ঢাকা, বুধবার 19 April 2017, ৬ বৈশাখ ১৪২৩, ২১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদেশী ঋণের এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি অলস টাকার সুদ দিচ্ছে জনগণ

স্টাফ রিপোর্টার : বিদেশী ঋণের অর্থ খরচ করছে না সরকার। বিভিন্ন অজুহাতে এই অর্থ অলস ফেলে রাখারও অভিযোগ উঠেছে। বিদেশী ঋণের অর্থ খরচে কোন প্রকার কমিশন বা নয়ছয় করার সুযোগ না থাকায় এই অর্থ অলসই পড়ে থাকছে। অন্যদিকে টাকা অলস পড়ে থাকলেও এর সুদ গুণতে হচেছ দেশের সাধারণ জনগণকেই। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিদেশী ঋণের অলস অর্থের পরিমাণ এখন দুই হাজার ২০৬ কোটি মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় যারা পরিমাণ এক লাখ ৭৬ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। 

সূত্র জানায়,রাষ্ট্রীয় তহবিলের টাকা খরচের বেলায় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যতটা উৎসাহ-আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখা যায়, বিদেশী ঋণের টাকা খরচের ক্ষেত্রে ততটা দেখা যায় না। কারণ বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা নয়ছয় করা কঠিন। তাদের প্রতিটি নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়, কেনাকাটাতেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়। 

আর এভাবেই বিদেশী ঋণের অব্যবহৃত টাকা জমতে জমতে অলস টাকার পাহাড় গড়ে ওঠে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। মাঝখান দিয়ে সরকারকে গুণতে হয় বাড়তি ঋণের সুদ। আর এই সুদের বোঝা গুণতে হচ্ছে জনগণকেই

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে গত সপ্তাহে প্রকাশিত ‘ফ্লো অব এক্সটারনাল রিসোর্স’ রিপোর্ট থেকে জানা যায়, উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে করা চুক্তির পর এখন দুই হাজার ২০৬ কোটি ডলার অব্যবহৃত পড়ে আছে; বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ এক লাখ ৭৬ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা (এক ডলার সমান ৮০ টাকা ধরে)। বহুজাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকা অব্যবহৃত আছে বিশ্বব্যাংকের। এরপর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি)। আর একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি অলস টাকা পড়ে আছে জাপানের। এর পরে আছে ভারত।

এত টাকা পড়ে থাকা সত্ত্বেও তা খরচ করতে পারে না সরকার। প্রতি অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে বাজেট সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত দিয়ে সরকারি তহবিল থেকে বাড়তি বরাদ্দ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

সূত্র আরো জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম দিকে খাদ্য ও পণ্য বাবদ বিদেশীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া গেলেও এখন আর সেই সহযোগিতা আসছে না। এখন অর্থায়ন আসছে মূলত প্রকল্প বাস্তবায়ন ঘিরে। ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, খাদ্য ও পণ্য সহযোগিতা না আসার অর্থ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতির প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক কোনো কারণে এত বিশাল পরিমাণ টাকা জমা হয়নি। অনেক কারণে পাইপলাইনে অব্যবহৃত টাকার পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে সরকারের; বিশেষ করে চীন থেকে কঠিন শর্তের ঋণের পরিমাণ। কিন্তু ঋণ নেওয়ার হার বাড়লেও সে হারে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে অব্যবহৃত টাকার পরিমাণ বেড়েছে। অনেক সময় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। ওই সময় মাঠপর্যায়ে কাজ না হওয়ার কারণে উন্নয়ন সহযোগীদের টাকাও খরচ হয়নি। তা ছাড়া বিদেশীদের টাকা খরচ করতে গিয়ে অনেক নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয়। এত সব নিয়ম অনুসরণ করতে গিয়ে অনেক সময় অপচয় হয়। ঢাকায় উন্নয়ন সহযোগীদের যেসব কার্যালয় রয়েছে, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। তাদের তাকিয়ে থাকতে হয় নিজ নিজ দেশের সদর দপ্তরের দিকে। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করার কারণেও কাক্সিক্ষত হারে বৈদেশিক ঋণ খরচ হয় না। পাশাপাশি বিদেশীদের ক্রয়নীতিও অত্যন্ত ধীরগতির।

‘ফ্লো অব এক্সটারনাল রিসোর্স’ বই পর্যালোচনা করে আরো দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে বাংলাদেশ ছয় হাজার ৯১৫ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা পেয়েছে, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। অবশ্য প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল আরো বেশি-৯ হাজার ৯১৯ কোটি ডলার। এর মধ্যে পাইপলাইনে জমা আছে দুই হাজার ২০৬ কোটি ডলার। বাকি ৭৯৮ কোটি ডলার স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রত্যাহার করে নিয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। ইআরডি সূত্র বলছে, গত এক বছরের ব্যবধানে অব্যবহৃত টাকা বেড়েছে ৪০০ কোটি ডলার; টাকার অঙ্কে ৩২ হাজার কোটি টাকা। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে পাইপলাইনে অব্যবহৃত ছিল এক হাজার ৮৬৯ কোটি ডলার। ২০১৬ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২০৬ কোটি ডলার।

উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ কাক্সিক্ষত হারে খরচ কেন হয় না জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কর্মদক্ষতার মারাত্মক অভাব আছে। ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়লেও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়েনি। তা ছাড়া এখানে কোনো প্রণোদনা নেই। ভালো কাজ করলে প্রণোদনা এবং খারাপ কাজ করলে শাস্তি-এ ধরনের কোনো প্রথা নেই। ফলে সবার মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করে। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদেরও সমস্যা আছে। ঢাকায় উন্নয়ন সহযোগীদের যেসব কার্যালয় আছে, তাদের সিদ্ধান্তের জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় সদর দপ্তরের দিকে। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়মকানুন অনেক কড়া। কেনাকাটায় তাদের অবস্থান অত্যন্ত শক্ত। এসব কারণে মন্ত্রণালয়গুলো বিদেশীদের টাকা খরচে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না; যার ফলে অব্যবহৃত টাকার পরিমাণ বাড়ছে। ’

ইআরডি সূত্র বলছে, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকা অব্যবহৃত আছে ওয়াশিংটনভিত্তিক বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংকের। সংস্থাটির এখনো ৫৩৮ কোটি ডলার অলস পড়ে আছে, বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর পরের অবস্থানে আছে এডিবি। ম্যানিলাভিত্তিক সংস্থাটির অব্যবহৃত আছে ৩৪৪ কোটি ডলার বা সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা। এরপরে আছে যথাক্রমে আইডিবি ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর। আর একক দেশের মধ্যে বেশি টাকা পড়ে আছে জাপানের-৫৪৩ কোটি ডলার। এরপরে আছে ভারতের ২৫৭ কোটি ডলার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ