ঢাকা, বুধবার 19 April 2017, ৬ বৈশাখ ১৪২৩, ২১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৬ বছরে লোকসানের ৪০ হাজার কোটি টাকা মওকুফ চায় পিডিবি

কামাল উদ্দিন সুমন : বেশি দামে কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুৎ কিনে বছরের পর বছর লোকসানে থাকা সরকারি সংস্থা পিডিবি এখন ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ মওকুফের আবেদন করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি এই আবেদন করা হয় অর্থমন্ত্রির কাছে।

ঋণ মওকুপের বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, বিভিন্ন বিদেশী বেসরকারি ব্যাংক ও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে পিডিবি বেশকিছু নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। তারা বিশাল অঙ্কের ঋণের কারণে পিডিবির বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। এছাড়া সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পিডিবির এ ঋণের বোঝায় চাপা পড়তে হয়েছে। তাই এ ঋণকে ভতুর্কি বা মওকুফের দাবি জানানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমদামে কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ থাকার পরও বেশি দামের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় করে যাচ্ছে পিডিবি। এতে করে একদিকে লোকসানের পাল্লা যেমন বাড়ছে তেমনি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে গ্রাহকদের বারবার পকেট কাটার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। গত ৬ বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুণেছে পিডিবি। আর আরেকদফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। ইতোমাধ্যে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসিতে দেয়া হয়েছে। 

পিডিবির ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র সামিট থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ২০ টাকা দরে কিনেছে পিডিবি। মেঘনা ঘাটে অবস্থিত এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। 

সূত্র জানায়, একই জ্বালানি উপকরণের কোনো কেন্দ্র ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম ৩ টাকা। কোনো কেন্দ্রে আবার ১৬ টাকা। ইফনিটপ্রতি ২০ টাকাও পড়ছে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কোনো কোনো কেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম। যদিও বেশি দামের এসব কেন্দ্র থেকেই বেশি বিদ্যুৎ কিনছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এতে একদিকে পিডিবির ক্ষত বাড়ছে, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হচ্ছে গ্রাহকের ওপর।

পিডিবির সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ১৫টি বেসরকারি কেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড় দাম ১১ টাকা ৬৭ পয়সা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেডের বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি ২০ টাকা ৪০ পয়সা। এ কেন্দ্র থেকেই গত অর্থবছর সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কিনেছে পিডিবি। জ্বালানি সেক্টরে দায় মুক্তি বিশেষ আইনের কারণে পিডিবির এমন স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে কেউ মুখ খুলতে পারেনি।

এদিকে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক এসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। এতে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। 

ঘাটতি মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর ঋণ নিচ্ছে পিডিবি। গত ৬ বছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। সুদসহ এ ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তবে লোকসানের কারণে সে ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি পিডিবি। এজন্য ঋণ মওকুফ চাচ্ছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে এ-সংক্রান্ত চিঠি দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। গত সপ্তাহে পাঠানো এ চিঠিতে পিডিবির ঋণকে সরকারের ইকুইটি বা ভর্তুকিতে রূপান্তরের দাবি জানানো হয়।

মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে ,পিডিবিকে সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া হয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে। ঘাটতি পূরণে সংস্থাটি সে বছর আট হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা ঋণ নেয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আর গত অর্থবছর দুই হাজার ৭৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। এছাড়া ২০১২-১৩ অর্থবছরে চার হাজার ৪৮৬ কোটি ২৪ লাখ, ২০১১-১২তে ছয় হাজার ৩৫৬ কোটি ৬৯ লাখ, ২০১০-১১তে চার হাজার কোটি, ২০০৯-১০তে ৯৯৩ কোটি ৭৬ লাখ, ২০০৮-০৯ তে এক হাজার ছয় কোটি ৭৩ লাখ টাকা ঋণ নেয় পিডিবি।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দেশের একটি বৃহৎ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার অনুপাতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, গ্রাহকসেবার মান উন্নত করার লক্ষ্যে বিউবোকে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখা ও নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসহ উৎপাদন এবং বিতরণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য সরকার কর্তৃক বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে এককভাবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আপনার আন্তরিকতা ও সঠিক নির্দেশনার ফলে বিদ্যুৎ খাতে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, যার সুবিধা আপামর জনসাধারণ ভোগ করছে এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, বেসরকারি খাতে স্থাপিত আইপিপি ও রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে একক ক্রেতা হিসেবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড অধিক মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় করে বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে ডিপিডিসি, ডেসকো, ওজোপাডিকো ও আরইবির কাছে বিক্রয় করায় ক্রয়-বিক্রয়জনিত ঘাটতির বিপরীতে এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার হতে প্রাপ্ত ঋণ ও তার সুদসহ মোট ২৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা পিডিবিকে সরকারের ইকুইটিতে রূপান্তরের জন্য এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়। বর্তমানে সুদসহ ঋণের পরিমান প্রায় ৪০হাজার কোটি টাকা ভুতর্কি হিসেবে দেখানোর আবেদন করা হয়। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী এডিপির আওতায় সরকার পিডিবিকে যে অর্থ প্রদান করে, তা ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ৪০: ৬০ রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী পিডিবির ঋণ-ইকুইটি অনুপাত ১১৪: (১৪)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী তা ৪০:৬০-এ উন্নীত করার লক্ষ্যে বিউবোর ঋণকে ইকুইটিতে রূপান্তর করা দরকার।

এ অবস্থায় ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় ঘাটতি বাবদ প্রদত্ত ঋণকে সুদসহ ইকুইটিতে রূপান্তর বা বিইআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী, সরাসরি ভর্তুকি প্রদানের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানের জন্য অর্থমন্ত্রির দ্বারস্থ হয় বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। 

পিডিবির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক এনইপিসি বাংলাদেশ লিমিটেড, হরিপুর কেন্দ্রের প্রতি ইউনিটের দাম ছিল গত অর্থবছর ১৫ টাকা ৭২ পয়সা। এ কেন্দ্র থেকেই ওই অর্থবছর চতুর্থ সর্বোচ্চ ৩২ কোটি ৮৫ লাখ ৭ হাজার ৫০০ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনে পিডিবি। এজন্য কোম্পানিটিকে পিডিবি পরিশোধ করে ৫১৬ কোটি ৫৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।

ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেশি দামের আরেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আরপিসিএল ৫২ মেগাওয়াট গাজীপুর কেন্দ্র থেকে গত অর্থবছর ২২ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৭২ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনে পিডিবি। যদিও এ কেন্দ্রটির বিদ্যুৎতের দামও তুলনামূলক বেশি প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫২ পয়সা।

এছাড়া রাজ লংকা পাওয়ার লিমিটেডের কাছ থেকে গত অর্থবছর প্রতি ইউনিট সাড়ে ১৬ টাকা দরে ১৮ কোটি ৫৭ লাখ ৯৬ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ কেনে পিডিবি। এর বিপরীতে কোম্পানিটিকে পরিশোধ করা হয় ৩০৬ কোটি ৬২ লাখ ৩২ হাজার টাকা। অথচ ২ টাকা ৪৫ পয়সা ও ২ টাকা ৭৪ পয়সা দরে ডরিন পাওয়ারের দুটি কেন্দ্র থেকে ২৮ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয়ে খরচ হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী বিডি রহমত উল¬াহ বলেন, দরপত্র ছাড়াই ওয়ান টু ওয়ান পদ্ধতিতে বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়। এর সঙ্গে সংশি¬ষ্ট কর্মকর্তাদের স্বার্থ জড়িত। এ কারণে কম দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেশি দামে কেনা হয়। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তাই দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা উচিত। পিডিবি এভাবে বেশি দামে বিদু্যুৎ কিনে দেনার দায় বাড়িয়েছে। এখন সে দেনা মওকুপ চাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ