ঢাকা, বৃহস্পতিবার 20 April 2017, ৭ বৈশাখ ১৪২৩, ২২ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জনদুর্ভোগের অবসানে ব্যবস্থা নিন

দেশের সকল মহলের পক্ষ থেকে রাজধানীতে বাসের সংকট কাটিয়ে ওঠার এবং যাত্রীদের কষ্ট ও ভোগান্তির অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হলেও গতকাল বুধবার পর্যন্তও পরিস্থিতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি। বরং গেটলক ও সিটিং সার্ভিসের পাশাপাশি নিম্নমানের সাধারণ বাসেও যথেচ্ছ হারে ভাড়া আদায় করা হয়েছে। কোনো বাসেই সরকার নির্ধারিত ভাড়ার হার টাঙানো হয়নি। বাসের সংখ্যাও কমে গেছে ৬০/৭০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে চতুর্থ দিনের মতো দুর্ভোগের শিকার হয়েছে যাত্রীরা। মতিঝিল, গুলিস্তান, প্রেস ক্লাব, শাহবাগ, বাংলা মোটর, ফার্মগেট, আসাদগেট, তেজগাঁও, মগবাজার, মিরপুর, বনানী, এয়ারপোর্ট, উত্তরা, গুলশান ও মোহাম্মদপুরসহ এমন কোনো এলাকার বাস স্টপেজের কথা বলা যাবে না, যেখানে হাজার হাজার মানুষ বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে না থেকেছে। প্রচ- রোদ ও গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে বিশেষ করে নারী-শিশু ও বৃদ্ধরা। হঠাৎ কখনো দু’-একটি বাস আসার সঙ্গে সঙ্গে ওঠার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়েছে তাদের মধ্যে। কোথাও কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলার হদিস পাওয়া যায়নি। অনেকাংশে ‘জোর যার মুল্লুক তার’-এর মতো অবস্থা হয়েছে প্রতিটি বাসে ওঠার ক্ষেত্রে। এরপর ছিল ভাড়া আদায়ের স্বেচ্ছাচারিতা। বাসের কন্টাক্টর ও হেলপাররা তাদের মর্জি অনুযায়ী ভাড়া চেয়েছে এবং আদায় করে ছেড়েছে। প্রায় ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ এমনকি তার চাইতেও বেশি টাকা আদায় করেছে তারা। প্রতিবাদ জানাতে গেলেই তেড়ে এসেছে মালিকদের ভাড়া করা গুন্ডার দল। এই গুন্ডারা বাসের ভেতরে যেমন ছিল, তেমনি ছিল বিভিন্ন স্টপেজেও। তাদের হাতে অনেক যাত্রীকে শারীরিকভাবে হেনস্তাও হতে হয়েছে। এভাবে সব মিলিয়েই বুধবারও রাজধানীতে বাস চলাচলের ক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতা ছিল চরমে।
এদিকে ঘটনাপ্রবাহে এমন কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে, যেগুলাকে শুধু নৈরাশ্যজনক বলাই যথেষ্ট নয় বরং কিছু তথ্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনকও। যেমন প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, রাজধানীতে চলমান জনভোগান্তির পেছনে প্রধান ভূমিকা রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের। এসব নেতা একদিকে নিজেরাই অসংখ্য বাসের মালিক, অন্যদিকে তাদের মধ্যকার কেউ কেউ আবার পরিবহন শ্রমিকদের ডাকসাইটে নেতাও। একজন বাস চালকের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের নামে মাত্র কিছুদিন আগে তারাই সারা দেশে পরিবহন সেক্টরে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান পর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে অন্যরকম তথ্য। বলা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের এই নেতাদের উদোগে এরই মধ্যে কয়েকশ’ বিলাসবহুল এবং এসিযুক্ত বাস আমদানি করা হয়েছে। নানা নামে তারা কয়েকটি কোম্পানিও খুলে বসেছেন। এখন চলছে এসব কোম্পানির বাসগুলোকে রাজধানীতে নামানোর পাঁয়তারা। বাসগুলো সিটি সার্ভিস হিসেবে চলাচল করবে কিন্তু প্রতিটি বাসই যেহেতু এসিযুক্ত এবং বিলাসবহুল সে কারণে ভাড়া আদায় করা হবে বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি হারে। এ ধরনের চেষ্টা যে কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপ বা গোষ্ঠী চালাতেই পারেন। কিন্তু জিজ্ঞাসা ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের আলোচ্য নেতাদের নেয়া কৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে। কারণ, প্রচলিত আইন অনুসরণ করে লাইসেন্স-পারমিটসহ বাস নামানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে মালিক সমিতির উদ্যোগে সম্প্রতি গেটলক ও সিটিং সার্ভিস নামে চলাচলকারী বাসগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একযোগে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাজধানীতে তারাই সৃষ্টি করেছেন যানবাহনের প্রচণ্ড সংকট। মূলত সে কারণেই অভিযোগ উঠেছে, সব কিছুর পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের একই গোষ্ঠীর সুচিন্তিত পরিকল্পনা। বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রীর সর্বশেষ বক্তব্যেও। কারণ, নিজে যথেষ্ট দাপটের মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মঙ্গলবার ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পরিবহন নেতারা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। মন্ত্রী প্রকারান্তরে স্বীকার করেছেন, বাসের ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা এতটাই প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর যে, সরকারও তাদের সঙ্গে পেরে উঠতে পারছে না। সরকার ‘বাঁধন-কষণ’ শুরু করলেই নাকি ‘ফসকা গেরো’ লেগে যায়! কারা এই ‘গেরো’ লাগায় ওবায়দুল কাদের তাদের নাম-পরিচয় না জানালেও বুঝতে কারো বাকি থাকেনি। অন্য একটি সিদ্ধান্তের কথা জানানোর মধ্য দিয়েও মন্ত্রী প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান । তিনি জানিয়েছেন, চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য মালিক সমিতির কাছে গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বন্ধের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সরকার তার অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এ বিষয়ে গতকাল বুধবারই মালিক সমিতির সঙ্গে বিআরটিএর  বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
আমরা মনে করি না যে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এসব বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে কথা বাড়ানোর কোনো সুযোগ থাকতে পারে। বাস মালিক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পরিবহন সেক্টরের নেতারা যদি অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা বা সমর্থক হতেন তাহলে বলা যেতো, সরকার তাদের কাছে পরাজয় বরণ করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য রকম। এখানে সকলেই আসলে সরকারের লোকজন। তাদের মধ্যে মন্ত্রী যেমন রয়েছেন তেমনি রয়েছেন ব্যবসায়ী ও কথিত শ্রমিক নেতারাও। আমাদের আপত্তির কারণ, বিলাসবহুল ও এসিযুক্ত গাড়ি নামানোর আয়োজন থেকে গেটলক ও সিটিং সার্ভিসের মতো বাসের চলাচল নিষিদ্ধ করা পর্যন্ত সমগ্র প্রক্রিয়াতে কেবল ক্ষমতাসীনরাই জড়িত রয়েছেন। শুধু পরিচিতি তাদের পৃথক রকমের। অর্থাৎ নিজেদের ব্যবসা এবং লাভ ও মুনাফার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য সবাই একযোগে কাজ করছেন। মাঝখান দিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে যাত্রী তথা সাধারণ মানুষ। আমরা ক্ষমতাসীনদের এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী নীতি-কৌশল ও পরিকল্পনার বিরোধিতা করি এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে জনগণের ভোগান্তি দূর করার দাবি জানাই। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ