ঢাকা, বুধবার 19 April 2017, ৬ বৈশাখ ১৪২৩, ২১ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে নতুন আতঙ্ক পানিতে ফসলের পঁচন-মাছের মড়ক

মহসিন রেজা মানিক, সুনামগঞ্জ থেকে : হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির কারণে আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল পরিদর্শন করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ। তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে গতকাল মঙ্গলবার সকালে তিনি সুনামগঞ্জ ত্যাগ করেন। সফরকালে ল’ল্যান্ডে হেলিকপ্টার থেকে জেলার তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা দিরাই শাল্লা, ছাতক, জগন্নাথপুর ও কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিটামইন, বানিয়াচং উপজেলার তলিয়ে যাওয়া হাওরগুলি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন তিনি।
এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি গত সোমবার রাত ১০টায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজনের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বলেন, সুনামগঞ্জে হাওরে কান্না শুরু হয় আর কিশোরগঞ্জ গিয়ে তা শেষ হয়। নিজেকে কিশোরগঞ্জের কৃষক পরিবারের সন্তান উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাওরবাসীর কান্নার আওয়াজ আমি শুনতে পাই। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সুনামগঞ্জে এসেছিলাম আজ (সোমবার) আবার সুনামগঞ্জের দুর্যোগের সময়ে আপনাদের পাশে এসে দাড়িয়েছি। আমার এই আসা সুনামগঞ্জের কিছুটা হলেও উপকারে আসবে।
যুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে কাজ করার সময় ৪ দিন না খেয়ে ছিলাম পরে আব্দুজ জহুরের (সাবেক সংসদ) বাড়িতে সুটকি দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়েছি। মত বিনিময় সভার অধিকাংশ সময় জুড়েই ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্ছার ছিলেন উপস্থিত বক্তারা। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, আপনাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তবে এত প্রতিবাদী লোকজন থাকতে দুর্নীতিটা হলো কিভাবে।
হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষার ব্যাপারে তিনি বলেন, আগামীতে বাঁধ নির্মাণের চেয়ে নদী খননের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে বেশি। তাহলে বাঁধ নির্মানে দুনীতির সুযোগ থাকবে না। কেননা অধিকাংশ হাওরের তলা থেকে নদীর তলা অনেক উচু হয়ে গেছে। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষা করতে হলে সুনামগঞ্জের প্রতিটি নদীর মোহনা থেকে ভৈরব নদী পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের বিকল্প নেই। এ কাজে খরচ বেশি হলেও সূদুর প্রসারী সুফল পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় সুনামগঞ্জ কিশোরগঞ্জ জেলার একাধিক সংসদ সদস্য, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার, প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ, সাংবাদিক, আইনজীবিসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে চৈত্রের মাঝামাঝি সময়ে একে একে সুনামগঞ্জের সবকটি হাওরের ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পর হাওরাঞ্চলে নতুন করে দেখা দিয়েছে মাছের মড়ক। কাঁচা ফসল পনির নিচে তলিয়ে পঁচন ধরেছে। এতে সমগ্র হাওরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। পঁচা দুর্গন্ধে এসব এলাকার বাতাসেও গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।
তার উপর ভারি বৃষ্টিপাত শেষে মেঘমুক্ত আকাশে প্রচন্ড দাবদাহ শুরু হওয়ায় গরমে মৎস্য প্রজাতির বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে হাওরগুলি। সেই পরিবেশে বাঁচতে না পেরে হাওরের পানিতেই মরে ভেসে উঠছে মাছ। জেলার হাওরগুলিতে এখন মাছের মহামারি শুরু হয়েছে। হাওর পাড়ের কৃষকগণ জানিয়েছেন কাঁচা ধান পানির নিচে থাকায় বিগত দুই সপ্তাহে এতে পঁচন ধরেছে। আর সেই পঁচনে পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মাছের মড়ক শুরু হয়েছে। হাওর এলাকায় ব্যাপক হারে মাছের মড়ক দেখা দেওয়ায় সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর পরিদর্শন করেছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শংকর রঞ্জন দাশ জানিয়েছেন এক সাথে সকল ফসলী মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় পচন ধরে পানিতে বিষক্রিয়ায় অ্যামোনিয়া গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ব্যাপক হারে মাছ মরা শুরু হয়েছে। এদের মধ্যে ডিম ওয়ালা মা মাছগুলো মরছে আগে। প্রতিকার হিসাবে প্রতিটি আক্রান্ত হাওরে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে চুন ছিটানোর জন্য।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত ৬৯ কোটি টাকা আত্মসাতে কারণে ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ী ঢলে সুনামগঞ্জের প্রায় ২ লাখ হেষ্টর বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। সরকারী হিসাব অনুযায়ী সেখানে ৮ লক্ষ মেট্টিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মাত্র ৬৯ কোটি টাকার দুর্নীতির কারণে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ফসল তলিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে সাধারণ কৃষকসহ সকল শ্রেণি পেশার লোকজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ