফেরত দিবে?

খুলনা অফিস: অনেক কষ্টে আছি, স্ত্রী সন্তান নিয়ে খুবই সমস্যায় আছি। এখন কোথায় চাকরিও করা সম্ভব নয়। আমার জীবনটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া চলছে না। আমার পেছনে সব কিছু খুইয়ে পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। আমি এখন কার কাছে বিচার চাইবো, কে আমার হারানো ১২ বছর ফেরত দেবে? এ প্রশ্ন রেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন শেখ বদিউজ্জামান লিটু (৪৩)। ১৯৮৮ সালে তিনি খুলনা মহানগরীর পল্লীমঙ্গল স্কুল থেকে এসএসসি এবং পরবর্তীতে সরকারি বিএল কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। বিএল কলেজে ভর্তি হয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর বিদেশে যাওয়ার জন্য ঢাকায় গিয়ে দৌড়-ঝাঁপ করে দুই বছর কাটিয়ে আবারও ফিরে আসেন খুলনায়। কিন্তু আর লেখাপড়ার দিকে যাননি। তখনো তিনি খুলনা মহানগর ছাত্র সমাজের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি আওয়ামী যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। সোনাডাঙ্গা থানা যুবলীগের যুগ্ম-আহবায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সালে বিয়ে করেন, তার একটি কন্যা সন্তান জন্ম  নেয়। ২০০৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর একটি ঝড় নেমে আসে এই পরিবারটির ওপরে। ২০০১ সালের ১৬ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার পিলজং ইউনিয়নের কাঁঠালতলা এলাকার ফরহাদ হোসেন হত্যা মামলায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) চার্জশীটে শেখ বদিউজ্জামান লিটুর নাম উল্লেখ করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। ২০০৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর লিটুকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। সেই থেকেই তার কারাবাস শুরু।
পরে ২০০৫ সালের ১৭ জুলাই ওই হত্যা মামলায় বাগেরহাটের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল লিটুসহ ৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেন। এরপর ন্যায় বিচার পেতে লিটুর পরিবার তার মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু বিক্রি করে হাইকোর্টে আপীল করেন। হাইকোর্ট ২০১০ সালের ১৮ আগস্ট নিম্ন আদালতের দ- বহাল রাখেন। এরপরও হাল ছাড়েননি লিটু’র পরিবার তাদের বিশ্বাস ছিলো নির্দোষ মানুষের ফাঁসি হতে পারে না।
ঘরের জিনিষপত্রসহ স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে সুপ্রীমকোর্টে আপীল করেন তার পরিবার। দীর্ঘ শুনানী ও সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে অবশেষে ২০১৬ সালের ১৬ নবেম্বর শেখ বদিউজ্জামান লিটুকে নির্দোষ বলে রায় ঘোষণা করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীমকোর্ট।  সাড়ে তিন মাস পর চলতি বছরের ১৩ মার্চ যশোর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
লিটু বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার পিলজং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মৃত শেখ খলিলুর রহমানের ছেলে। ১৯৭৬ সালের সর্বহারাদের (নকশাল) হাতে নিহত হন তার পিতা। এরপর তাদের হুমকীতে ৬ সন্তান নিয়ে লিটুর মা ফাদিয়া বেগম বাগেরহাট থেকে খুলনার সোনাডাঙ্গাস্থ শাহ বাড়ির পিত্রালয়ের চলে আসেন। ৩ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে লিটু ৪র্থ। অনেক দায়িত্ব ছিলো তার ওপরে। কিন্তু জীবনের ১২টি বছর জেলের ঘানি টানতে গিয়ে নিজেই এখন শারীরিক ও মানসিকভাবে  বিপর্যস্ত। তবে সর্বশেষ তিনি তার জীবনের গতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ