ঢাকা, সোমবার 17 April 2017, ৪ বৈশাখ ১৪২৩, ১৯ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বড় বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতাও বাড়াতে হবে

গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে জাতীয় বাজেট ২০১৭-১৮ বিষয়ে সিপিডির সুপারিশমালা তুলে ধরে মিডিয়া ব্রিফিং করেন সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : প্রবৃদ্ধির গতি রাখা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে বড় আকারের বাজেটের পক্ষে মত জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এজন্য আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সম্প্রসারণশীল বাজেটের পাশাপাশি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গতকাল রোববার সকালে আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে নিজেদের নানা প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরে সিপিডি। আলোচনায় অংশ নেন, সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার মোয়াজ্জেম ও রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

আগামী জুন মাসে সংসদে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে যাচ্ছেন বলে ইতোমধ্যে আভাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

আওয়ামী লীগের সরকার ২০০৯-১০ সালে যে বাজেট দিয়েছিল, তার আকার এক লাখ কোটি টাকার নিচে ছিল। ধারাবাহিকভাবে তা বেড়ে বর্তমানে বেড়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বড় বাজেট দেয়ার পক্ষপাতি মুহিত বলে আসছেন, তিনি আরও বড় আকারের বাজেট দিতে চান। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ৫ লাখ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য তাদের।

সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে বলেন, সরকার সবসময় একটা বড় বাজেটের কথা বলেন, সরকারি ব্যয় ও আয়ের কথা বলেন। আমরা তা পূর্ণভাবে সমর্থন করি।

সিপিপির সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সম্প্রসারণশীল বাজেটের পক্ষে। আমরা শুনেছি আগামী বাজেট ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট হতে পারে, যা মাথা পিছু ২৫ হাজার হাজার টাকা বা ৩০০ ডলার মতো হয়। এটা উন্নয়নশীল বিশ্বের চেয়ে কম।

নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে বড় বাজেটের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এরকম পর্যায়ে অন্যান্য দেশগুলো ছিল, যারা দ্রত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে।

যেমন মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতেও এরকম সময়ে আমাদের মতো বাজেটই নেওয়া হয়েছিল। তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সক্ষমতা থাক প্রয়োজন, তা সরকারের নেই বলে সিপিডির পর্যবেক্ষণ।

মোস্তাফিজুর বলেন, বড় বাজেট নেওয়া হচ্ছে কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সেটাকে ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। বড় বাজেটের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের জায়গায় নিয়ে আসা উচিৎ। 

এক্ষেত্রে কোন এজেন্সির কতটা ব্যয় সক্ষমতা আছে সে অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া উচিৎ,পরামর্শ দেন তৌফিকুল।

প্রতিরক্ষাসহ প্রত্যেকটা খাতে বাজেট ব্যয়ে স্বচ্ছতার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ কম সময়ে ব্যয়ের কৌশল বের করার উপরও তিনি জোর দেন।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দের বেশিরভাগ সরকারি কর্মচারীদের পেনশনে চলে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তৌফিকুল বলেন, যতখানি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে তাদের জন্য (টার্গেট গ্রুপের জন্য) বরাদ্দ করা হচ্ছে না। আবার যে বরাদ্দ করা হচ্ছে তার একটা বড় অংশ সরকারের পেনশনের জন্য করা হচ্ছে।

এবছর যেখানে পেনশনের জন্য আট হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল সেখানে বেতন স্কেল বৃদ্ধির কারণে তা সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা দিতে হয়েছে। কিন্তু ব্য়স্ক ভাতার জন্য পরিকল্পনায় বলা হয়েছে সাড়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকা লাগবে, তা সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যেই আটকে আছে। এটা বাড়ানো সম্ভব হয়নি। পেনশন স্কিমকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির কর্মসূচির বাইরে রাখার সুপারিশ করছেন সিপিডি।

আমাদের প্রস্তাব হলো যে, বরাদ্দ (অন্য খাতে) দিয়ে ব্যয় করতে না পারার চেয়ে সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়ালে সামাজিক খাতগুলো সুসংহত হবে। আসছে বাজেট নিয়ে জ্বালানি তেলের দাম কমানোসহ বেশ কয়েটি সুপারিশ করেছে সিপিডি।

তৌফিকুল বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমাতে হবে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এটা বিশ্ব বাজারে কম থাকলেও আমাদের এখানে কমছে না। রপ্তানি ও রেমিটেন্স বাড়াতে টাকার মান কিছুটা কমানোর সুপারিশ করেন তিনি।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর সুপারিশ জানিয়ে তৌফিকুল বলেন, এটা সরকারি ব্যয়ের জন্য ভালো হবে। আবার ব্যাংকের জন্যও ভালো হবে। চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে পদক্ষেপ নেওয়ার উপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সামনে বোরো আসবে। তখন হয়ত চালের দাম কিছুটা কমবে। কিন্তু সার্বিকভাবে মধ্যমেয়াদে আগামী অর্থবছরে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনে আমদানি করতে হলে দ্রত পদক্ষেপ নিতে হবে।

তৌফিকুল বলেন, কয়েক বছর ধরেই আমরা বলছি ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি কমিশন গঠন করতে। প্রতি বছর সরকার জনগণের করের টাকায় যেভাবে ব্যাংকগুলোকে নিঃশর্তভাবে পুনঃমূলধনী করা হচ্ছে, এ বিষয়টি অবশ্যই থামাতে হবে।

 তবে নতুন মূসক আইন সম্পর্কে সিপিডির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশের সমতুল্য দেশগুলোতে গড় ভ্যাট হার ১২ শতাংশ। এরমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত, পাকিস্থান ও শ্রীলঙ্কায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, পূর্ব এশিয়ার নিম্ন মধ্যম আয়ের ১১টি দেশে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার নিম্ন মধ্যম আয়ের ১৪টি দেশে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, নিম্ন মধ্যম আয়ের ৫৫টি দেশে ১৪ শতাংশ ও বিশ্বের ১৯০টি দেশে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ।এই অবস্থায় বাংলাদেশে ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় এ হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশ করা উচতি।

তিনি বলেন, মূসক আইন সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। ভ্যাট ভোক্তা দেবে। ভোক্তার সহযোগিতা ছাড়া সফলভাবে এ আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ভোক্তা যদি ভ্যাট দেয়, আর রিসিট না নেয় তাহলে কখনো এ আইনের সুফল ভোক্তা পাবে না। তিনি জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাদের মতামত নেওয়ার মাধ্যমে এ আইন বাস্তবায়নের সুপারিশ করেন।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১ জুলাই থেকে নতুন মূসক আইন বাস্তবায়নকে নীতিগত সমর্থন করে সিপিডি। মূসক হার ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও সরকার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেভাবে ১৫ শতাংশ মূসক হার নির্ধারণ করেছে তা কমানোর সুযোগ এখন আর নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, আগামী ২ বছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যখন আহরণ বাড়বে তখন ক্রমান্বয়ে এ হার কমিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।ভ্যাট আহরণ যখন রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে তখন ক্রমান্বয়ে এ হার ১২ শতাংশে কমিয়ে আনার সুপারিশও করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাজেটের আকার বড় হলেও তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ছে না। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি সম্প্রসারণশীল বা বড় বাজেট নেওয়ার অবস্থা বিদ্যমান। তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে বড় বড় নীতি সংস্কার করতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, প্রতিবছর বড় বাজেট বলে যে কল্পকাহিনি বাজারে ছড়ানো হচ্ছে, তা একধরনের আর্থিক ভ্রম। বাজেট বড় বলা হচ্ছে, কিন্তু বড় নয়। কেননা, কর জিডিপি অনুপাত কিংবা ব্যয় জিডিপি অনুপাত আগের চেয়ে খুব বেশি বাড়েনি। তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে কর আহরণে সফলতা এলেও ব্যয় করার সামর্থ্য বাড়েনি। এটি একটি অদ্ভুত বিষয় বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া নির্বাচনের বছরে সরকারের পক্ষে বড় সংস্কার নেওয়া কঠিন বলে মনে তিনি করেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হয় না বললেই চলে। তিনি প্রশ্ন করেন, বাজেট কি আমলাদের সংখ্যানির্ভর প্রক্রিয়া, নাকি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া? তিনি বলেন, বাজেট প্রণয়নের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা দেখা যায় না। এটি বাজেট-কাঠামোর মৌলিক সমস্যা। এতে কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর কাছে সম্পদ খরচের ক্ষমতা চলে যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ