ঢাকা, বৃহস্পতিবার 20 April 2017, ৭ বৈশাখ ১৪২৩, ২২ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আশা-নিরাশার এই দ্বন্দ্বে...

বাংলা নববর্ষের কোনো উৎসব ছিল না সুনামগঞ্জে এবার। অন্য বছর কৃষকেরা পয়লা বৈশাখে আনন্দ করতেন। সাধ্যমত বাজার-সদাই করতেন, শিশুদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনতেন, নয়া ধানের চাল দিয়ে শিরনি করতেন। কিন্তু এবার তারা তা করতে পারেননি। কারণ, তাদের গোলায় ধান ওঠেনি, হাতে নেই টাকা-পয়সাও। সুনামগঞ্জের মানুষ এখন সোচ্চার ফসলহারা কৃষকদের পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রামে। সুনামগঞ্জের হাওড় পাড়ের মানুষরা এখন কাঁদছেন। কীভাবে বেঁচে থাকবেন সে চিন্তায় তারা দিশেহারা। সুনামগঞ্জের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সুনামগঞ্জে সম্প্রতি পাহাড়ি ঢলে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৪০টি হাওড়ের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এরপর থেকে জেলাজুড়ে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। হাজার কোটি টাকার ফসলহানির প্রতিবাদ, জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা এবং ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত লোকজনের শাস্তির দাবিতে ১৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার কৃষক-জনতার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ঘেরাও করা হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়।
হাওড়ের ধানের ওপর নির্ভরশীল সুনামগঞ্জ জেলার মানুষ। হাওড়ের ধান গোলায় উঠলে জেলার মানুষের আনন্দের সীমা থাকে না। তখন গ্রামে-গ্রামে জারি-সারি গান, কুস্তি খেলা, নৌকাবাইচ, কেচ্ছার আসরসহ কত কিছুর আয়োজন করা হয়। এ ফসলের ওপরেই কৃষক পরিবারের খাওয়া-দাওয়া, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বিয়ে-শাদি- সবকিছু নির্ভর করে। কিন্তু এবার ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে কৃষকরা। উল্লেখ্য যে, পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে হাওড়ের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনা তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন। এজন্য ৩ সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী। সুনামগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত হাওড় এলাকা পরিদর্শনে সোমবার প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ  গেছেন বলে জানা গেছে। আমরা আশা করবো ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার বিষয়ে যথাযথ তদন্ত হবে। হাওড়, এলাকার মানুষের দুঃখ লাঘবে উপযুক্ত বাঁধ নির্মিত হবে এবং অপরাধীরা পাবে উপযুক্ত শাস্তি।
হাওড় পাড়ের কান্না মানুষের বুকে বাজে। তবে যারা অমানুষ তাদের কথা আলাদা। বলার মত বিষয় হলো, আমাদের সমাজে শুধু অমানুষ নয়, মানুষও বাস করে। তাই নানা অন্যায়-অবিচার, অপরাধ ও অনাচারের মধ্যে যদি কোন ভাল খবর শোনা যায় তাহলে মনে আশাবাদ জাগে। আর আশাবাদী মানুষরাই তো পারে সমাজ-সংসারে কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে। ১৬ এপ্রিল পত্রিকান্তরে আশাবাদের একটি খবর মুদ্রিত হয়েছে। খবরটিতে বলা হয়, ‘হয় মাদক ব্যবসা ছাড়তে হবে, নয় জেলে যেতে হবে’ এমন একটি বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ। এই বার্তা আর ১৬৩২ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বর সম্বলিত একটি তালিকা ছড়িয়ে দেয়া হয় দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে বদলে যেতে থাকে জেলার মাদক পরিস্থিতি। পুলিশ ও সামাজিক চাপে পড়ে মাদক ব্যবসায়ীরা একে একে আত্মসমর্পণ করতে থাকে। তাদের অনেকেই এখন ফিরছেন সুস্থ জীবনে। কেউ ভ্যান চালান, কেউ গরুর খামার দিয়েছেন, কেউ চালান মাইক্রোবাস। পুলিশ বলছে, এই প্রক্রিয়ায় গত ছয় মাসে আড়াই শতাধিক তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করেছেন। আর পুনর্বাসন করতে পুলিশ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন ভ্যান ও সেলাই মেশিন। তালিকা করে, পুলিশী ভয় দেখিয়ে ও সামাজিক চাপে ফেলে মাদক ব্যবসায়ীদের সুপথে আনার ক্ষেত্রে দেশের উত্তরের সীমান্ত জেলা দিনাজপুরে যে সাফল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা বেশ আশাপ্রদ।
উল্লেখ্য যে, দিনাজপুর জেলার সঙ্গে ভারতের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান আসছে অহরহ। কিন্তু তা বন্ধ করা খুবই কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন জেলার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। তবে দিনাজপুর কোতোয়ালী থানার ওসি বলেন, আগে দিনাজপুরে মাদকের যে রমরমা অবস্থা ছিল এখন তা নেই। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা যায় যে, শুধু মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা করেই ক্ষান্ত হয়নি দিনাজপুর জেলা পুলিশ। ‘আলোকচ্ছটা’ নামে ৫৬ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করেছে। এতে জেলার ১৩ উপজেলার মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীর নাম-ঠিকানা ও মুঠো ফোন নম্বর রয়েছে। গত মার্চের শেষের দিকে দিনাজপুর কোতোয়ালী থানার ২১ জন, বীরগঞ্জ থানার ৫ জন ও বিরল থানার ১০ জন সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, তারা স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন এবং সুস্থ আছেন। এরা সবাই মাদক ব্যবসা ছেড়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
দিনাজপুরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়ধর্মী তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। আইন-কানুন ও পুলিশী ভয় দেখানোর পাশাপাশি তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিক চাপে ফেলে দেয়া হয়েছে। এতে ভাল কাজ হয়েছে। একদিকে আইনের ভয়, অপরদিকে সামাজিক মান-মর্যাদার বিষয়, এছাড়া মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পুলিশ এই বার্তাটিও পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে যে, মাদক ব্যবসা করলে কোন রেহাই নেই। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি পুনর্বাসন পরিকল্পনা থাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়ে উঠেছে। আমরা মনে করি, দিনাজপুর জেলার মতো দেশের অন্যান্য জায়গায়ও যদি সমন্বয়ধর্মী আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়া হয় তাহলে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যেতে পারে। প্রসঙ্গত এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারতের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অহরহ প্রবেশ করছে মাদকদ্রব্য। বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছে মাদক কারখানা। ক্ষতিকর এমন উদ্যোগের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে আলোচনা করতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ