ঢাকা, রোববার 16 April 2017, ৩ বৈশাখ ১৪২৩, ১৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পৃথিবীর কোনো ধর্মই জুলুম-নির্যাতন, সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ বোমাবাজি অনুমোদন করে না

গতকাল শনিবার রাজধানীর উত্তরায় বিআইআইটি মিলনায়তনে দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়

এশিয়ান রিসোর্স ফাউন্ডেশন (এআরএফ) ও এশিয়ান মুসলিম অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (আমান), থাইল্যান্ডের সহযোগিতায় এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট (বিআইআইটি)-এর যৌথ উদ্যোগে ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি)-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশ্বাসভিত্তিক সংগঠনসমূহের ভূমিকা’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালায় দেশ-বিদেশের মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের আমন্ত্রিত ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখক, সমাজসেবক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, এনজিও প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর উত্তরায় বিআইআইটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইটির নির্বাহী পরিচালক আবদুল আজিজ। কর্মশালায় সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি)-এর পরিচিতি তুলে ধরে ইউএনডিপি বাংলাদেশ অফিসের গ্রাম-আদালত প্রকল্পের ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সরদার এম আসাদুজ্জামান বলেন, জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ১৭ টি গোল একটি সার্বজনীন লক্ষ্য। এটি মূলত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে বিবেচনায় রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। আশার কথা যে, বর্তমান সরকার ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সামগ্রিকভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়েছে। কর্মশালায় ‘এসডিজি উন্নয়নে ধর্ম ভিত্তিক নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্মের ভূমিকা’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশিয়ান রিসোর্স ফাউ-েশন (এআরএফ) ও এশিয়ান মুসলিম অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (আমান), থাইল্যা-ের সেক্রেটারি জেনারেল এম. আবদুস সবুর।
‘ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে ইউএন এসডিজি’ বিষয়ক কর্মশালার ১ম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং সেন্টার ফর ইন্টার-রিলিজিয়াস এন্ড ইন্টার-কালচারাল ডায়লগের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম।
১ম অধিবেশনে ‘এসডিজি উন্নয়নে ইসলাম ধর্মের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একিউএম আবদুল কাদের। ‘এসডিজি উন্নয়নে হিন্দু ধর্মের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ড. দুলাল কান্তি ভৌমিক। ‘এসডিজি উন্নয়নে  বৌদ্ধ ধর্মের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ও বুদ্ধিষ্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বুদ্ধিষ্ট সেন্টার ফর হেরিটেজ এন্ড কালচারের পরিচালক অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়–য়া। ‘এসডিজি উন্নয়নে খ্রিস্ট ধর্মের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি বিশপ সৌরভ ফোলিয়া। ‘এসডিজি উন্নয়নে ধর্মের ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক তহুর আহমাদ হিলালী।
১ম অধিবেশনে সভাপতির অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম বলেন, পৃথিবীর কোনো ধর্ম জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অত্যাচার, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, বোমাবাজি ও নরহত্যাকে অনুমোদন করে না। ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই ধর্ম। ধর্মকে সঠিকভাবে অনুধাবন করলে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে আমরা আত্মীয় মনে করতে পারবো। পরিবেশকে সংরক্ষণ রাখার তাগিদ দিয়েছে সকল ধর্ম। ধর্ম সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত বলে আমরা ধর্মের মূল নৈতিক শিক্ষা সম্পর্কে যে সব ধর্ম একই কথা বলেছে তা আমরা অনুধাবন করতে পারি না। এসডিজিতে ১৭টি দিকের উপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও নৈতিক উন্নয়নের কথা বলা হয়নি, মানসম্মত শিক্ষার কথা বলা হয়নি। ফলে আমরা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রিধারী, কিন্তু শিক্ষিত নই। আত্ম-উন্নয়ন, কোয়ালিটি এডুকেশন ছাড়া কোনোভাবেই মানবজীবনে টেকসই উন্নয়ন সাধন সম্ভব নয়।
‘শান্তি, ন্যায় বিচার ও মানবাধিকার প্রেক্ষাপটে ইউএন এসডিজি’ শিরোনামে কর্মশালার ২য় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাইমুল আহসান খান। এ বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন হিউম্যান রাইটস ল ইয়ার সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মোহাম্মদ শামসুদ্দীন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট মিস দিলরুবা শারমিন এবং ড. নাজমুস সাদাত। সভাপতির বক্তব্যে ড. মাইমুল আহসান খান বলেন, অন্যান্য উন্নয়ন সম্পর্কিত ইস্যুর সঙ্গে গণতন্ত্র, দায়বদ্ধতা, শান্তি-সম্প্রীতি, ন্যায়পরায়ণতা, মানবাধিকার প্রভৃতি বিষয় অগ্রাধিকারে আনা উচিত। আর পৃথিবীতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দূরীভূত করে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক শান্তি-সম্প্রীতি অর্জনে সামগ্রিক প্রচেষ্টা ক্ষুধা-দারিদ্র দূরীকরণের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
‘জেন্ডার প্রেক্ষাপটে ইউএন এসডিজি’ শিরোনামে কর্মশালার ৩য় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাসুদা এম. রশিদ চৌধুরী, বাংলাদেশ সরকারের উপ-সচিব ড. আবুল হোসেন এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের প্রতিনিধি মিসেস তাজিমা হোসেন মজুমদার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। শাহ আবদুল হান্নান তার বক্তব্যে বলেন, নারীদের সম-অধিকার এবং তাদের ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য সৃষ্টি করে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি যে ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতন করা হচ্ছে তা মানুষের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে সহজেই দূর করা সম্ভব।
‘দেশের প্রেক্ষাপটে ইউএন এসডিজি’ শিরোনামে কর্মশালার ৪র্থ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। এ অধিবেশনে ‘বাংলাদেশে সরকারের পলিসি বনাম এনজিও-এর কর্মকা-’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক উপ-সচিব ড. মিজানুর রহমান এবং ‘এসডিজি বাস্তবায়নে এশিয়ান সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইশাক মিয়া ও মহিউদ্দীন। ড. আনিসুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, এমডিজিতে সংখ্যার উপর যেমন- শিক্ষাক্ষেত্রে ভর্তির হারের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে অনেক দেশে শিক্ষার মানে চরম অবনতি ঘটেছে। পক্ষান্তরে এসডিজিতে প্রথমবারের মতো শিক্ষার মান তথা জ্ঞনার্জন ও শিক্ষার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব তৈরির কথা বলা হয়েছে।
কর্মশালায় সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সরকারের এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক গোকুল কৃষ্ণ ঘোষ বলেন, এসডিজিতে শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে, মানবাধিকার সংরক্ষণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, কার্যকর আইনের শাসন ও সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে এবং স্বচ্ছ, কার্যকর ও দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে নিঃসন্দেহে।
উন্মুক্ত আলোচনায় ও কর্মশালায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমাজে ধর্মীয় শিক্ষার প্রকৃত মর্মবাণীর প্রচার-প্রসার এবং ধর্মীয় আচার-আচরণ অনুশীলনের মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বে মানবতা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তা দূরীভূত করে এসডিজি বাস্তবায়নে সহজেই একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়। বিশ্বমানবতার সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে আন্তঃধর্মীয় একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন বিশ্বব্যাপী শান্তি, সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে, ক্ষুধা ও দারিদ্র থেকে মানুষ মুক্তি পাবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য অর্জিত হবে। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির অঙ্গীকার বাংলাদেশে এসডিজির যথাযথ বাস্তবায়ন, টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ