ঢাকা, বুধবার 19 April 2017, ৬ বৈশাখ ১৪২৩, ২১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কাশ্মীরজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে আহত শতাধিক ছাত্র-যুবক

১৮ এপ্রিল, পিটিআই/ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস/ দ্য হিন্দু : কলেজে পুলিশি অভিযানের বিরুদ্ধে গত সোমবার প্রতিবাদ জানান কাশ্মীরের ছাত্র-যুবরা। পুলিশ ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরজুড়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন শতাধিক।
গত সোমবার শ্রীনগরের প্রধান এলাকাগুলোয় শিক্ষার্থীরা ইউনিফর্ম পরে বিক্ষোভে অংশ নেয় এবং বিক্ষোভ ধীরে ধীরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ প্যালেট, কাঁদুনে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।
শনিবার পুলওয়ামার একটি কলেজে এক সন্দেহভাজনের সন্ধানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে পুলিশ। কলেজ চত্বরেই সংঘর্ষে আহত হয়েছিলেন প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী। পুলিসের দাবি, কলেজে লুকিয়ে আছে সম্প্রতি শ্রীনগর লোকসভা উপ-নির্বাচনের সময় সহিংসতা সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তি। তবে পুলওয়ামা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জানান, এক সেনা কর্মকর্তা কলেজে একটি সমাবেশ করতে চেয়েছিলেন। আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের আক্রমণ করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। ছাত্রছাত্রীদের উপর লাঠিচার্জ ও হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালানোরও অভিযোগ উঠেছে পুলিসের বিরুদ্ধে।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে সাজাদ হুসেইন শেখ নামের ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এ সম্পর্কে ভারতীয় পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘কোন পরিস্থিতিতে সাজাদ হুসেইন শেখ নামের ওই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
তার পর থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশের ওই অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন ছাত্র-ছাত্রীরা। তাদের দাবি, বিশেষ অনুমতি ছাড়া শিক্ষাঙ্গনে পুলিশ প্রবেশ করতে পারে না। তারই প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকেই ত্রাল ও সোপোরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন ছাত্রছাত্রীরা। তাতে যোগ দেন কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় এবং শ্রীনগর উইম্যান’স কলেজের ছাত্রীরাও।
এক বিবৃতিতে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বলেছে, ‘এখানে আমরা নিপীড়নের সম্মুখীন। এক বছর থেকে আমরা নিপীড়িত হচ্ছি। আমরা আর এ নিপীড়ন সহ্য করব না।’
শ্রীনগরে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি ও উইম্যান’স কলেজসহ উপত্যকার অন্তত চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের অনুপ্রবেশ নিয়ে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি। তবে এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধী দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ওমর আবদুল্লাহ। ধারাবাহিক টুইটে এ ঘটনায় সরকারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।
এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কাশ্মীরের ক্ষমতাসীন দল পিডিপিও।
এ ঘটনায় কাশ্মীরের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিল নিষিদ্ধ ঘোষষিত ছাত্র সংগঠন কাশ্মীর ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন।
পুলওয়ামার ছাত্ররা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সেনারা ওই এলাকায় ভারত-বিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছাত্রছাত্রীদের আটক করতে কলেজটিতে অভিযান চালায়। এসময় সেনারা ছাত্রদের লক্ষ্য করে ছররা ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে।
শ্রীনগর লোকসভা উপনির্বাচন থেকেই নতুন করে উত্তেজনা মাথাচাড়া দিয়েছে উপত্যকায়। নির্বাচন বয়কটের ডাক দেন স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত সংগঠনগুলোর জোট হুরিয়ত কনফারেন্স। উপনির্বাচনের দিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৮ জনের মৃত্যু হয়। একাধিক জায়গায় সংঘর্ষ হয়। ওই উপনির্বাচনে ভোট পড়ে মাত্র সাড়ে ছয় শতাংশ। প্রায় ১০০ পুলিশ সদস্য আহত হন।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে ছররা গুলি বা পেলেট গানের বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক বুলেট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। উপত্যকার বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমন করতে এই প্লাস্টিক বুলেটই এখন প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ব্যবহার করা হবে বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই হাজার খানেক প্লাস্টিক বুলেট কাশ্মিরে পাঠানো হয়েছে। এগুলো শরীরের ভেতরে প্রবেশ করবে না বলেই দাবি করা হয়েছে। তবে ইনস্যাস রাইফেলেও ব্যবহার করা যাবে।
শীর্ষ আদালতের নির্দেশ মেনেই পেলেটের বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক বুলেট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। তবে প্রয়োজন পড়লে পেলেট গানও তারা ব্যবহার করবে বলে জানা গেছে। 
পেলেট গান ব্যবহার বন্ধ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন কাশ্মীর হাইকোর্টের আইনজীবীরা। তাদের দাবি, জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে সেনাবাহিনী যে পেলেট গান ব্যবহার করছে তাতে প্রাণহানি হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই কিশোর। অনেক কিশোর-যুবার চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চও কাশ্মীর উপত্যকায় বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শিশু-কিশোরদের আঘাত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
২০১৬ সালেই কেন্দ্রকে ছররা বন্দুকে নিয়ন্ত্রণ আনার নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। তার বিকল্প সন্ধানেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ মেনেই প্লাস্টিক বুলেট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি উপত্যকায় জনরোষে বিভিন্ন সময়ে পাথরবৃষ্টির মুখে পড়তে হচ্ছে সেনাবাহিনীকে। এই বিক্ষোভ মোকাবিলায় প্লাস্টিক বুলেট কতটা কার্যকরী হয় তা ব্যবহারের পরেই জানা যাবে। তবে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে ছররা বন্দুক ব্যবহার করা হবে বলেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে। আগে ছররা বন্দুকের পাশাপাশি পাভা শেলও ব্যবহার করতো সেনাবাহিনী। পাভা শেলে মরিচের গুঁড়ো থাকে। এটি ফাটানোর সঙ্গে সঙ্গে চোখ জ্বালা করতে থাকে। ফলে সহজেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন উত্তেজিত জনতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ