ঢাকা, মঙ্গলবার 18 April 2017, ৫ বৈশাখ ১৪২৩, ২০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গণপরিবহণে বিশৃঙ্খলা চলছেই যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে

 

স্টাফ রিপোর্টার : সিটিং সার্ভিস-গেটলক বন্ধ করায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়। সিটিং সার্ভিস বন্ধের উদ্যোগে উল্টো যাত্রীদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। লোকাল বাসেও আদায় করা হচ্ছে আগের সিটিং সার্ভিসের মতো অতিরিক্ত ভাড়া। দিনভর এনিয়ে বিভিন্ন রুটে যাত্রী-পরিবহণ শ্রমিকদের মধ্যে হাতাহাতি ও বাগবিতন্ডা ঘটেছে। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে নারী ও শিশুদের। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবহণ সংকট। পর্যাপ্ত বাসের অভাবে যাত্রীদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে যাত্রীদের হেটে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। 

যাত্রীদের অভিযোগ বাস মালিকদের কৃত্রিম সংকটে বাসের পরিমাণ কমে গেছে। এক্ষেত্রে দুর্ভোগ কমাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন অনেকে। তাদের মতে বিআরটিসির বাস এই সময়ে রাজধানীর রুটগুলোতে চোখে পড়েনি। এ সময়ে পর্যাপ্ত পরিবহণ নিশ্চিত করলে পরিবহণ মালিকরা কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ পেতনা। যাত্রীদেরও ভোগান্তি ও হয়রানি অনেকটা কমে যেত। 

সিটিং সার্ভিস বন্ধের আগেরদিনও বাসের সংকট ছিলনা। অন্যদিকে বাস মালিকদের অভিযোগ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের কারণে অনেক পরিবহণ মালিক গাড়ি নামাতে চাইছেন না। রাস্তায় নামলে মামলা ও জরিমানা গুণতে হচ্ছে। 

অতিরিক্ত ভাড়ার আদায়ের ব্যাপারে পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, মালিকের ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে হলে আগের ভাড়াই নিতে হবে। অন্যদিকে যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, এখন অতিরিক্ত ভাড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু ঝামেলাও যুক্ত হয়েছে, যেমন বাস কমেছে, বাসগুলো অকারণে বিভিন্ন বাসস্টপে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলে সময়ক্ষেপণ করছে, এতে অফিসগামী যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে। ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি ও বাগতিন্ডায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে তাদের।

এদিকে, সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে গতকাল সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে বিআরটিএ। বাড়তি ভাড়া আদায়, বাসে সরকার নির্ধারিত কিলোমিটার প্রতি ভাড়ার তালিকা না টানানোসহ নানা কারণে শতাধিক গণপরিবহনের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সকাল থেকে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ, আগারগাঁও, রমনা, মিরপুরসহ মোট পাঁচটি স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিআরটিএ। যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন।

অভিযানের দ্বিতীয় দিন কিছু কিছু গণপরিবহন বাড়তি ভাড়া নেয়া বন্ধ করেছে বলে জানান যাত্রীরা। তবে বেশির ভাগ বাস তাদের সিটিং সার্ভিস তুলে দিলেও ভাড়া আদায় করছে আগের মতোই।

বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ ও বাস মালিক সমিতির নেতারা বলেছেন, গণপরিবহনে যাত্রী হয়রানি বন্ধসহ সব ধরনের অনিয়ম দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেয়াসহ সব রকম নৈরাজ্য দূর করতে পর্যায়ক্রমে জরিমানাসহ শাস্তির মাত্রা বাড়ানো হবে বলেও জানানা তারা।

বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, একটি বাসে ভাড়া অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। তার ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া আরেকটি বাসে ভাড়ার চার্ট (তালিকা) টানানো না থাকায় পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহসাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ন কবির বলেন, নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত অভিযান চলবে। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সপ্তাহে তিন দিন অভিযান পরিচালনা করা হবে। আর বিআরটিএ নিয়মিত অভিযান চালাবে।

ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডা

কারওয়ান বাজারে হাজি পরিবহনের বাস থেকে নামা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যাত্রী সকালে জানান, তিনি মিরপুর-১২ থেকে কারওয়ান বাজারে আসেন প্রতিদিন। আজও আগের টাকাই নিয়েছে বাস কর্তৃপক্ষ। তবে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে যারা এসেছেন, তাঁদের দুই টাকা কম দিতে হয়েছে। কিন্তু আগে বাস যে সময়ে কারওয়ান বাজার আসত, আজ এর থেকে ১৫ মিনিট বেশি সময় লেগেছে। কারণ, বাস বিভিন্ন স্টপে থেমেছে এবং যাত্রী তুলেছে। তিনি আরো জানান, বাসে ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের কথা কাটাকাটি হচ্ছে। সকাল বেলায় অফিস যাওয়ার পথে এটা আরেকটা ঝামেলা।

সিটিং সার্ভিস লোকাল হওয়ার পরও ভাড়া না কমানোয় যাত্রীদের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে শনির আখড়া থেকে মোহাম্মদপুর রুটের মেসকাত পরিবহনের পরিবহণ শ্রমিকদের। সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার আগে এই বাসে মতিঝিল থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ভাড়া ছিল ১০ টাকা। লোকাল হওয়ার পর আসনের বেশি যাত্রী উঠবে, তাই ভাড়া কমবে এটাই ছিল অনুমেয়। কিন্তু উল্টো এই গন্তব্যে চালকের সহকারী ভাড়া দাবি করে ১২ টাকা। এসময় অতিরিক্ত ভাড়া দিতে অস্বীকার করেন যাত্রীরা। তারা একযোগে প্রতিবাদ করলে সুর নরম হয় বাসের সহকারীর। বাসের সহকারীর জানায় মালিক কয়া দিছে, আগের ভাড়া নিতে, আমরা কী করুম?।

রাজধানীরে উত্তরা থেকে মতিঝিলগামী একটি বাসে উঠলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রেজাউল হোসেন নামবেন মগবাজারে। এই বাসটি দুই দিন আগেও চলতো সিটিং হিসেবে। তখন তিনি ভাড়া দিতেন পুরো পথের। কিন্তু এখন বাসটি লোকাল হয়েছে, চালকের সহকারী দাবি করলেন আগের মতই পুরো পথের ভাড়াই দিতে হবে।

এ নিয়ে কথা কাটাকাটি। রেজাউল প্রতিবাদ করায় তার পক্ষ নিলেন বাসের আরেক যাত্রী। কিন্তু সহকারী অনঢ়, ভাড়া দিতে হবে পুরো পথেরই। তিনজনের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তা গড়ায় হাতাহাতিতে। পরে বাসের আরেক যাত্রীর মধ্যস্থতায় বিষয়টি সমাধান হলেও দুই যাত্রীকেই গুণতে হয় সিটিং সার্ভিসের মতই ৪০ টাকা।

 রেজাউল হোসেন বলেন, সিটিং সার্ভিস লোকাল হওয়ার মাজেজা বুঝলাম না। ঘাড়ের ওপর যাত্রী তুলছে, আবার মাস্তানি করে ভাড়া নিচ্ছে পুরো পথের, এটা কোন ধরনের লোকাল? সরকার কি পরিবহন খাতের লোকদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না? তাহলে এই পরিবর্তন কেন হল?।

ভাড়ার চার্ট নেই কোনো বাসে 

গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি কমাতে গত ১৫ এপ্রিল থেকে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধ করে দেয় ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি। বিআরটিএ নির্ধারিত চার্ট অনুসরণ করে ভাড়া আদায়ের কথা বলে মালিক সমিতি। কথা ছিল সেই ভাড়ার তালিকা বাসের ভেতর দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখা হবে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মালিক সমিতির পক্ষ ভিজিলেন্স টিমকে রাস্তায় দেখা গেলেও তাদের ঘোষণাকে তোয়াক্কা করছেন না বাসের চালক-সহকারীরা। অতিরিক্ত যাত্রী উঠালেও অধিকাংশ বাসে নেয়া হচ্ছে সিটিং সার্ভিসের ভাড়া। এ নিয়ে অনেক যাত্রীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

সকালে শতাব্দী পরিবহনের লোকাল বাসে উত্তরা থেকে মগবাজারের ভাড়া নেয়া হয় ২০ টাকা। কিন্তু আগে সিটিং হিসেবে চলা শতাব্দী পরিবহন তার কাছে লোকালের ভাড়াই চায় ৪০ টাকা। শতাব্দী পরিবহনের মতো আরও কয়েকটি বাসে উঠে একই চিত্র দেখা গেছে। প্রায় প্রতিটি বাসেই শ্রমিকদের সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে জড়াচ্ছেন অনেক যাত্রী। বাসে যেন সঠিক ভাড়া নেয়া হয় এজন্য যাত্রীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে বলছেন।

ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য চলছে, সেটা মানছেন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। এ বিষয়ে তার জবাব দায়সারা। তিনি বলেন, কিছু সমস্যা আছে, এগুলো দেখতেই আমরা মাঠে নেমেছি, আশা করি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।

বাস সংকট

গত রোববারের মতো গতকালও রাজধানীতে গণপরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। বাস চালকরা বলছেন সিটিং সার্ভিস বন্ধ করায় মালিকরা ইচ্ছা করেই রাস্তায় কম গাড়ি নামিয়েছেন। তবে সিটিং সার্ভিসের নামে যাত্রী হয়রানি বন্ধে বিআরটিএ অধীনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলার কারণেই মালিকরা রাস্তায় কম গাড়ি নামিয়েছেন বলে মনে করেন যাত্রীরা। ফলে বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে অনেককে। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, মুগদা, মতিঝিল, পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

যাত্রাবাড়ী মোড়ে সকাল ৯টার দিকে যাত্রীদের প্রচন্ড চাপ ছিল। কিন্তু পরিবহন ছিল হাতেগোনা। ফলে অফিসগামীদের অনেকটা যুদ্ধ করেই গাড়িতে উঠতে হয়েছে। সকাল পৌনে ১০টার দিকে প্রায় গাড়িশূন্য হয়ে পড়ে যাত্রাবাড়ী মোড়। গাড়িতে উঠতে না পারায় মতিঝিল-গুলিস্থান এলাকার যাত্রীদের অধিকাংশই গন্তব্যের উদ্দেশে হেঁটে রওনা দেন।

গাড়ি কমে যাওয়ায় পরিবহণ মালিকদের উদ্দেশ্যে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান বলেছেন, কোনো পরিবহন কোম্পানি তাদের গাড়ি বন্ধ রাখলে রুট পারমিট বাতিল করে দেয়া হবে। তারা গাড়ির রুট পারমিট নিয়েছে যাত্রীদের সেবা দেয়ার জন্য। এখন যদি কেউ গাড়ি বন্ধ করে দিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি সৃষ্টি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। তাদের রুট পারমিট বাতিল করা হবে।

সড়কে বাস কম থাকার কারণ জানতে চাইলে বসুমতি পরিবহনের পরিচালক খন্দকার মনির আহমেদ বলেন, বিভিন্ন পরিবহনের কর্মীদের সঙ্গে যাত্রীদের ঝামেলা হওয়ায় চালকরা গাড়ি চালাতে চাইছেন না।

গত রোববার মারামারির পর অনেক ড্রাইভার আজ বের হয় নাই। সকালেও কয়েকটা বাসে মারধরের ঘটনা ঘটছে। ভাড়া কম পাওয়ায় অনেকে গাড়ি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি তাদেরকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে গাড়িতে নিয়ে আসার। যাত্রীদেরকেও বলছি, ভাড়ার চার্ট অনুযায়ী ভাড়া দেন। বেশিও দিয়েন না, কমও দিয়েন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ