ঢাকা, মঙ্গলবার 18 April 2017, ৫ বৈশাখ ১৪২৩, ২০ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে

বিএনপি নেতা ইলিয়াছ আলী নিখোঁজের ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল সোমবার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে সিলেট বিভাগ সংহতি সম্মিলনী ও আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নিরপেক্ষ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনেই ক্ষমতাসীনদের জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। এই দাবি শুধু বিএনপির একার নয়। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এমনকি বিদেশীরা সবার অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাই সরকারকে সবার এই দাবি মেনে নিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবেই, দিতে হবে। একইসাথে তিনি বলেন, আমরা যদি নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি এবং সমস্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি তাহলে এই অপশক্তি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে সিলেট বিভাগ সংহতি সম্মিলনী সংগঠন আয়োজিত বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর মহাখালী এলাকা থেকে গাড়িচালকসহ গুম হন বিএনপির এই নেতা। তাকে সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করছে বিএনপি। 

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি কাউয়ূম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মজিবুর রহমান সরোয়ার, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দিলদার হোসেন সেলিম, কলিম উদ্দিন মিলন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এনাম আহমেদ চৌধুরী, আব্দুস সালাম আজাদ, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, মীর সরফত আলী সপু, শিরিন সুলতানা, সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু, শফিউল বারী বাবু, আব্দুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, হাবিবুর রশিদ হাবিব, সুলতানা আহমেদ, হেলাল খান, ছাত্রদলের সভাপতি রাজীব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, সহ-সভাপতি এমজল হোসেন পাইলট প্রমুখ। এ সময় ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহমিনা রুশদি লুনা উপস্থিত ছিলেন।

ইলিয়াস আলী গুমের ৫ বছরপূর্তিতে মির্জা ফখরুল বলেন, ইলিয়াস আলীর শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। এই সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী যেদিন গুম হয়ে যান, নিখোঁজ হয়ে যান সেদিন সকলের কাছে খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ ছিল না। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে এবং আশপাশে যে সমস্ত লোকজন ছিল তারাও পরিষ্কার করে বলেছিল, ইলিয়াস আলীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। অথচ সরকারের লোকেরা তা অস্বীকার করেছে। তার সহধর্মিনী স্বামীকে খুঁজে পাবার আশায় প্রায় সকলের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন। এমনকি ছোট্ট মেয়েটাকে সাথে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছেও গিয়েছেন। কিন্তু এখনও ফিরে পাননি।

মির্জা ফখরুল বলেন, শুধু এক ইলিয়াস আলী নয়, হিসাব মতে ২ হাজারের অধিক মানুষ গুলীবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে, ৫ শ’রও অধিক ইলিয়াস আলী গুম হয়ে গেছে। এই ঢাকা মহানগরে প্রায় ৫০ জন নেতাকর্মী এবং সারা দেশে ৫ শতাধিক নেতাকর্মী গুম হয়ে গেছে। অনেকে পঙ্গু হয়ে গেছে, মামলা আর আসামীর তো কোনো সংখ্যাই নাই। জানি না এরা কবে আসবে, নাকি আসবে না। সরকার এখনও অস্বীকার করে। কিন্তু একথা প্রমাণ হয়ে গেছে যে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে কোনো খবর নেই।

কিছুটা আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যথা, বেদনা ভুলে যাবার নয়। কিন্তু এ ব্যথা, আমাদের নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। কেন জানি না আজকে আমরা বার বার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি। একটি গণবিচ্ছিন্ন সরকার যাদের কোনো নৈতিক অধিকার নেই ক্ষমতায় টিকে থাকার। অথচ তারা ক্ষমতায় টিকে আছে? এই জায়গাগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। জনগণের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে এবং তাদেরকে পরাজিত করতে হবে।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে আমরা (বিএনপি) অনেক শক্ত অবস্থান নিতে পারতাম। তিনি গুম হওয়ার পর অবরোধ দিয়েছিলাম যা অত্যন্ত সফল অবরোধ হয়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে থেমে গেলো। এটা হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ তা থেমে গেছে। তারপরও কার্যকর হতো যদি আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বিষয়ে বারবার আঘাত করতাম, তাগিদ দিতে পারতাম তাহলে ইলিয়াস আলীকে পাই, না পাই- সরকারের মুখোশ আন্তর্জাতিকভাবে উন্মোচিত করা হতো। এ সময় তিনি আয়োজক সংগঠনের নেতাকর্মীদের বলেন, ইলিয়াস আলী প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন, বিএনপি পাশে থাকবে।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এখানে উপস্থিত অনেকেই সিনিয়র নেতা যখন বক্তব্য দিচ্ছেন তখন আমরা উত্তর-দক্ষিণ বলে স্লোগান দিচ্ছি। এটা কেন? এই যে একটা অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এটাকে পরিহার করুন। বিএনপিতে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম বলতে কিছু নেই। বিএনপি তো একটাই। আজকে আমার খুব কষ্ট হয়েছে যে, যাকে উপলক্ষ করে এই আলোচনা সভা তার নামে কোনো স্লোগান শুনিনি এবং তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য কোনো দাবি কারো মুখ থেকে শুনিনি। এটা খুব দুঃখজনক।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, সম্প্রতি আমি খালেদা জিয়ার নির্দেশে নেত্রকোনা জেলাধীন হাওর অঞ্চলের মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে মানুষের যে আবেগ দেখেছি তাতে করে আমার কাছে এখন বিশ্বাস জন্মে গেছে যে, আমরা যদি নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি এবং সমস্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি তাহলে এই অপশক্তি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। ফখরুল বলেন, আসুন এই কষ্টের দিনে শপথ গ্রহণ করি- যেকোনো মূল্যে আমাদের গণতন্ত্র ও অধিকারকে ফিরিয়ে আনবো। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করবো।

এই সরকার জনস্বার্থে কিছু করবে না মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন। তারা তিস্তার পানি আনবে না। আনার ক্ষমতা নেই তাদের। তাদের গণভিত্তি নেই। ভারতের সাথে দরকষাকষির ক্ষমতা নেই। তিনি বলেন, আজকে যখন ভারত সরকার বলে তিস্তা চুক্তি হবে না, তখন তো উনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) বলতে পারতেন আমিও অন্যান্য চুক্তি করবো না। সে কথা তিনি বলেননি। তার সেই শক্তি নেই। বরং তিনি নতজানু হয়ে অন্যান্য সকল চুক্তি স্বাক্ষর করে এসেছেন। তিনি বলেন, আমি স্পষ্ট করে বলছি- নতজানু এই সেবাদাস সরকার দিয়ে জনগণের সমস্যা সমাধান হবে না। আমাদের ন্যায্য হিস্যা পাবো না। গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো পাবো না, এই জন্য যে, তারা জনবিচ্ছিন্ন। তারা জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। তাই জনগণের শক্তি দিয়ে তাদেরকে পরাজিত করতে হবে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ইলিয়াস আলী আছেন, ফিরে আসবেন। আসুন তার পথকে অনুসরণ করে বিপ্লবী চেতনায় আন্দোলনে যাই এবং সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের অধিকার ফিরিয়ে নিয়ে আসি।

গুম খুনের হিসেব দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে হিসাব মতে, এ পর্যন্ত রাজধানীতে ৫০ জনসহ সারা দেশে বিএনপির ৫ শ’র বেশি নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে। কিন্তু সরকার এখনও এবিষয় অস্বীকার করছে। কিন্তু প্রমাণ হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এদেরকে তুলে নিয়ে গিয়েছে।

মির্জা আব্বাস বলেন, ইলিয়াস গুম হওয়ার পর কেমন যেন কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না, এমনকি কেউ কারোর কাছে আসছে না। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিএনপি করলেও যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার তারা এক হচ্ছে না। তাদের মধ্যে রয়েছে বিভক্তি, এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমরা চলন্ত ট্রেনের একটি কামরায় আছি। একে অপরের দিকে তাকাই না। এমনকি কেউ যেন কাউকে চিনি না। সকাল হলেই দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ট্রেন থেকে নেমে পড়ছি। আমরা কেউ কাউকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছি না, সহযোগিতাও করছি না। জাতীয়তাবাদী শক্তির সুবিধাবাদী চরিত্র পরিহার করতে হবে মন্তব্য করে গয়েশ্বর বলেন, সবাই সবাইকে সন্দেহ করে। কিন্তু জাতীয়তাবাদী আর সুবিধাবাদী একসঙ্গে চলতে পারে না। ঈমানদার আর বেঈমান একসঙ্গে চলতে পারে না। আমাদের এই চরিত্র পরিবর্তন করতে হবে। আমরা ঐক্যবদ্ধ হলেই এই অনাচার থেকে মুক্তি পেতে পারবো।

মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আমাদের দলে ছোট ছোট অনেকগুলো আইলের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে উত্তরবঙ্গের শুষ্ক মওসুমের জমির মতো ফাটল ধরেছে। আমাদের মধ্যে অসংখ্য গ্রুপ, বিভক্তি। যে কারণে ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়ার জন্য কোন ভূমিকা রাখতে পারছি না। আলাল বলেন, আমি দেখছি বিএনপির জনসমর্থন যতো বাড়ছে সাংগঠনিক দুর্বলতা ততো বাড়ছে। আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও আমি এই সত্য কথা বলবো। এটি সত্য। অস্বীকার করার কিছু নেই। এতসব ফাটল হলে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়ার আন্দোলন করতে পারবো না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ