ঢাকা, শুক্রবার 21 April 2017, ৮ বৈশাখ ১৪২৩, ২৩ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হৃদরোগীদেরও জিম্মি করে ব্যবসা 

জীবন রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল মেশানোর এবং বিষাক্ত ওষুধে দেশের বাজার ছেয়ে যাওয়ার খবর অনেক আগেই পুরনো হয়ে গেছে। সময় থাকতে সরকার প্রচারণা চালানোসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে অজ্ঞতার কারণে জনগণকে এসব ভেজাল ও বিষাক্ত ওষুধই কিনতে ও খেতে হচ্ছে। পরিণামে তারা আরো বেশি অসুস্থ ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকে নানা অসুখে ভুগে মারাও যাচ্ছে। এ ধরনের পুরনো ও বহুল আলোচিত খবরাখবরের পরিপ্রেক্ষিতে আশা ও ধারণা করা হয়েছিল, বিশেষ করে ওষুধ ও চিকিৎসার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই জনস্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে বাস্তবে ঘটে চলেছে উল্টো রকম। জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা এবার হৃদরোগীদের জিম্মি বানিয়েছে। হার্টে ব্লক সৃষ্টি হলে হৃদরোগে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সাধারণত অপারেশন বা অস্ত্রোপচার করে করোনারি স্টেন্ট বা রিং পরানো হয়। এতে রোগীদের জীবন বেঁচে যায়। এসব রিং যেমন কয়েক ধরনের রয়েছে, তেমনি রিং-এর দামও বিভিন্ন রকমের। এ ব্যাপারে প্রতিবেশি ভারতসহ বিশ্বের সকল দেশের সরকারই হস্তক্ষেপ করে থাকে, যাতে রিংগুলো মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে। কিন্তু অন্য অনেক কিছুর মতো করোনারি স্টেন্ট বা রিং-এর দামের ব্যাপারেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এতদিন পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে এসেছেন। ফলাফলও যা হওয়ার সেটাই হয়েছে। ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছা মতো দাম নির্ধারণ করেছেন এবং প্রায় প্রতিটির ক্ষেত্রেই তারা আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দাম আদায় করেছেন। যেহেতু জীবন বাঁচানোর প্রশ্ন জড়িত সেহেতু ক্রেতারা অর্থাৎ রোগীদের আত্মীয়-স্বজনরা যত কষ্টই হোক, বেশি দাম দিয়েই রিং কিনেছেন। আসলে কিনতে বাধ্য হয়েছেন। 

অতি সম্প্রতি সরকার বিষয়টির প্রতি নজর দিয়েছে। বিস্তারিত অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার পর সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি সুপারিশ করেছে, মান ও প্রকার ভেদে রিংগুলোর দাম নির্ধারণ করতে হবে ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। বিশেষজ্ঞ কমিটির এই সুপারিশের ভিত্তিতে ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছিল। এতে আমদানিকারকসহ ব্যবসায়ীদের ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে রিং বিক্রির নির্দেশ দিয়েছিল ওষুধ প্রশাসন। হাসপাতালগুলোকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, কেউ যাতে সরকার নির্ধারিত দামের বেশি দিয়ে রিং না কেনে এবং রোগীদের কাছ থেকে যাতে বেশি অর্থ আদায় না করে। কিন্তু অত্যন্ত মহৎ হলেও সরকারের উদ্যোগটিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন  আমদানিকারক ও বিক্রেতা তথা ব্যবসায়ীরা। তারা সোজা অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করেছেন। জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটসহ সকল হাসপাতালকে তারা জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে রিং কিনতে হলে আগের দামেই কিনতে হবে। না হলে তাদের কোনো রিং সরবরাহ করা হবে না। যেমন কথা তেমন কাজও করে দেখিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর ফলে রাজধানীসহ দেশের কোনো হাসপাতালেই মঙ্গলবার ও বুধবার কোনো অপারেশন হয়নি। প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ব্যবসায়ীদের এই অঘোষিত ধর্মঘটের কারণে শুধু জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালেই অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন রোগীকে ক্যাথল্যাব তথা অপারেশন থিয়েটার থেকে ফেরৎ পাঠাতে হয়েছে। দু’দিনে ফেরৎ গেছে শতাধিক রোগী। অথচ অপারেশন না হলে এবং রিং না পরানো গেলে এসব রোগীর যে কোনো সময় মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। কিন্তু সব জেনে-বুঝেই রিং সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের শত অনুরোধেও অনুগ্রহ দেখাননি তারা। গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, ওষুধ প্রশাসনের উদ্যোগে চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন হাসপাতালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নাকি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকেও যথারীতি ঘাড় বাঁকিয়েই রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ওষুধ প্রশাসন নাকি দাম কিছুটা কম-বেশি করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। সেই সাথে শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেছে, প্রতিটি রিং-এর গায়ে প্রস্তুত ও আমদানি করার তারিখের সঙ্গে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ ও সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল্য উল্লেখ করতে হবে এবং কোনোক্রমেই উল্লেখ করা মূল্যের চাইতে বেশি দরে বিক্রি করা চলবে না। ওষুধ প্রশাসন নাকি ব্যবসায়ীদের ‘আরো কিছুদিন’ সময় বাড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারেও সম্মত হয়েছে। 

লক্ষণীয় যে, প্রকাশিত খবরে স্বীকার না করা হলেও বাস্তবে অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারের বড় ধরনের পরাজয় ঘটেছে। কিছুটা এদিক-সেদিক করে হলেও সরকার শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দাবিই মেনে নিয়েছে।  এর প্রমাণ পাওয়া যাবে আগামী দিনগুলোতে- যখন দেখা যাবে, সরকারের দেয়া ‘আরো কিছুদিন সময়’ সহজে শেষ হচ্ছে না এবং ব্যবসায়ীরাও নিজেদের মর্জি অনুযায়ী রিং-এর দাম আদায় করছেন। আমরা মনে করি, ব্যবসার আড়ালে মানুষের জীবন নিয়ে যারা অমানবিকভাবে ছিনিমিনি খেলে তাদের দাবি ও ইচ্ছার কাছে সরকারের নতি স্বীকার করা উচিত নয়। পরিবর্তে বৃহত্তর জনস্বার্থে ব্যবসায়ীদেরকেই বরং সরকারের নির্দেশ পালনে বাধ্য করা দরকার। অন্যদিকে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো একটি বিষয়েই বর্তমান সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না- রিং ব্যবসায়ীদেরও আগে বাস মালিকদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করার ঘটনা যার বড় প্রমাণ। এসবের মধ্য দিয়ে একটি নির্মম সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ও হচ্ছে যে, জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে সরকার প্রকৃতপক্ষে কোনো ভূমিকাই পালন করছে না। এমন অবস্থা যে মোটেও সমর্থনযোগ্য নয় বরং সকল দিক থেকে আপত্তিকর সে কথা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা সরকারের এই নীতি ও ভূমিকাকে জনস্বার্থ বিরোধী মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ